ইরান যুদ্ধের আড়ালে গাজা সঙ্কট আরো গভীর হওয়ার আশঙ্কা

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সামরিক হামলার পর গাজা উপত্যকায় নতুন করে মানবিক সঙ্কটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে বিশ্বের দৃষ্টি অন্য দিকে সরে যাওয়ায় গাজার পরিস্থিতি আরো উপেক্ষিত হয়ে পড়ছে। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গাজায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অতীতে যুদ্ধের সময় সীমান্ত বন্ধ হয়ে খাদ্য সঙ্কট তৈরি হওয়ার স্মৃতি থেকে মানুষ দ্রুত বাজারে ছুটে যায়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আটা, রান্নার তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

মাঘাজি শরণার্থী শিবিরে এক সপ্তাহ আগে যে ২৫ কেজি আটার বস্তার দাম ছিল প্রায় ৩০ শেকেল, তা এখন ১০০ শেকেল পর্যন্ত পৌঁছেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব পণ্য বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতির মধ্যে আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থাগুলোর ওপর নতুন বিধিনিষেধও সঙ্কট বাড়িয়েছে। চিকিৎসা সহায়তা, খাদ্য বিতরণ এবং অস্থায়ী হাসপাতাল পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা কয়েকটি সংস্থার কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। এসব সংস্থা গাজায় প্রায় অর্ধেক খাদ্য সহায়তা এবং প্রায় ৬০ শতাংশ চিকিৎসাসেবা প্রদান করে থাকে। বিশ্লেষকদের মতে, আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অগ্রাধিকার বদলে গেছে। ফলে গাজার মানবিক সঙ্কট আন্তর্জাতিক আলোচনায় গুরুত্ব হারাচ্ছে। মানবাধিকার কর্মীরা সতর্ক করে বলেছেন, সীমান্ত বন্ধ, সহায়তা কমে যাওয়া এবং পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য আবারো তীব্র খাদ্য সঙ্কট দেখা দিতে পারে।

রান্নার গ্যাস সরবরাহ বন্ধে মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা

গাজা উপত্যকায় রান্নার গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে গাজা জেনারেল পেট্রোলিয়াম অথরিটি। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইসরাইল গ্যাস সরবরাহ স্থগিত করায় দুই মিলিয়নের বেশি মানুষের জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। খবর মিডলিস্ট মনিটরের। এক বিবৃতিতে কর্তৃপক্ষ জানায়, যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পর থেকেই গাজায় প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কম রান্নার গ্যাস প্রবেশ করছিল। এতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আগেই চরমে পৌঁছেছিল। এখন পুরোপুরি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। সংস্থাটি আরো জানায়, পবিত্র রমজান মাসে এই পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠতে পারে। রান্নার গ্যাস না থাকলে বহু পরিবার খাবার প্রস্তুত করতে পারবে না এবং বিভিন্ন ত্রাণ কার্যক্রমও ব্যাহত হবে। গাজা কর্তৃপক্ষের মতে, গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখা যুদ্ধবিরতি চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এটি মানবিক সঙ্কটকে আরো তীব্র করবে। তারা আন্তর্জাতিক সংস্থা, মানবাধিকার সংগঠন এবং মধ্যস্থতাকারী দেশগুলোর প্রতি জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অবিলম্বে গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু না হলে গাজায় জীবনযাত্রা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়তে পারে।

পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বৃদ্ধি

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইরান যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও সহিংসতা বেড়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি থাকলেও বাস্তবে তাদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় হয়ে উঠেছে সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা। খবর আলজাজিরার।

নাবলুসের পূর্বে দুমা গ্রামের কাছে একটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে গেলেও বাসিন্দারা তাতে তেমন আতঙ্কিত হননি। গ্রামের এক বাসিন্দা বলেন, আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র থাকলেও ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা বসতি স্থাপনকারীরাই তাদের জন্য বড় বিপদ। স্থানীয়দের অভিযোগ, সেনাবাহিনী গ্রামগুলোর প্রবেশপথে ফটক বন্ধ করে চলাচল সীমিত করে দিয়েছে। ফলে মানুষ চিকিৎসা, খাদ্য বা প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহের জন্য বাইরে যেতে পারছেন না। একই সময়ে বসতি স্থাপনকারীরা অবাধে গ্রামে ঢুকে ভয়ভীতি, মারধর ও সম্পত্তি ভাঙচুর করছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে ক্বারিউত এলাকায় বসতি স্থাপনকারীদের গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি ভাই নিহত হয়েছেন। অন্য কয়েকটি গ্রামেও হামলা চালিয়ে পানি ট্যাংক ভাঙচুর, যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত এবং বাসিন্দাদের ওপর মরিচের গুঁড়া ছিটানোর ঘটনা ঘটেছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এসব হামলার সময় সেনারা উপস্থিত থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তারা হস্তক্ষেপ করেনি। বরং হামলার সময় ফিলিস্তিনিদেরই গ্রেফতার করা হয়েছে। জাতিসঙ্ঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত পশ্চিম তীরে চার হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে এই সহিংসতা আরো বাড়তে পারে।

খান ইউনুসে ইসরাইলি গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত

গাজার দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনুস এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। চিকিৎসা সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সি। নিহতদের নাম মাহের হার্ব সামুর ও মুনতাসির সাদ সামুর। তাদের লাশ খান ইউনুসের নাসের হাসপাতালে নেয়া হয়েছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, খান ইউনুসের পূর্বে বানী সুহেইলা এলাকায় ইসরাইলি সেনারা গুলি চালালে তারা নিহত হন। ঘটনাটি এমন সময় ঘটল যখন গাজায় গত বছরের অক্টোবর থেকে কার্যকর থাকা যুদ্ধবিরতি বারবার লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠছে। স্থানীয় সূত্র বলছে, ওই দিন ভোরে ইসরাইলি সামরিক যান থেকে ভারী গুলিবর্ষণ করা হয়। এ ছাড়া উত্তর গাজার বিভিন্ন এলাকায় গোলাবর্ষণ এবং উপকূলের দিকে নৌবাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় ইতোমধ্যে ৬৩০ ফিলিস্তিনি নিহত এবং প্রায় এক হাজার ৭০০ জন আহত হয়েছেন।

সীমান্ত বন্ধে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও আতঙ্ক

ইসরাইল-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সীমান্তপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গাজায় খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে এবং মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। খবর বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)। স্থানীয় সূত্র জানায়, ইসরাইল কয়েক দিনের জন্য গাজার সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দিলে বাজারে দ্রুত পণ্যের সঙ্কট দেখা দেয়। পরে কেরেম শালোম সীমান্তপথ আংশিক খুললেও প্রধান প্রবেশপথ রাফাহ সীমান্ত এখনো বন্ধ রয়েছে। জাতিসঙ্ঘ শিশু সংস্থার মুখপাত্র জোনাথন ক্রিক্স জানান, সীমান্ত বন্ধের পর অল্প সময়ের মধ্যেই খাদ্য, সাবানসহ নিত্যপণ্যের দাম ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, যুদ্ধের আশঙ্কায় মানুষ বাজারে ছুটে গিয়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুদ করতে শুরু করেছে। এতে স্বল্প সময়েই বাজারে পণ্যের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, গাজা প্রায় সম্পূর্ণভাবে ত্রাণ ও বাইরের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। সীমান্ত বন্ধ থাকলে খুব দ্রুতই খাদ্য ও জ্বালানির সঙ্কট তৈরি হয় এবং মানবিক পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে ওঠে।