সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী বলেছেন সংসদীয় গণতন্ত্রে রাজনৈতিক বিতর্ক থাকবেই, এটাকে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত হিসেবে দেখলে চলবে না। কবরের শান্তি হয় অটোক্র্যাসিতে। স্বৈরাচারী সরকারের সময় বিতর্ক থাকে না। তবে রাজনৈতিক বিতর্ক বা দ্বন্দ্ব যেন সংসদের ভেতরেই থাকে। কিছু কিছু সংসদের বাইরেও যাবে কারণ সেটাও গণতন্ত্রের জন্য সহায়ক কিন্তু দ্বন্দ্ব বা সঙ্ঘাত ‘টু মাচ’ করতে দেয়া যাবে না তাহলে ফ্যাসিজম ফিরে আসার সুযোগ পাবে বা সে সুযোগ করে দেয়া হবে। বাঙালি মনে হয় বেশি দিন আরামেও থাকতে পারে না। এটা আমার চাছাছোলা কথা মানে বেশি হইহই করলে যারা চলে গেছে তারা আর যাই হোক তারা তো বেকুব না, তারা ঠিকমতো সময়ে চলে আসবে, আর এবার আসলে এক্কেবারে...
আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, এত তাড়াতাড়ি হুলুস্থুল করাটা ঠিক হবে না। আমাদের আস্তে ধীরে পার্লামেন্টকে কার্যকর করে তুলতে হবে। এটা খুবই স্লো প্রসেস। নয়া দিগন্তকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আবুল হাসান চৌধুরী বলেন, আওয়ামী লীগ যদি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় দেশের রাজনীতিতে ফিরে আসে সেটাতে কারো কিছু বলার নাই। ভালো আওয়ামী লীগ, খারাপ আওয়ামী লীগের কথা না। কিন্তু তার আগে তাদের সিনসিয়ার, আন্তরিক অনুশোচনার প্রয়োজন আছে। অনুশোচনা হলেও ‘ইট ইজ টু আর্লি’, একটা সময় আসুক, নরমালি আসলে আসবে। অনুশোচনা হলেই তো কেবল হয় না, তাহলে তো ‘এনি মার্ডারার ক্যান চে’, হ্যাঁ হ্যাঁ আমি অনুশোচনা করছি। একটা প্রিয়ড যেতে হবে।
সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিহেভিয়ার খুব ভালো লাগে, লাগছে। লিডার এইরকমই তো হওয়া উচিত। সংসদে জ্বালানিমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। এটাই আমরা চাই এবং আশা করি এটা প্রিভেইল করবে। কেউ তো এত গর্দভ তো হতে পারে না যে নিজেরা কামড়াকামড়ি করে ফ্যাসিস্টকে জায়গা করে দেবে। পলিটিক্যাল কনফ্রনটেশন উইল বি ডিজাস্টার ফর দ্য কান্ট্রি। পলিটিক্যাল কনফ্রনটেশন চাইবে ইন্ডিয়া, চাইবে আমেরিকা।
নয়া দিগন্ত : আপনি দীর্ঘদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন, নতুন সরকার কি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে আগাতে পারছে?
আবুল হাসান চৌধুরী : মোর্শেদ খান সাহেব (বিএনপি শাসনামলে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী) একটা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি সবার পরামর্শ নিতেন। মাঝে মধ্যে পুরনো রিটায়ার্ড ফরেন সেক্রেটারি যারা আছেন, ফারুক সোবহান, শফি স্বামী এমন কিছু লোকজন আছেন, যারা নির্দলীয়, আমাদের সাথে আইডিয়া শেয়ার, আইডিয়া হতে পারে থার্ড ক্লাস এ যুগের পরিপ্রেক্ষিতে, তারপরও পরামর্শ করে কিছু কাজ করা যায়। ঘণ্টা তিনেক আলোচনা করে একটা কনক্লুসনে আসা যায়। আমার দৃষ্টিতে চীনের সাথে সম্পর্ক আরো জোরালো হওয়া উচিত। সেটা একটু হচ্ছে না।
নয়া দিগন্ত : তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ শুরুর জন্য চীন বলল আমরা বসে আছি?
আবুল হাসান চৌধুরী : তো আমরা যাই না কেনো? এই সরকার আসার পর এই দল একটা হাইলেভেল ভিজিট চীনে দেখি নাই। হোয়াট সিগন্যাল আর ইউ গিভিং? ফরেন মিনিস্টার দিল্লিতে গিয়েছেন খুব ভালো কাজ করেছেন। নেইবারের সাথে ঝগড়া করে টিকতে পারবেন না বলব না, অসুবিধা হয়। ফেয়ার এনাফ। দে শুড অলশো বি ভিজিট টু চায়না।
নয়া দিগন্ত : রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসনে তো চীনের সহায়তা দরকার
আবুল হাসান চৌধুরী : রোহিঙ্গা সঙ্কট নিরসন চীন ছাড়া সম্ভব নয়। ভারত পারবে না, করবেও না। শান্তিতে থাকতে দেবে না ভারত।
নয়া দিগন্ত : গঙ্গা চুক্তির মেয়াদও তো শেষ হয়ে গেল?
আবুল হাসান চৌধুরী : গঙ্গা নিয়েও আলোচনা করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক একটা উদ্যোগ দরকার অবশ্যই। ফরেন পলিসির ওপর একটা সুন্দর আলোচনা দরকার। আমি বুঝি এটা টু আর্লি। আমি নিশ্চিত সার্ক ভারত হতে দেবে না। ভালো লবিং করলে ওয়েস্টার্ন ওয়ার্ল্ডে, আমেরিকা হোক, ইউরোপ হোক, ডাজ আমেরিকা কেয়ার ফর ইন্ডিয়া নাও? ওদের উদ্যোগে যদি ওরা কিছু থিংক ট্যাংক গড়ে তোলে, কিছু অর্গানাইজেশন আনে, এনটায়ারলি গভর্নমেন্ট লেভেলে না হোক দেশগুলো যদি একটা থিংক ট্যাংক গড়ে তোলে তাহলে ইন্ডিয়া না করতে পারবে? ওয়েস্ট মিনিস্টার লক্ষ্য করলে দেখবেন প্রচুর আলোচনা হয় মন্ত্রীদের সাথে। সংসদের বাইরেও মন্ত্রীদের সাথে প্রচুর মতবিনিময় হওয়া উচিত বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে। পার্লামেন্ট শুধু ইন ইটসেল্ফ পার্লামেন্ট থাকে না।
নয়া দিগন্ত : কিন্তু পলিটিক্যাল কনফ্রনটেশনের ছায়া থাকলে তো কোনো উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না
আবুল হাসান চৌধুরী : পলিটিক্যাল কনফ্রনটেশন উইল বি ডিজাস্টার ফর দ্য কান্ট্রি। পলিটিক্যাল কনফ্রনটেশন চাইবে ইন্ডিয়া, চাইবে আমেরিকা।
নয়া দিগন্ত : জুলাই আন্দোলনের পর তো সে সুযোগ নাই?
আবুল হাসান চৌধুরী : জুলাই আন্দোলনের পর আমরা আমাদের লক্ষ্যমাত্রা থেকে বিচ্যুত হতে পারি না। এটা আমাদের অঙ্গীকার। এটা রক্তের অঙ্গীকার। রেভ্যুলিউশন হ্যাজ এ সাইনটিটি, বিপ্লবের একটা অন্যরকম তাৎপর্য আছে। এটা বিপ্লব, এটা কোনো লিখিত আকারে হয় না।
নয়া দিগন্ত : তরুণদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?
আবুল হাসান চৌধুরী : তাদের পড়াশোনার দিকে যেতে হবে। যে জাতি পড়াশোনায় আলোকিত না হয় কোনোদিনই সে জাতি উঠতে পারে না। অন্যের হাতে হাত রেখে উঠতে পারবেন না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রিসার্চ জিরো, একেবারেই মাইনাস জিরো। গবেষণা ছাড়া কোনো বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রযাত্রা করতেই পারে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে হারিকেন জ্বালিয়ে কাজ করতে করতে আইনস্টাইন থিউরি এসেছে একসময়। মেঘনাদ সাহা, মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কুদরাত-ই-খোদা দেখিয়ে গেছেন কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবহার করতে হয়। পড়াশোনার পরিবেশে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ফিরে যেতে হবে। ৩৬ জুলাই ফ্যানটাসটিক কাজ হয়েছে। এই সুযোগে বলছি, এখন যারা ডাকসুর নেতৃবৃন্দ আমি তাদের স্যালুট করি। আই এ্যাম ভেরি হ্যাপি। এ রকম ডাকসুর নেতৃবৃন্দ হয় নাই। আমি যাকে শ্রদ্ধা করি, জান প্রাণ দিয়ে ভালোবাসি এমন নেতৃবৃন্দ হয় নাই। আমাদের সময় ডাকসুর নেতৃবৃন্দ যেমন- আ স ম আব্দুর রব ভাই, নূরে আলম ভাই বলীষ্ট ছিলেন। এরা খুব ভালো, ভদ্র ছেলেপেলে, এরা একটা নতুন আমেজ সৃষ্টি করেছে ডাকসুতে। ভেরি গুড, ভেরি গুড। এটাও একটা বিপ্লব।
নয়া দিগন্ত : আমাদের সচেতনভাবেই এগিয়ে যেতে হবে?
আবুল হাসান চৌধুরী : হুজ্জাতে বাঙ্গালী বলে একটা কথা আছে, এত তাড়াতাড়ি হুলুস্থুল করাটা ঠিক হবে না। আমাদের আস্তে ধীর পার্লামেন্টকে কার্যকর করে তুলতে হবে। এটা খুবই স্লো প্রসেস। এখানো তাড়াহুড়া করা যাবে না।
নয়া দিগন্ত : পার্লামেন্টের বাইরেও তো বোঝাপড়া দরকার?
আবুল হাসান চৌধুরী : পার্লামেন্টের বাইরে তো কোনো কথাবার্তাই নাই। সবদেশেই এটা হয়। আমি যে সরকারের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম, আমরাও করি নাই। বিরোধী দলের প্রতি তখন শাসক দলের কি ধরনের হুইপ অ্যাটিচিউড ছিল। সেই অ্যাটিচিউড এখন না করলেই হয়। সেই অ্যাটিচিউড থেকে বের হয়ে আসাই তো বিপ্লব। সকল মত বা ভিন্ন মতের লোকজনের কথা শুনলে তো সরকারের অসুবিধা নাই। তাদের কথা তো বাইন্ডিং না।
নয়া দিগন্ত : এতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সহজ হয়, যেমন অর্থনৈতিক খাতেও এখন শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি?
আবুল হাসান চৌধুরী : বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান মনসুর সাহেব যথেষ্ট একটা বলীষ্ট ভূমিকা রেখেছিলেন। এটা বুঝলাম না কি হলো...
নয়া দিগন্ত : ইরান যুদ্ধের পর জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে কি আমাদের চিন্তাভাবনা করা দরকার?
আবুল হাসান চৌধুরী : চীনের সাথে একটা গভীরতম সম্পর্ক প্রয়োজন। চীনের সাথে গভীর সম্পর্ক থাকার কারণে ট্রাম্প কি একবারও বলছে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে যে তোমার দেশে সহায়তা পাঠাবো না। চীনের সাথে পাকিস্তান একেবারে রক্তের সম্পর্কের জায়গায় চলে গেছে। ভারতের নীতিই হচ্ছে সবাইকে খোঁচাও। আমাদের প্র্যাকটিক্যালি চিন্তাভাবনা করতে হবে, দেয়ার শুড গুড ট্রিপ টু চায়না। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্যই অ্যাডভান্স হিসেবে একমাত্র দেশ চীনই আপনার পাশে দাঁড়াতে পারে। সম্মান রেখেই বলছি আমাদের কূটনীতিকরা অনেক সময় কথাই বলতে পারেন না। কূটনীতিতে আমাদের তরুণদের দে নিড টু বি চার্জ, গড়ে তুলতে হবে। আমাদের বয়স যখন ১৬/১৭ তখন জুলফিকার আলী ভুট্টোকে দেখে বিমোহিত হতাম। পাকিস্তান আর ভুট্টোর মতো তেমন কাউকে পায়নি। কিন্তু ইন্ডিয়ার জয়শঙ্কর আছে। জয়শঙ্করের ইন্টারভিউগুলো লক্ষ্য করলে দেখবেন কি ফ্যানটাসটিক। একাত্তরে কৃষ্ণ মেনন যখন পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন চাইতে গিয়েছিলেন তখন পশ্চিমাদেশগুলো বলেছিল তোমরা তো রাশিয়ার কাছ থেকে সমর্থন নিচ্ছ। কৃষ্ণ মেনন পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তোমরাও তো রাশিয়ার কাছে গিয়েছিলে। তো বাংলাদেশকে ছোট দেশ হিসেবে দেশ রক্ষার পরেই কিন্তু শক্তিশালী পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে হবে।



