ফিরে দেখা জুলাই ’২৪

শিক্ষক-অভিভাবকদের সংহতি, আন্দোলনে নতুন মোড়

Printed Edition
শিক্ষক-অভিভাবকদের সংহতি, আন্দোলনে নতুন মোড়
শিক্ষক-অভিভাবকদের সংহতি, আন্দোলনে নতুন মোড়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি

২০২৪ সালের ২ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন নতুন এক পর্যায়ে পৌঁছে। শিক্ষার্থীদের সাথে প্রকাশ্যে সংহতি জানান শিক্ষক, অভিভাবক, সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার নাগরিক। একই দিনে আন্দোলনের সমন্বয়করা ৯ দফা দাবিতে ৩ আগস্ট দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং ৪ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ আন্দোলনের ঘোষণা দেন, যা আন্দোলনের গতিপথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে।

রাজধানী ঢাকায় জুমার নামাজের পর সায়েন্স ল্যাবরেটরি এলাকা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উদ্যোগে গণমিছিল বের হয়। মিছিলে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীরা ৯ দফা দাবির পক্ষে স্লোগান দেন এবং দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। একই সময় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম থেকে সাধারণ মুসল্লিরাও বিক্ষোভ মিছিল বের করে সহিংসতায় নিহতদের বিচার, গণগ্রেফতার বন্ধ এবং আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবি জানান।

পাশাপাশি ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিসহ বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও গণমিছিলে অংশ নেন। ঢাকার বাইরে খুলনা, সিলেটসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্ষোভ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

অন্য দিকে রংপুরে আন্দোলনের চিত্র ছিল ভিন্ন মাত্রার। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) প্রধান ফটকের সামনে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা একত্র হয়ে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা ও সমাবেশ করেন। সাধারণ শিক্ষকরা সরাসরি আন্দোলনে অংশ নিয়ে নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদসহ সব হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার, আটক শিক্ষার্থীদের মুক্তি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

সমাবেশে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, তাদের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে হামলা, নির্যাতন ও গুলিবর্ষণের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা করা হয়েছে। অভিভাবকরাও সন্তানদের ন্যায্য দাবির প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীদের পাশে তারা শেষ পর্যন্ত থাকবেন।

এর আগের দিন, ১ আগস্ট, বেরোবি ক্যাম্পাসে অন্তত ৪৫ জন শিক্ষক নীরব মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং সব হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।

এ দিকে আন্দোলনের সময় গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন শিক্ষার্থীও এ সময় আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পান। রংপুরে ১ ও ২ আগস্ট পর্যায়ক্রমে একাধিক শিক্ষার্থী জামিন লাভ করেন, যা আন্দোলনকারীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি করে।

দিনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদের ঘোষিত কর্মসূচি। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে হামলা ও হত্যার প্রতিবাদ এবং ৯ দফা দাবিতে ৩ আগস্ট দেশব্যাপী বিক্ষোভ এবং ৪ আগস্ট থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ‘সর্বাত্মক অসহযোগ’ আন্দোলন শুরু হবে। একই সাথে তিনি দেশের সর্বস্তরের মানুষকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।

পরবর্তীকালে বিশ্লেষকদের মতে, ২ আগস্ট ছিল জুলাই আন্দোলনের এমন একটি দিন, যখন শিক্ষার্থীদের দাবির সাথে শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ আরো বিস্তৃত হয় এবং আন্দোলন কেবল শিক্ষার্থীদের সীমায় আবদ্ধ না থেকে একটি বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের রূপ নিতে শুরু করে। একই সাথে অসহযোগ আন্দোলনের ঘোষণার মাধ্যমে পরবর্তী কয়েক দিনের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের ভিত্তিও এই দিনেই তৈরি হয়।