গণভোট অধ্যাদেশ ঘিরে বিতর্ক

কার্যত বাতিল চায় বিএনপি, বহাল দাবি জামায়াতের

Printed Edition
গণভোট অধ্যাদেশ ঘিরে বিতর্ক
গণভোট অধ্যাদেশ ঘিরে বিতর্ক

নিজস্ব প্রতিবেদক

জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা, জাতীয় সনদ এবং গণভোট- এই তিনটি ইস্যুকে কেন্দ্র করে রাজনীতি ও সংসদীয় প্রক্রিয়া আবারো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি করা শতাধিক অধ্যাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গঠিত বিশেষ কমিটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও, গণভোটসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।

এক দিকে সরকার বলছে, সংবিধান ও জুলাই সনদের আলোকে সব সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। অন্য দিকে বিরোধী দল অভিযোগ করছে, গণভোট ও সনদের মূল চেতনাকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

গতকাল বুধবার সংসদ ভবনে বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিশেষ কমিটির সভাপতি এবং বিরোধী দলের প্রতিনিধিরা সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন। এতে স্পষ্ট হয়েছে, অধ্যাদেশগুলোর বড় অংশে ঐকমত্য এলেও কিছু মৌলিক বিষয়ে এখনো সমাধান আসেনি। কমিটি ১৮-২০টি বিষয়ে এখনো ঐকমত্যে আসতে পারেনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী ২৯ মার্চ রাত ৮:৩০ মিনিটে পরবর্তী সেশনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ওই বৈঠকে বাকি থাকা বিষয়গুলোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

অধিকাংশ অধ্যাদেশে ঐকমত্য, ২ এপ্রিল জমা চূড়ান্ত প্রতিবেদন

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে জারি হওয়া অধ্যাদেশগুলোর ব্যাপক পর্যালোচনার পর অধিকাংশ বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে বিশেষ কমিটি। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রায় ১২০টির বেশি অধ্যাদেশের ওপর সিদ্ধান্ত প্রায় চূড়ান্ত হয়েছে।

তিনি বলেন, আমরা অধিকাংশ অধ্যাদেশ পর্যালোচনা শেষ করেছি। কোনগুলো বহাল থাকবে এবং কোনগুলো বাতিল হবে- সে বিষয়ে মোটামুটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।

আইনমন্ত্রী জানান, এই বিস্তৃত পর্যালোচনার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন আগামী ২ এপ্রিল জমা দেয়া হবে। তবে যেসব বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়ে গেছে, সেগুলো নিয়ে আগামী ২৯ মার্চ আরেকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকেই বাকি অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার চেষ্টা করা হবে।

তিনি আরো বলেন, এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অধ্যাদেশগুলোকে স্থায়ী আইনে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়া হবে। সে লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংশোধন শেষে বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করা হবে।

জুলাই সনদ পাশ কাটানো হবে না

জুলাই সনদকে ঘিরে চলমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে আইনমন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কোনো অবস্থাতেই এই সনদ বা সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে না।

তার ভাষায়, জুলাই সনদ আমাদের কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি দলিল। এর অনেকগুলো ধারা বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন অপরিহার্য। আমরা সংবিধান ও জুলাই সনদকে প্রাধান্য দিয়েই সব পদক্ষেপ নিচ্ছি।

তিনি উল্লেখ করেন, সনদের নির্দিষ্ট ধারাগুলোর আলোকে ৮৪টি অনুচ্ছেদের মধ্যে ১ থেকে ৪৭ পর্যন্ত অংশ বাস্তবায়নে সাংবিধানিক সংশোধন প্রয়োজন। এ পরিপ্রেক্ষিতে তিনি সতর্ক করে বলেন, যারা এই সনদকে পাশ কাটিয়ে ভিন্ন কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়, তারা মূলত সনদের পরিপন্থী অবস্থান নিচ্ছে।

আইনমন্ত্রী আরো জানান, নির্ধারিত ৩০ দিনের সাংবিধানিক সময়সীমার মধ্যেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য সরকার কাজ করছে। ২ এপ্রিল প্রতিবেদন জমা দেয়ার পর প্রচলিত আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সংশ্লিষ্ট বিলগুলো সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

অধ্যাদেশ তিন ভাগে বিভক্ত, জুলাই সুরক্ষাতে সর্বসম্মতি

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশকে তিনটি পৃথক শ্রেণীতে ভাগ করে সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। প্রথমত, যেসব অধ্যাদেশে কোনো বিতর্ক নেই, সেগুলো অপরিবর্তিত অবস্থায় বিল আকারে পাস করা হবে। দ্বিতীয়ত, কিছু অধ্যাদেশে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে নতুনভাবে বিল আনা হবে। তৃতীয়ত, যেসব বিষয়ে ঐকমত্য অর্জিত হবে না, সেগুলো আপাতত ল্যাপস (বাতিল) হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে নতুনভাবে উপস্থাপনের সুযোগ রাখা হবে।

তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ‘জুলাই সুরক্ষা’ সংক্রান্ত চারটি অধ্যাদেশে কমিটির সব সদস্য একমত হয়েছেন এবং এগুলো হুবহু সংসদে উপস্থাপন করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ এবং সাংবিধানিকতা- এই দুই বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই আমরা প্রতিটি অধ্যাদেশ বিবেচনা করছি।’

তিনি আরো জানান, সংসদীয় বিধান অনুযায়ী নতুন বিল পাসের আগে বিদ্যমান অধ্যাদেশগুলো অনুমোদন করানো জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে কোনো আইনি জটিলতা তৈরি না হয়।

তবে অধিকাংশ অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা শেষ হলেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। এসব বিষয়ে আরো গভীর আলোচনা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।

সব মিলিয়ে, অধ্যাদেশ পর্যালোচনার এই প্রক্রিয়া এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে এটি কেবল একটি আইনি রূপান্তরের বিষয় নয়; বরং এটি জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক অঙ্গীকার, সাংবিধানিক কাঠামো এবং জনআকাক্সক্ষার সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। আগামী কয়েকটি বৈঠক ও ২ এপ্রিলের চূড়ান্ত প্রতিবেদন- এই পুরো প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

গণভোট ইস্যুতে তীব্র আপত্তি বিরোধী দলের, বিতর্কে উত্তপ্ত কমিটি

গণভোটকে ঘিরে নতুন করে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ কমিটির বৈঠকে। বিরোধী দলের সদস্যদের অভিযোগ, সরকার গণভোটসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিল বা কার্যত অকার্যকর করে দেয়ার চেষ্টা করছে, যা জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনার পরিপন্থী।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান জানান, দুই দিনব্যাপী আলোচনায় মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে প্রায় ১১৫টি বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তবে ১৮ থেকে ২০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। এসব বিষয়ে সরকারপক্ষ প্রস্তাব উত্থাপন করলেও বিরোধী দলের আপত্তির কারণে সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখে পরবর্তী বৈঠকে আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘গণভোটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপস্থাপন করে সেটি রহিত করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে, যা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারি না। গণভোট অস্বীকার করলে জুলাই চেতনারই অবলুপ্তি ঘটে।’

রফিকুল ইসলাম খানের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কমিটির বৈঠকে অংশ নেয়া জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, কার্যত এমন একটি প্রস্তাব আনা হয়েছিল যাতে সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশটি পাস না হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ল্যাপস হয়ে যায়। ‘আমরা স্পষ্টভাবে এর বিরোধিতা করেছি,’ বলেন তিনি।

দুদক চেয়ারম্যান নিয়োগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও আপত্তি তুলেছে বিরোধী দল। রফিকুল ইসলাম খান বলেন, আগে এসব নিয়োগে একটি স্বচ্ছ সার্চ কমিটিব্যবস্থা ছিল। কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে সেই ব্যবস্থা বাদ দিয়ে সরাসরি সরকারের হাতে নিয়োগের ক্ষমতা দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই ধরনের প্রবণতা পুলিশ কমিশনার ও আইজিপি নিয়োগেও লক্ষ করা যাচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। এটি পেশাদারিত্বের পরিবর্তে রাজনৈতিক পছন্দকে প্রাধান্য দেয়ার শামিল, যা জুলাই চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী, তিনি যোগ করেন।

একই বিষয়ে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, জুলাই সনদে নিরপেক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়ার কথা বলা হলেও, প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে সেটি বাতিল করে সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা এটিকে গ্রহণযোগ্য মনে করি না।

তিনি আরো বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল দু’টি অঙ্গ ছিল- সংস্কার ও বিচার। সেই লক্ষ্যেই গুম কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সরকার এখন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার যুক্তি দেখিয়ে এসব অর্জনকেও বাতিল করার প্রস্তাব তুলছে, যা জনগণ মেনে নেবে না।

গণভোট প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান নিয়ে নাজিব মোমেন বলেন, ‘সরকার এটিকে বেআইনি ও এখতিয়ারবহির্ভূত দাবি করে বাতিলের কথা বলছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো আইন বেআইনি কি না, সেটি নির্ধারণের এখতিয়ার আদালতের। সংসদে বসে কোনো আইনকে একতরফাভাবে বেআইনি ঘোষণা করা বা বাতিলের উদ্যোগ নেয়া গ্রহণযোগ্য নয়।’

সংসদে সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম খান সতর্ক করে বলেন, ‘অতীতে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার দোহাই দিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যার ফল ভালো হয়নি। এমন অহঙ্কার কোনো জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনে না।’

কমিটির সদস্য, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান বলেন, ‘গণভোট মানে জনগণের সরাসরি রায়। সেই রায় অস্বীকার করলে সরকার জনকল্যাণমূলক থাকতে পারে না, বরং গণবিরোধী হয়ে ওঠে। গণভোটের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলনও থামবে না।’

তিনি অভিযোগ করেন, সরকারপক্ষ আলোচনায় সময় নেয়ার কথা বললেও বাস্তবে তারা দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে।

অন্য দিকে বিশেষ কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেন, বেশ কিছু বিষয়ে ইতোমধ্যে ঐকমত্য হয়েছে, যেখানে কোনো বিরোধ ছিল না। তবে প্রায় ২০টি বিষয়ে আরো স্পষ্টতা প্রয়োজন। এ কারণে আগামী ২৯ মার্চ রাতে পরবর্তী বৈঠক নির্ধারণ করা হয়েছে।

তিনি জানান, সংসদের বিধান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অধ্যাদেশগুলো পাস না হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ল্যাপস হয়ে যাবে। তাই প্রতিটি অধ্যাদেশ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে সংশোধন করে ভবিষ্যতে বিল আকারে পুনরায় উপস্থাপনের সুযোগও রয়েছে।

গণভোট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই বিষয়ে বৈঠকে তেমন কোনো চূড়ান্ত আলোচনা হয়নি। আমরা না এটিকে বাতিল করার প্রস্তাব দিয়েছি, না বহাল রাখার। বিষয়টি সংবিধানের আলোকে আরো আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।’

সরকারের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যদি বিশেষ কমিটিতে ঐকমত্য না হয়, তাহলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংসদই।’

সবমিলিয়ে, অধ্যাদেশ যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে পৌঁছালেও এটি কেবল আইনি বা প্রশাসনিক বিষয় নয়; বরং জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জনগণের প্রত্যাশার সাথে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট। সরকার ও বিরোধী দলের এই টানাপড়েন শেষ পর্যন্ত কোন পথে গড়ায়, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।