সিজেপির ১ মাস ‘আমাদের কথা শুনছে মানুষ’

আলজাজিরার অনুসন্ধান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ভারতে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর অপসারণের দাবিতে ব্যঙ্গাত্মক দল তেলাপোকা জনতা পার্টি (সিজেপি) এখন ভারতব্যাপী জেন-জি প্রজন্মের প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করেছে। সিজেপির মুখপাত্র সাংবাদিক সৌরভ দাস বলেন, নয়াদিল্লির বিক্ষোভটি একটি প্রভাব ফেলেছে। মাঠে নেমে লোকজনকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আমরা কোনো নিবন্ধিত সংগঠন বা ইউনিয়ন নই। এই ধরনের একটি কাঠামো তৈরি করতে কিছুটা সময় লাগবে। একবার তা হয়ে গেলে, লোকজনকে সংগঠিত করাও সহজ হয়ে যাবে।

গত সপ্তাহে সিজেপি মহারাষ্ট্র রাজ্যের শিক্ষাকেন্দ্র পুনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে একই দাবিতে তাদের দ্বিতীয় সমাবেশ করে। আয়ুষ শিম্পি প্রায় ৯০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে ওই সমাবেশে যোগ দেন। শিম্পি বলেন, মনে হচ্ছে আমাদের কথা শোনা হচ্ছে, সিজেপি আমাদের সমস্যা তুলে ধরছে এবং গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখছে।

সিজেপি যাকে দেশব্যাপী প্রতিবাদ আন্দোলন বলছে, পুনে ছিল তারই সূচনা। যদি শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করেন, তবে এই মাসের শেষে নয়াদিল্লিতে ফিরে আসার মাধ্যমে এই আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটবে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে বরখাস্ত করার দাবিতে সিজেপির একটি অনলাইন পিটিশনে এ পর্যন্ত আট লাখেরও বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।

সাম্প্রতিক পরীক্ষার কেলেঙ্কারিতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত নন এমন ছাত্রছাত্রীরাও এই প্রতিবাদে যোগ দিয়েছেন। পুনের ২০ বছর বয়সী আইনের ছাত্র আগম সিং গিল বলেন, একদিকে আপনি নিজেকে ‘বিশ্বগুরু’ [বিশ্বনেতা, মোদির সমর্থকরা প্রায়ই তাকে এই নামে ডাকেন] বলে দাবি করতে পারেন না, আর অন্য দিকে পরীক্ষার ক্ষেত্রে এমন অসামঞ্জস্য রাখতে পারেন না। আমি এই প্রতিবাদে অংশ নিয়েছি, কারণ আমি আমার দেশ এবং আমার বয়সী মানুষদের জন্য চিন্তা করি। আপনারা [সরকার] এই প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এবং ফলস্বরূপ ভারতের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছেন।

কিন্তু সোমবার রাজস্থান রাজ্যের রাজধানী জয়পুরে সিজেপির এক সমাবেশে পরিস্থিতি খারাপের দিকে মোড় নেয়, যেখানে দীপকে-কে তার সমর্থকেরা কাঁধে তুলে নেয়ার সময় এক ব্যক্তি আক্রমণ করে। সিজেপির অনুসারী সেজে দুই-তিনজন লোক কাছে এসে দীপকেকে একাধিকবার চড় মারে। সোশ্যাল মিডিয়ার ভিডিওতে দেখা যায়, অন্যরা আক্রমণকারীদের তাড়া করার সময় তিনি মুখ ঢেকে রাখছেন।

আক্রমণের পর তিনি এক্সে পোস্ট করেন, ‘শারীরিক আক্রমণ ভয় এবং কাপুরুষতার লক্ষণ। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরব এবং শান্তি ও ভালোবাসার সাথে এই লড়াই চালিয়ে যাবো’।

‘গোদি’ মিডিয়ার প্রত্যাখ্যান

ভারতজুড়ে সিজেপির জনপ্রিয়তা বাড়ার সাথে সাথে, মোদি ১৩ জুন এক্সে পোস্ট করেন যে, তার সরকার ‘যুব নেতৃত্বাধীন উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। গত ১২ বছরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ভারতের যুবকরা যে আত্মবিশ্বাসের সাথে তাদের আকাক্সক্ষা পূরণ করেছে।’

সিজেপির মুখপাত্র দাস বলেছেন, মোদির বিবৃতিটি ভণ্ডামির চরম নিদর্শন’। একদিকে প্রধানমন্ত্রী যুবকদের জন্য অনেক কিছু করার দাবি করেন, কিন্তু অন্য দিকে তিনি ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের সংখ্যা নিয়ে সম্পূর্ণ নীরব। দেশজুড়ে চলমান [যুব] বিক্ষোভ নিয়ে তিনি একটি কথাও উচ্চারণ করেননি।

এ দিকে, নয়াদিল্লি, পুনে এবং জয়পুর ছাড়াও সিজেপি অমৃতসর, বেঙ্গালুরু এবং হায়দরাবাদেও তাদের সমাবেশ করেছে, যেখানে হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয়েছে। এটি দলটির অনলাইন সক্রিয়তা থেকে পুরনো ধাঁচের রাজপথের বিক্ষোভে উত্তরণের ইঙ্গিত দেয়।

সেই সমাবেশগুলোতে বিজেপির ‘হিন্দু-মুসলিম’ রাজনীতির বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়া হয় এবং ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের একটি বড় অংশের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়, যা জনপ্রিয়ভাবে ‘গোদি মিডিয়া’ (হিন্দিতে ‘ল্যাপ মিডিয়া’) নামে পরিচিত। এই গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে মোদি সরকারের নীতির প্রতি অতিমাত্রায় সমর্থন এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগ রয়েছে।

অবিনাশ দীপকে নিজে বলেছেন যে, তিনি ‘গোদি মিডিয়া’র সাথে যুক্ত হবেন না এবং ভারতজুড়ে তরুণদের কাছে সরাসরি পেঁৗঁছানোর জন্য প্রধানত সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তির ওপর নির্ভর করবেন। সিজেপির ইনস্টাগ্রাম পেজটি এক মাসেরও কম সময়ে ২২ মিলিয়নেরও বেশি ফলোয়ার পেয়েছে এবং ভারতজুড়ে বিভিন্ন বিক্ষোভের ভিডিওগুলো সোমবার ৪০০ মিলিয়নেরও বেশি ভিউ অতিক্রম করেছে।

তবে প্রবীণ সাংবাদিক ও আমআদমি রাজনীতিবিদ আশুতোষ বলেন, মোদি সরকার এই বিক্ষোভগুলো হুমকি হিসেবে দেখছে না। এই আন্দোলনে বিশ্বাসযোগ্যতা আনতে সুশীল সমাজের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন; কিন্তু দাস বলেছেন, মূলধারার গণমাধ্যমের প্রচারের অভাব নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। তরুণ প্রজন্ম ইন্টারনেটে বাস করে, তাদের কাছে বার্তা পেঁৗঁছে দিতে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হইনি।

পরীক্ষার ইশতেহার

সিজেপি এখন পর্যন্ত যেসব শহরে সমাবেশ করেছে বা আগামী দিনে করার পরিকল্পনা করছে, তার প্রতিটিতেই নিজেদের আন্দোলনকে জোরদার করতে স্থানীয় নাগরিক সমাজ গোষ্ঠী এবং ছাত্র সংগঠনগুলোকে যুক্ত করেছে। মুখপাত্র দাস বলেন, তারাই আমাদের মেরুদণ্ড। এটি আমাদের জাতি, শ্রেণী এবং লিঙ্গ নির্বিশেষে শিক্ষার্থীদের একত্রিত করতে সাহায্য করেছে। দল গঠনের এক মাস পর মাঠ পর্যায় থেকে পাওয়া প্রতিক্রিয়া আশাব্যঞ্জক। অসংখ্য ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবক আমাদের সাথে যোগাযোগ করেছেন, তারা একটি যুব নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ধারণা নিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে এগিয়ে যেতে চান।

পুনের সমাবেশে, সিজেপি তাদের ‘পরীক্ষার ইশতেহার’ প্রকাশ করেছে। এতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ক্ষেত্রে প্রত্যেক পরীক্ষার্থীকে ১০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার দাবি জানানো হয়েছে, যা যাতায়াত এবং প্রস্তুতির খরচ বহন করবে; একটি স্বচ্ছ পরীক্ষা প্রক্রিয়া; উত্তরপত্রের ভৌত মূল্যায়ন; এবং এই ধরনের পরীক্ষা পরিচালনার জন্য বেসরকারি সংস্থাকে দেয়া সরকারি চুক্তিগুলোর একটি স্বাধীন নিরীক্ষা। এ ছাড়া সিজেপি প্রতিনিধিরা পরীক্ষা-সংক্রান্ত ইশতেহার নিয়ে বিভিন্ন দলের সংসদ সদস্যদের সাথে দেখা করবেন। [বর্ষাকালীন] সংসদ অধিবেশন আসছে, এবং আমরা চাপ দেবো...।

সাংবাদিক ও লেখিকা সাবা নাকভি বলেছেন, এমন এক যুগে যখন ‘রিল লাইফ’ অনেকাংশে বাস্তব জীবনে পরিণত হয়েছে, তখন সিজেপি হলো ‘একটি অনন্য আন্দোলন’। তিনি বলেন, যে জনগোষ্ঠী মূলত রাজনীতি থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করে, তাদের কাছে পেঁৗঁছানোর জন্য এই আন্দোলন কৃতিত্বের দাবিদার। যারা সাধারণত রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতে ঘৃণা করেন, তারাও সিজেপি সম্পর্কে কৌতূহলী এবং এটি নিয়ে কথা বলতে চান। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এটি অনেককে তাদের মুখ খোলার ভয় কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

তাদেরই একজন ১৭ বছর বয়সী আরভ দ্বিবেদী, মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

দ্বিবেদী শুক্রবার উত্তরের শহর লৌক্ষèতে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে একটি ছাত্র বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে দীপকে-কেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, আমার বাবা-মা আমাকে এর বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছিলেন। ভেবেছিলাম পুলিশ সমাবেশে হামলা চালাবে। তবু আমি গিয়েছিলাম কারণ আমার পরিচিত অনেকেই গিয়েছিল, এই দুর্নীতি আর কতদিন চলবে? অনিয়মে জর্জরিত একটি দেশে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নেয়াটা হতাশাজনক। মনে হয় পড়াশোনা করে আর কোনো লাভ নেই; আপনার আশা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়; কিন্তু বিক্ষোভে লোকজনকে আসতে দেখে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম।