২০১৯ সাল থেকেই হামের টিকার ঘাটতি ছিল : ইউনিসেফ

১০ বৈঠকে জানানো হয় সরকারকে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে ২০১৯ সাল থেকেই হামের টিকার ঘাটতি ছিল। জাতিসঙ্ঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ বলছে, তখন থেকেই তৎকালীন সরকারকে, পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার ও বর্তমান সরকারকে অবহিত করা হয়েছে।

ইউনিসেফ বলছে, টিকার ঘাটতি নিয়ে অন্তত ১০টি বৈঠক এবং পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে আগের সরকারকে অবহিত করা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছু টিকা মজুদ থাকলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় পর্যাপ্ত ছিল না।

গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের ইউনিসেফ বাংলাদেশের কার্যালয়ে ‘হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি ও চলমান প্রতিরোধ কার্যক্রম’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। তিনি বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর এমআর১ ও এমআর২ এই দুই ধরনের প্রায় সাত কোটি ডোজ হামের টিকার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মাত্র এক কোটি ৭৮ লাখ ডোজ টিকা আসে। এই পরিমাণটি মোট চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ। তিনি বলেন, অনেক রুটিন টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হওয়ায় বিপুল সংখ্যক শিশু টিকা পায়নি। তবে তিনি এটাও বলেন, টিকার ঘাটতি নতুন কিছু নয়। ২০১৯ সালের পর থেকে স্বাস্থ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ঘাটতি সম্পর্কে অবহিত করা হয়। তিনি বলেন, কোনো মহামারী হঠাৎ করে হয় না; টিকায় প্রতিরোধযোগ্য রোগের ক্ষেত্রে আগে থেকেই সঙ্কেত পাওয়া যায়।

এক প্রশ্নের জবাবে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, টিকা সরবরাহ একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং বাংলাদেশের সাথে ইউনিসেফের তিন বছরের চুক্তি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনা নিয়ে মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্তের কারণে ক্রয় প্রক্রিয়া বিলম্ব হয়। এর আগে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল কিনা তা তিনি নিশ্চিত নন; তবে এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভালো বলতে পারবে বলে জানান। তিনি বলেন, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ইউনিসেফ মোট পাঁচ থেকে ছয়টি চিঠি পাঠিয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ চিঠিটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার ঠিক দুই দিন আগে, ১০ ফেব্রুয়ারি পাঠানো হয়। সংস্থাটি আশা করেছিল, নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে চিঠিটি পৌঁছাবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, দীর্ঘ সময় রুটিন টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত থাকায় দেশে হামের সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হয় এবং শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। তবে চলতি মে মাস থেকে আবারো দেশে হামের রুটিন টিকা সরবরাহ শুরু হয়েছে। বর্তমানে ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো এবং টিকাদান কর্মসূচি জোরদারে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীরা কাজ করছে। রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে কোনো ধরনের বিঘœ থাকা উচিত নয়। সময়মতো পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতেও বড় ধরনের জনস্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।

টিকা সংগ্রহ প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি বলেন, টিকা অত্যন্ত বিশেষায়িত পণ্য, শুধু কম দাম বিবেচনা করলেই হয় না; টিকাটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত, কার্যকর ও নিরাপদ কিনা, সেটিও নিশ্চিত করতে হয়। ইউনিসেফ দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের জন্য টিকা সংগ্রহ করে আসছে এবং বড় পরিসরে কেনাকাটার কারণে তুলনামূলক কম দামে মানসম্মত টিকা সরবরাহ করতে সক্ষম সংস্থাটি। তবে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার যদি মনে করে অন্য কোনো উৎস থেকে আরো কম দামে মানসম্মত টিকা সংগ্রহ করা সম্ভব, তাহলে সে সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার সরকারের রয়েছে।

অধ্যাপক মো: সায়েদুর রহমানের বক্তব্য : গতকালকের সংবাদ সম্মেলনে ইউনিসেফের বক্তব্য প্রসঙ্গে বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো: সায়েদুর রহমান তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘ইউনিসেফের সংবাদ সম্মেলনে হামের টিকা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আলোচনা হয়নি। ২০২৫ সালে হামের টিকার অভাবে কোনো মানুষ টিকা না পেয়ে ফিরে গেছেন বলে জানা যায় না। টিকার কাভারেজে সেটা প্রতিফলিত হয়। যতদূর জানি, বিশেষ ক্যাম্পেইন সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত ইন্টার-এজেন্সি কো-অর্ডিনেশন কমিটি (আইসিসি) কর্তৃক নেয়া হয়, যেখানে ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিনিধি থাকেন। ইউনিসেফের পক্ষ থেকে করা যোগাযোগসমূহে ‘হামের প্রাদুর্ভাব’ নিয়ে কোনো কিছুই উল্লেখ ছিল না।’