পুঁজিবাজারে আস্থা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রয়োজন সুশাসন

কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে স্বচ্ছতা আনতে পারলে পুঁজিবাজারের অর্ধেক কাজ হয়ে যায়

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

পুঁজিবাজারকে দীর্ঘদিনের সৃষ্ট অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা থেকে মুক্ত করে সাধারণের আস্থা ও শৃঙ্খলা ফেরাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বাজারের সাথে জড়িত স্টেক হোল্ডারদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করা, এমনটিই মনে করেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অতীতে এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন না থাকায় অনেক মূল্য দিতে হয়েছে দেশের অর্থনীতির এ প্রধান খাতটিকে। বারবার বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছে পুঁজিবাজারের লাখ লাখ বিনিয়োগকারীকে। বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হয়েছে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে।

১৯৯৬ সালের প্রথম বিপর্যয়ের পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে সময় নেয় এক যুগেরও বেশি। আর ঘুরে দাঁড়ানোর পর বছর অতিক্রান্ত না হতেই আবারো বিপর্যয়ের মুখে পড়ে দেশের পুঁজিবাজার। ২০১০ সালে আরো ভয়াবহ বিপর্যয়ের শিকার হয় পুঁজিবাজার। দুইবারই একটি নির্দিষ্ট দলের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমেই ঘটে এ বিপর্যয়। কিন্তু দুইবারই বিপর্যয়ের কারণ খতিয়ে দেখতে কমিশনের মাধ্যমে তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হলেও কোনোবারই জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনা হয়নি। উপরন্তু এক যুগেরও বেশি সময় সেই সরকারের নিয়োগ পাওয়া কমিশনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় অসংখ্য নামসর্বস্ব ও মৌলভিত্তিহীন কোম্পানিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির মাধ্যমে এক দিকে বিনিয়োগকারীদের পকেট কাটা হয়েছে, অন্য দিকে এসব কোম্পানির উদ্যোক্তাদের পকেট ভারী করা হয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থারও একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটও সক্রিয় বলে জানা যায়, যারা পরিকল্পিতভাবে তখনকার সরকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজার লুট করার সব মাল-মসলা জোগান দিয়েছিল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খোন্দকার রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে বর্তমান কমিশনকে দায়িত্ব দেয়। কিন্তু পেশায় ব্যাংকার মাকসুদ বিএসইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আস্থায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। আগের দুই কমিশনের সময় অভ্যন্তরীণ একটি সিন্ডিকেটের অসহযোগিতায় শুরু থেকে কমিশন দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়। পরবর্তিতে অর্থমন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলার সাথে জড়িত কিছু ব্যক্তিতে শাস্তির আওতায় আনা গেলে পরিস্থিতি কমিশনের অনুকূলে আসে। কিন্তু কমিশন তার মেয়াদে আগের মেয়াদের নানা অনিয়মের শাস্তিস্বরূপ জরিমানা এবং নীতি সংস্কারের ওপর বেশি জোর দেয়ার চেষ্টা করলেও পুঁজিবাজারের মূল কাজটি করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। আঠার মাস দায়িত্ব পালন করলেও একটি কোম্পানিকেও পুঁজিবাজারে আনতে পারেনি কমিশন। এ ছাড়া কমিশনের নানা কর্মকাণ্ড বাজারের স্টেক হোল্ডারদের একটি অংশকে নিজেদের আস্থায় আনতে ব্যর্থ হয়েছে।

এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন বিভাগে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসিতেও পরিবর্তন আসতে পারে। তাই বিশ্লেষকরা মনে করেন, সরকার চাইলে নিজেদের পছন্দের কাউকে নিয়োগ দিতেই পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে দরকার পুঁজিবাজার বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং স্টেক হোল্ডারদের সাথে সমম্বয়ের মাধ্যমে বাজারকে গতিশীল ও বিনিয়োগবান্ধব হিসাবে গড়ে তুলতে পারে। নিশ্চিত করতে পারে এর অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও সুশাসন।

এ প্রসঙ্গে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও বিশিষ্ট পুঁজিবাজার বিশ্লেষক ড. মোহাম্মদ মুসা নয়া দিগন্তকে বলেন, পুঁজিবাজারকে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আনতে এ মুহূর্তে সবচাইতে বেশি দরকার এ অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিশ্চিত করা। সরকার চাইলে তাদের পছন্দের কাউকে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় নিয়োগ দিতেই পারে। কিন্তু এটা নিশ্চিত করতে হবে দক্ষতা ও স্বচ্ছতার সাথে যাতে তার দায়িত্ব পালন করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারি আমলা বা একাডেমিক কাউকে হতেই হবে এটা তেমন জরুরি নয়। পুঁজিবাজারের সাথে ঘনিষ্ঠ কাউকেও এ ক্ষেত্রে নিয়োগ দেয়া যায় যদি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। তা ছাড়া সবচেয়ে যেটা বেশি প্রয়োজন তা হলো পুঁজিবাজারের সাথে সংশ্লিষ্ট সব স্টেক হোল্ডারের মধ্যে প্রয়োজনীয় সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমানে রাষ্ট্রায়ত্ত একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সাবেক একজন অধ্যাপক নয়া দিগন্তকে বলেন, পুঁজিবাজারে কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে স্বচ্ছতা আনতে পারলে পুঁজিবাজারের অর্ধেক কাজ হয়ে যায়। আর এ ক্ষেত্রে একটি কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে যারা যারা সংশ্লিষ্ট স্টেক হোল্ডারদের মধ্যে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।

প্রত্যেকে যার যার অবস্থান থেকে স্বচ্ছতার সাথে দায়িত্ব পালন করলেই একটি ভালো কোম্পানি বাজারে আসা নিশ্চিত হয়। অতীতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটা হয়নি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাজ অনুমোদন দেয়া। কিন্তু এর আগে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ দায়িত্ব পালন করে। আর এখন তো কোনো কোম্পানির তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে প্রধান দায়িত্ব থাকবে পুঁজিবাজার কর্তৃপক্ষের। অতএব, দেশের দুই পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে () ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) কর্তৃপক্ষের মধ্যেও এ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে যারা প্রাথমিকভাবে কোম্পানির তালিকাভুক্তিতে ভূমিকা রাখবে। তা হলে একটি ভালো কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিশ্চিত হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) মতো সংগঠনগুলো চায় এমন নেতৃত্ব, যারা বাংলাদেশের শেয়ারবাজারকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে পারবেন। বিশেষ করে ১৯৯১-৯৫ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপির শাসনামলে শেয়ারবাজারে ট্রেডিংয়ে অটোমেশন, সিডিবিএলের মাধ্যমে সিকিউরিটিজ সংরক্ষণসহ নানা সংস্কার কার্যক্রমের পাশাপাশি বড় কোনো কেলেঙ্কারি না হওয়ার রেকর্ড থাকায় নতুন সরকারের ওপর প্রত্যাশা অনেক বেশি। এখন দেখার বিষয়, ভঙ্গুর এই খাতকে টেনে তুলতে নতুন সরকার শেষ পর্যন্ত কাদের হাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার চাবিকাঠি তুলে দেয়।

তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থায় আদৌ পরিবর্তন আসছে কি আসছে না তার চেয়েও বড় কথা নতুন সরকারের সময়ে একটি সৃশৃঙ্খল পুঁজিবাজার চান বিনিয়োগকারীরা যেখানে ভালো ভালো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হবে। যে বাজার দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে পারবে। সর্বোপরি দেশের শিল্প ও সেবা খাতের উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রয়োজনীয় মূলধন সরবরাহে সক্ষম একটি পুঁজিবাজার বাস্তব রূপ লাভ করবে।