বিশেষ সংবাদদাতা
নিয়মিত ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেয়ার পরিবর্তে টিকে থাকার জন্য সংগ্রামরত উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে নীতিগত সহায়তা দেয়া বেশি প্রয়োজন। এ ছাড়া ক্ষুদ্র সেবা প্রদানকারীদের কর কর্মকর্তাদের হয়রানি থেকে রা করার জন্য একটি প্রাক্কলনমূলক কর ব্যবস্থা চালু করা দরকার।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআরআই) সেন্টার ফর ম্যাক্রোইকোনমিক অ্যানালাইসিস (সিএমইএ), অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ট্রেডের (ডিফ্যাট) সহযোগিতায় গতকাল বৃহস্পতিবার ‘উৎপাদনশীলতা সংস্কারের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার : প্রাক-বাজেট অগ্রাধিকার’ শীর্ষক মাসিক ম্যাক্রোইকোনমিক ইনসাইটসে একথা বলা হয়। গতকাল বৃহস্পতিবার পিআরআইর বনানী কার্যালয়ে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য প্রদান করেন পিআরআইর প্রিন্সিপাল ইকোনমিস্ট ড. আশিকুর রহমান। তিনি কয়েকটি বিষয় তুলে ধরেন। এগুলো হলো- সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভিত্তি করে একটি সুশৃঙ্খল বাজেট এবং টেকসই উৎপাদনশীলতা-বর্ধক সংস্কারই বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি পুনরুদ্ধারের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পথ।
মুদ্রাস্ফীতি এখনো বেশি থাকায়, ক্রমবর্ধমান সুদ পরিশোধের কারণে রাজস্ব সংস্থান ক্রমশ সংকুচিত হওয়ায় এবং আর্থিক খাতের দুর্বলতা কার্যকর ঋণ সঞ্চালনকে বাধাগ্রস্ত করায়, সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব বা মুদ্রানীতি প্রণোদনার সুযোগ সীমিত। এমন পরিস্থিতিতে, চাহিদাভিত্তিক সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার প্রচেষ্টা মুদ্রাস্ফীতির চাপ তীব্রতর করা, রাজস্ব ঘাটতি বাড়ানো এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রচেষ্টাকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে শক্তিশালী রাজস্ব আহরণ, বাস্তবসম্মত ব্যয় ব্যবস্থাপনা, অদ ভর্তুকির যৌক্তিকীকরণ এবং ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর মাধ্যমে নীতির বিশ্বাসযোগ্যতাকে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত। পাশাপাশি সামাজিক সুরা, মানবসম্পদ এবং কৌশলগত অবকাঠামো সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যয় সুরতি রাখা প্রয়োজন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, দুর্বল বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়ন, ক্রমবর্ধমান পরিচালন ব্যয় এবং বারবার প্রকল্প বিলম্ব আর্থিক চাপ তীব্রতর করছে এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের কার্যকারিতাকে ব্যাহত করছে। বারবার নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সরকারি প্রকল্পগুলোতে ক্রমাগত ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ড. খাতুন সতর্ক করে বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের বারবার রাজস্ব ল্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার কারণে রাজস্ব ঘাটতি বেড়েছে এবং ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। তিনি বাংলাদেশের মুদ্রাস্ফীতিকে মূলত সরবরাহ-চালিত হিসেবে বর্ণনা করেন, যা আমদানিজনিত মুদ্রাস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাজারের অদতা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি এবং ক্রমবর্ধমান জ্বালানি ও সুদের ব্যয়ের কারণে সৃষ্ট।
পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদী সাত্তার বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কোভিড-১৯ মহামারী, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিতিশীলতাসহ একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ ধাক্কার মুখে বাংলাদেশ অসাধারণ স্থিতিস্থাপকতা প্রদর্শন করেছে।’ তবে তিনি বলেন, এ সময় প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়েছে, বিনিয়োগের গতি দুর্বল হয়ে পড়েছে, মুদ্রাস্ফীতি উচ্চপর্যায়ে রয়েছে এবং রাজস্ব, আর্থিক ও জ্বালানি খাতের দুর্বলতাগুলো নীতি নির্ধারণের সুযোগকে সীমিত করে চলেছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসিরউদ্দিন আহমেদ ক্ষুদ্র সেবা প্রদানকারীদের কর কর্মকর্তাদের হয়রানি থেকে রা করার জন্য একটি প্রাক্কলনমূলক কর ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেন।
ব্যবসায়ীদের নেতা মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ গত এক দশক ধরে ক্রমাগত অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের সাথে লড়াই করছে, যেখানে বাজারের বিকৃতি এবং কেন্দ্রীভূত নীতি প্রণয়ন বেসরকারি খাতের আস্থা ক্ষুণœ করছে। তিনি নিয়মিত ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেয়ার পরিবর্তে টিকে থাকার জন্য সংগ্রামরত উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে নীতিগত সহায়তা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ অনিশ্চয়তা এবং অদতা সৃষ্টি করেছে। তিনি প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করার ল্েয বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, স্বয়ংক্রিয়করণ প্রক্রিয়াকে সুসংহত করা এবং সরকারি ক্রয়ের গুণগত মান উন্নয়নেরও আহ্বান জানান।



