ঈদকেন্দ্রিক ব্যাংকিং খাতে নগদ টাকার তীব্র সঙ্কট

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে দেশের ব্যাংকিং খাতে নগদ টাকার সঙ্কট প্রকট আকার ধারণ করেছে। নগদ অর্থের চাহিদা বাড়লেও বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পাওয়ায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে কার্যত হাহাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্সের বিপরীতে গ্রাহকদের নগদ অর্থ পরিশোধ, ধান-চাল কেনাবেচার মৌসুম এবং ঈদকেন্দ্রিক অতিরিক্ত নগদ উত্তোলনের চাপ একসাথে তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।

ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে অধিকাংশ সঙ্কটে টাকা ব্যাংকই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম নগদ টাকা পাচ্ছে। এতে এটিএম বুথে টাকা সঙ্কট, শাখাগুলোতে সীমিত নগদ বিতরণ এবং বড় অঙ্কের উত্তোলনে অনানুষ্ঠানিক বিধিনিষেধ আরোপের মতো ঘটনা বাড়ছে। কিছু ব্যাংক ইতোমধ্যে গ্রাহকদের একদিনে নগদ উত্তোলনের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কোরবানির ঈদের আগে সাধারণত বাজারে নগদ টাকার চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যায়। পশু কেনাবেচা, মৌসুমি ব্যবসা, কৃষিপণ্যের লেনদেন এবং ঈদ কেনাকাটার কারণে গ্রাহকরা ব্যাংক থেকে বেশি নগদ উত্তোলন করেন। এবার সেই চাপের সাথে যুক্ত হয়েছে রেমিট্যান্সের নগদ পরিশোধ। বিদেশ থেকে আসা বিপুল পরিমাণ অর্থ অনেক ক্ষেত্রে নগদে গ্রাহকদের দিতে হচ্ছে। ফলে ব্যাংকগুলোর ভল্টে নগদ অর্থ দ্রুত কমে যাচ্ছে।

একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘ঈদের আগে প্রতি বছরই নগদ টাকার চাপ থাকে। তবে এবার পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। আমরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে যে পরিমাণ টাকা চাইছি, তার অর্ধেকও পাচ্ছি না। ফলে গ্রাহকের চাহিদা পূরণ কঠিন হয়ে যাচ্ছে।’

ব্যাংক খাতের একাধিক সূত্র জানায়, দেশের অন্যতম বড় মোবাইল ব্যাংকিং ও এটিএম সেবা প্রদানকারী একটি ব্যাংকের তহবিল ব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে গত এক সপ্তাহে সাড়ে প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকার নগদ চাহিদা দিলেও পেয়েছে মাত্র ১ হাজার কোটি টাকার মতো। একইভাবে আরেকটি ব্যাংক ৪ হাজার কোটি টাকার চাহিদার বিপরীতে পেয়েছে মাত্র দেড় হাজার কোটি টাকা। এভাবে সঙ্কটে বেশির ভাগ ব্যাংকের মধ্যে হাহাকার লেগে গেছে।

ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমানে বাজারে নগদ টাকার প্রবাহ স্বাভাবিক থাকলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বড় অঙ্কের নতুন নোট ও ছোট মূল্যমানের নোট সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কোরবানির ঈদের সময় পশুর হাট ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে ছোট নোটের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু সেই অনুপাতে সরবরাহ বাড়েনি।

এ দিকে ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের তারল্য সঙ্কটও নগদ সঙ্কটকে আরো তীব্র করছে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকে আমানতকারীদের আস্থাহীনতার কারণে নগদ উত্তোলনের প্রবণতা বেড়েছে। ফলে ব্যাংকগুলো অতিরিক্ত নগদ মজুদ রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় তারা চাপে পড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতে আস্থার সঙ্কট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে নগদ লেনদেন বেড়ে যাওয়ার কারণেও বাজারে নগদ অর্থের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক গ্রাহক ব্যাংকে টাকা রাখার পরিবর্তে হাতে নগদ রাখাকে নিরাপদ মনে করছেন। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে নগদের ঘাটতি বাড়ছে।

একজন সাবেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘ঈদের আগে নগদ অর্থের চাহিদা বাড়বে, এটা স্বাভাবিক ও পূর্বানুমেয় বিষয়। সেই অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের আগেই প্রস্তুতি নেয়া উচিত ছিল। এখন যদি ব্যাংকগুলো চাহিদামতো নগদ না পায়, তাহলে গ্রাহক ভোগান্তি আরো বাড়বে।’

তিনি আরো বলেন, রেমিট্যান্সের একটি বড় অংশ এখনো নগদে বিতরণ করা হয়। অথচ ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হওয়ায় নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা কমছে না। ফলে ঈদ মৌসুমে চাপ বেড়ে যায়।

ব্যাংক কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে ঈদের আগের সপ্তাহে এটিএম বুথগুলোতে টাকা সঙ্কট আরো বাড়তে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় নগদ সরবরাহ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ ওই সব এলাকায় এখনো ডিজিটাল লেনদেনের ব্যবহার সীমিত এবং অধিকাংশ কেনাবেচা নগদে সম্পন্ন হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন, বাজারে পর্যাপ্ত নগদ অর্থ রয়েছে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর চাহিদা পর্যায়ক্রমে পূরণ করা হবে বলেও তারা জানিয়েছেন। তবে ব্যাংকগুলো বলছে, বাস্তবে তারা প্রয়োজনীয় সরবরাহ পাচ্ছে না।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদের আগে নগদ টাকার এই সঙ্কট শুধু ব্যাংকিং কার্যক্রমেই নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষিপণ্য ক্রয়-বিক্রয় এবং পশুর হাটের লেনদেনে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। একই সাথে গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে ব্যাংক থেকে অতিরিক্ত নগদ উত্তোলনের প্রবণতা আরও বাড়তে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে।

অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত নগদ সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বিত নগদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানো এবং গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনাও জরুরি। না হলে ঈদ সামনে রেখে দেশের ব্যাংকিং খাতে নগদ সঙ্কট আরো গভীর হতে পারে।