নিজস্ব প্রতিবেদক
সারা দেশে দুর্নীতি, দখল, চাঁদাবাজিসহ নানা অনিয়মের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি তাদের কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, অনেকেই নানা পরিচয়ে অপকর্ম করছেন। তাদের যেমন একদিকে আইনের আওতায় আনতে হবে তেমনি কাউন্সিলিং করে সুপথে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
বর্তমানে দেশে গণমাধ্যমের টুঁটি চেপে ধরার পরিবেশ নেই দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের দিনটা আমাদের জন্য, বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের জন্য একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন। আজকের এই দিনে বাংলাদেশের সব সংবাদপত্র একসময় বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল, হাতেগোনা মাত্র চারটি সংবাদপত্র ছিল। সেখান থেকে আজকে আমরা এতগুলো সাংবাদিক ভাইদের সাথে কথা বলছি। এর মাধ্যমে একটা জিনিস প্রমাণিত হয়েছে যে ওই সময় সংবাদপত্রের যে টুঁটি চেপে ধরা হয়েছিল সেটি অন্তত এখন নেই, এই মুহূর্তে নেই। যেভাবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল, মাত্র চারটা সংবাদপত্রকে রেখে সব বন্ধ করে দিয়েছিল। একই সময় আমরা দেখেছি বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে বন্ধ, মানে বিলুপ্ত করে বাকশাল নামের একটা দল গঠন করা হয়েছিল। তিনি বলেন, পরবর্তীতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলেন উনি বহুদলীয় গণতন্ত্র চালু করলেন। একই সাথে সংবাদপত্রের উপর থেকে যে রেস্ট্রিকশন ছিল সেটাও তুলে নিলেন। পরবর্তী সময়ে কি হয়েছে, কতটুকু হয়েছে এটা আপনাদের কথা থেকেও বেরিয়ে এসেছে।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকসহ গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের একাধিক মতবিনিময় করেছেন। গত সোমবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে জনপ্রশাসন কক্ষে বিভিন্ন টেলিভিশনের প্রধান নির্বাহী ও বার্তা প্রধানদের সাথেও মতবিনিময় করেছেন এবং তাদের দুপুরে মধ্যাহ্ন ভোজে আপ্যায়ন করেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে প্রধানমন্ত্রী মতবিনিময় করলেন বিএনপি বিটের সাংবাদিকদের সাথে। তিনি তাদের সাথে দুপুরের খাবার খান। পরে তিনি সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।
প্রতিশোধের মানসিকতা বদলাতে হবে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যখন বলেছিলাম যে, আসুন আমাদের নিজের চিন্তা কিছুটা পরিবর্তন করার চেষ্টা করি। হ্যাঁ, আমার সাথে হয়েছে, আপনি এখন প্রতিশোধ নিলে আপনার সেটা ফেরত পাবেন বা একদম আগের মতো হয়ে যাবে? হবে না। আমরা আমাদের সেই মাইন্ডসেট থেকে বেরিয়ে এসে কি করতে পারি দেশের জন্য, সমাজের জন্য, মানুষের জন্য কি করতে পারি? পারি বা না পারি সেটা হচ্ছে পরের ব্যাপার ... চেষ্টা তো করতে পারি, সাকসেসফুল হওয়া পরের ব্যাপার। অন্তত এই মাইন্ডসেট নিয়ে আমরা কেন সামনের দিকে এগোবো না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একটি ব্যাপারে সবাই কনসার্ন। আপনাদের পত্রিকায় প্রায় এরকম নিউজগুলো আসে দেখি, যেমন ধরেন, আমাদের ইয়াং জেনারেশনের ড্রাগের একটা প্রবলেম দেখা দিয়েছে। হয়তো বিশ্বব্যাপী কম-বেশি আছে। এখন আপনি কতজনকে ধরবেন, কতজনকে চিকিৎসা দিবেন, কতজনকে আপনি কাউন্সিল করবেন? সবকিছুর একটা রিসোর্সের লিমিট আছে, ক্যাপাবিলিটি আছে, ক্যাপাসিটি আছে। তাহলে বিষয়টিকে আর অন্য কিভাবে এড্রেস করা যায়? এটা এড্রেস করার আরো কিছু উপায় আছে। দেখুন ব্যাপারটাকে আমাদের অবশ্যই এড্রেস করতে হবে যে এই সমস্যা থেকে কিভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বের করে নিয়ে আসব। এই চিন্তার পাশাপাশি বা এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার পাশাপাশি আরেকটা বিষয় আছে যে আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তো আমার সঠিকভাবে গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের যে এনার্জিটা তাকে বার্ন করার একটা এভিনিউ দিতে হবে, একটা স্কোপ দিতে হবে সে সুযোগ তাকে ক্রিয়েট করে দিতে হবে।
তরুণদের এই শক্তিকে কাজে লাগাতে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা চালু করেছি। সম্প্রতি শেষ হওয়া একটি শিক্ষা বিভাগীয় ইভেন্টে সারা দেশের প্রায় ২২ লাখ ছেলেমেয়ে অংশ নিয়েছে। দল-মত নির্বিশেষে সব পরিবারের সন্তান এখানে যুক্ত হয়েছে। অথচ দুঃখের বিষয়, এত বড় একটি আয়োজন আমাদের দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে সেভাবে গুরুত্ব পায়নি।’
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আমরা ঢাকা শহরসহ বাংলাদেশের যেখানেই তাকাই না কেন কয়টি খেলার মাঠ আছে অর্থাৎ আমাদের যারা এখন এসবের (ড্রাগ) মধ্যে ইনভলভ হয়ে যাচ্ছে অথবা সারাদিন সোশ্যাল মিডিয়ার মধ্যে আছে, বুঝে হোক না বুঝে হোক ভালো-মন্দের মধ্যে পার্টিসিপেট করে ফেলছে। খেলার মাঠ সব বন্ধ। ছেলে হোক মেয়ে হোক উভয়ের জন্য খেলার মাঠ বলতে কিছু নেই।
তরুণদের নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার ওপর তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকাল দেখা যায় একটা জীবন্ত প্রাণীকে পিটিয়ে মারা হচ্ছে এবং ১০ জন মিলে তা মোবাইলে রেকর্ড করছে। এগুলো অস্বাভাবিক মানসিকতা। স্কুল পর্যায় থেকেই আমাদের সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চর্চা বাড়াতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’
লন্ডনে সবুজ গাছ-গাছালির কথা স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা তো এখন আমি খুব মিস করি। ওই গাছগুলো বিশাল বিশাল। সেখানে কোকিলের মতন একটা পাখি ছিল। তো একটা ডাক দিলে আরেকটা ডাক দিত বিকেলের দিকে। মাঝে মধ্যে আমি ওদের ওই গান শোনার জন্যই হাঁটতাম। এসব এখন খুব মিস করি আমি।
গণমাধ্যমের সহযোগিতা চাই মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা আমাকে অনেক সাহায্য করতে পারেন, শুধু সরকার একা পারবে না, আপনার সহযোগিতা আমার লাগবে, আপনার সহযোগিতা না পেলে তো আমি বুঝতে পারবো না যে কাজটা ভালো হচ্ছে না খারাপ হচ্ছে। সহযোগিতা পেলেই অন্তত বুঝতে পারব যে কাজটা ভালো হচ্ছে না খারাপ হচ্ছে অথবা ভালো কাজের পথটা আপনাকেও দেখাতে হবে, আমি দেখব আমার মতন করে আপনি আপনাকেও দেখাতে হবে। অর্থাৎ আমাদের প্রত্যেকের এগিয়ে আসতে হবে। এই সহযোগিতাটা আমি আপনাদের কাছে চাইছি। আপনাদের কাছে আজকের এই অনুষ্ঠানে আমার যে এপিলটা অর্থাৎ আমাকে যদি আপনারা হেল্প করেন, আমার জন্য কাজটা করতে অনেকটা ইজি হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদেরকে পরিবেশটা বাঁচাতে হবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে হবে, আমাদের সন্তানদেরকে যেভাবে হোক আমাদেরকে রাইট ট্র্যাকে রাখতে হবে। সেটা শিক্ষার মাধ্যমে হোক, সেটা কালচারের মাধ্যমে হোক, সেটা স্পোর্টসের মাধ্যমে হোক। সেটা মানবিক সামাজিক ধর্মীয় মূল্যবোধগুলো তাদের মধ্যে দেয়ার মাধ্যমে হোক, আপনাদের কাছে এতটুকু আপিল জানাতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর আপনার অনুভূতি কেমন- এমন প্রশ্নের জবাবে তারেক রহমান বলেন, অসম্ভব একটা চাপ অনুভব করছি। মনে হচ্ছে দিনটা ২৪ ঘণ্টার স্থলে ৪৮ ঘণ্টা হলে ভালো হতো। মালয়েশিয়া সফরে সেখানে বন্দী ও বেকার বাংলাদেশী নাগরিকদের জন্য কোনো বিশেষ আলোচনা করবেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনসম্মত সব কিছু নিয়েই আলোচনা করবেন। দেশের জন্য বিব্রতকর হবে এমন বিষয় নিয়ে আইনগতভাবেই এগোতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বাংলাদেশী যারা মালয়েশিয়ায় আছেন তাদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সফরে আলোচনা করবেন বলে তিনি জানান। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি তো জ্যোতিষী নই। মাত্র চার মাস গেল এ সরকারের। আমরা তো জনগণের মঙ্গলের জন্যই কাজ করবো এটাই স্বাভাবিক। কারণ তাদের কাছে ভোটের জন্য আমাকে আবারো যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনির সঞ্চালনায় এই মতবিনিময় সভায় তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহাদী আমিন, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমান, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, উপ প্রেস সচিব হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজন, শাহাদাত হোসেন স্বাধীন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।


