চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম মহানগরীতে জুলাই আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা একে জুলাই চেতনা মুছে দেয়ার সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র বলে অভিহিত করেছেন। জাতীয় নাগরিক পার্টি বলছে এই গ্রাফিতি প্রতিবাদী চেতনার প্রতীক। দেয়াল থেকে গ্রাফিতি মুছে ফেলা গেলেও মানুষের হৃদয় থেকে জুলাইয়ের স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে না। তাদের অভিযোগের তীর চসিকের দিকে। অপর দিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা: শাহাদাত হোসেন বলছেন- গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগ ‘ডাহা মিথ্যা’ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। গ্রাফিতি ইস্যুতে উত্তেজনার মাঝেই এনসিপি সমর্থকরা গতকাল সোমবার সকালে সেখানে গ্রাফিতি আঁকা কর্মসূচি ঘোষণা করলেও বিএনপিও একই কর্মসূচি দেয়। এ ছাড়া গতকাল দুপুরে একদল শিক্ষার্থী গ্রাফিতি আঁকতে গিয়ে পুলিশী বাধার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার নগরীর জিইসি হতে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সড়কের আশপাশে জনসমাবেশ ও মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন।
এনসিপির অভিযোগ, শহীদ ওয়াসিম আকরাম উড়ালসড়কের পিলারে আঁকা জুলাই আন্দোলনের কয়েকটি গ্রাফিতির ওপর সাদা ও হলুদ রং করে দেয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সংক্রান্ত ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর দলটির নেতা-কর্মীরা দাবি করেন, চসিক মেয়র ডা: শাহাদাত হোসেনের নির্দেশেই এসব গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে।
ঘটনার প্রতিবাদে রোববার রাতে এনসিপির নেতা-কর্মীরা টাইগার পাস এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরে চসিক কার্যালয়ের আমবাগানমুখী প্রবেশপথের সামনে সড়কে রং দিয়ে বিভিন্ন স্লোগানও লেখেন তারা। এনসিপির অবস্থানের খবর পেয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরাও সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ দিকে গতকাল বেলা ১টার দিকে স্কুল ও কলেজের পোশাক পরা একদল ছেলে মেয়ে রং তুলি নিয়ে টাইগারপাস মোড়ে জড়ো হয়। তারা নিজেদের সাধারণ শিক্ষার্থী দাবি করে বিভিন্ন দেয়ালে গ্রাফিতি আঁকার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ তাদের বাধা দেয়। পুলিশের বাধার মুখে গ্রাফিতি আঁকতে না পেরে ক্ষোভ জানান তারা। বলেন, জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার মাধ্যমে জুলাই আন্দোলনকে সাধারণ মানুষের মন থেকে মুছে ফেলার অপচেষ্টা করছে সিটি করপোরেশন। জুলাই যোদ্ধা হিসেবে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের ঘরে বসে থাকার উপায় নেই। তাই এনসিপির বা ছাত্রদলের ডাকে নয় বিবেকের তাড়না থেকে নতুন করে গ্রাফিতি আঁকতে এসেছেন তারা।
টাইগারপাসে গ্রাফিতি আঁকতে বাধা দেয়া প্রসঙ্গে নগর পুলিশের (দক্ষিণ) উপ-পুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া বলেন, জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। এই এলাকার মধ্যে কোনো ধরনের জমায়েত করা যাবে না। দুপুরের দিকে কয়েকজন শিক্ষার্থী গ্রাফিতি আঁকার চেষ্টা করে। ওই সময় মহিলা পুলিশের সদস্যরা তাদের পরিচয় জানতে গেলে পুলিশের দিকে রং ছুড়ে মারে। এ সময় কিছুটা কথা কাটাকাটি হয়েছে। সেখানে কোনো বাধা দেয়া হয়নি।
গ্রাফিতি মোছার অভিযোগ ভিত্তিহীন : মেয়র শাহাদাত
গতকাল সোমবার টাইগারপাসস্থ চসিক কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা: শাহাদাত হোসেন নগরীতে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগকে “ডাহা মিথ্যা” ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একটি মহল “ঘোলা পানিতে মাছ শিকার” করার চেষ্টা করছে।
মেয়র ডা: শাহাদাত হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার জন্য তিনি কখনো কোনো নির্দেশ দেননি এবং ভবিষ্যতেও দেবেন না। তিনি জানান, নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ নিয়মিতভাবে নির্দিষ্ট সময় পরপর বিভিন্ন পিলার ও দেয়াল থেকে পোস্টার-ব্যানার অপসারণ ও রং করার কাজ করে থাকে। টাইগারপাসসহ যেসব স্থানে রং করা হয়েছে, সেখানে মূলত পোস্টার দিয়ে ঢাকা ছিল এবং দৃশ্যমান কোনো গ্রাফিতি ছিল না।
তিনি বলেন, জুলাই-আগস্টের চেতনার বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি নিজে দীর্ঘ ১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন করেছি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম আমারই অনুসারী ছিল।
মেয়র বলেন, কেউ গ্রাফিতি করতে চাইলে আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে শৈল্পিক ও মানসম্মত গ্রাফিতি আঁকতে পারে। এ ধরনের উদ্যোগে তিনি ব্যক্তিগতভাবে কিংবা সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে অর্থায়নের আশ্বাসও দেন।
এনসিপির বিবৃতি
টাইগারপাস এলাকায় জুলাই আন্দোলনের স্মারক গ্রাফিতি অপসারণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি। সংগঠনটির দাবি, এসব গ্রাফিতি শুধু দেয়ালচিত্র নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগ, গণমানুষের আকাক্সক্ষা ও প্রতিবাদী চেতনার প্রতীক। এগুলো অপসারণ করে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন স্থাপনের উদ্যোগ জনমনে ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, গ্রাফিতি মুছে ফেলার পর এনসিপি ও জুলাইয়ের সহযোদ্ধারা পুনরায় দেয়ালচিত্র আঁকার উদ্যোগ নিলে কিছু বিএনপি নেতা-কর্মী তাতে বাধা দেন। অথচ পুরো সময়জুড়ে কোথাও যানচলাচল বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি। দেয়াল থেকে গ্রাফিতি মুছে ফেলা গেলেও মানুষের হৃদয় থেকে জুলাইয়ের স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে না। জনগণের আবেগ, শহীদদের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক প্রতীককে রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার উপকরণে পরিণত না করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
মিছিল-সমাবেশে সিএমপির নিষেধাজ্ঞা
নগরের জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও আশপাশ এলাকায় সব ধরনের জনসমাবেশ, মিছিল ও মিটিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে সিএমপি। সোমবার সিএমপি সদর দফতর থেকে জারি করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
এতে বলা হয়, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তার স্বার্থে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৩০ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।
সিএমপির পুলিশ কমিশনার হাসান মো: শওকত আলী স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।



