আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উত্তপ্ত বিতর্ক

আইনজীবীর আচরণে চরম ক্ষুব্ধ বিচারপতি

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ চলাকালে গতকাল মঙ্গলবার এক উতপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এক সাক্ষীর জবানবন্দী নথিবদ্ধ করাকে কেন্দ্র করে বিচারপতি ও আসামি পক্ষের আইনজীবীর মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে আইনজীবী পরকাল ও ধর্মীয় প্রসঙ্গ টেনে মন্তব্য করলে বিচারপতির চরম ক্ষোভের মুখে পড়েন এবং তাকে আদালত কক্ষ থেকে বের করে দেয়ার হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দেয়া হয়।

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এজলাস কক্ষে সাক্ষ্য গ্রহণ চলাকালে গতকাল মঙ্গলবার এক উতপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গুম ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এক সাক্ষীর জবানবন্দী নথিবদ্ধ করাকে কেন্দ্র করে বিচারপতি ও আসামি পক্ষের আইনজীবীর মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে আইনজীবী পরকাল ও ধর্মীয় প্রসঙ্গ টেনে মন্তব্য করলে বিচারপতির চরম ক্ষোভের মুখে পড়েন এবং তাকে আদালত কক্ষ থেকে বের করে দেয়ার হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দেয়া হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় সাবেক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের জেআইসি (জয়েন্ট ইন্টারগেশন সেল) সেলে গুম করে রাখার অভিযোগে দায়েরকৃত একটি মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালীন। মামলাটিতে পঞ্চম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দী দিচ্ছিলেন নাজিম উদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সোমবার এই সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণের পর গতকাল মঙ্গলবার দিনভর তাকে জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবীরা। জেরার শেষ পর্যায়ে এসে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টে সাক্ষীর ‘পুনঃ জবানবন্দী’ বা রি-এক্সামিনেশনের অনুমতি চাওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ তখন প্রসিকিউশনের কাছে জানতে চান এই প্রক্রিয়ায় কত সময় লাগবে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী আদালতকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, এটি দুই মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে।

বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদের অনুমতির পর প্রসিকিউটর এস এম তাসমিরুল ইসলাম যখন সাক্ষীকে প্রশ্ন করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই আসামি পক্ষের আইনজীবীরা আপত্তি জানান। অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু আদালতকে বলেন, তারা চান প্রসিকিউশন পক্ষ থেকে পুনঃ জবানবন্দীর জন্য একটি আনুষ্ঠানিক লিখিত আবেদন আসুক এবং এরপর আদালত তা বিবেচনায় নিক। তবে বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এই দাবির সাথে একমত হননি। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে, নতুন করে লিখিত আবেদনের আর দরকার নেই এবং আদালত তার নিজস্ব এখতিয়ার থেকে এই সুযোগটুকু রাষ্ট্রপক্ষকে দিতে পারেন। এ সময় দুলু একটি আইনের ধারা আদালতে পড়ে শোনান। জবাবে বিচারপতি হাইকোর্টের একটি মামলার রেফারেন্স টেনে বিজ্ঞ আইনজীবীদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, কোনো আইনজীবী যদি কোর্টে এসে রেফারেন্স দেয়ার সময় আইনের কোনো দিক ভুলে যান, তবে উপস্থিত অন্য আইনজীবীরা (সেটি রাষ্ট্রপক্ষ হোক বা ডিফেন্স হোক) যদি সেই আইনটি জানেন তবে সহযোগিতা করতে পারেন। এতে আদালতের কাজের পরিবেশ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা অটুট থাকে।

আদালতের এই নির্দেশনার পর প্রসিকিউটর এস এম তাসমিরুল ইসলাম মামলার সাক্ষী নাজিম উদ্দিনকে প্রশ্ন করেন, ‘২০১৬ সালের ৫ মে গ্রেফতারের পর আপনি কোথায় ছিলেন?’ জবাবে সাক্ষী নাজিম উদ্দিন বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। তিনি আদালতকে বলেন, ২০১৬ সালের ১৫ মে থেকে পরবর্তী পাঁচ মাস তিনি ডিজিএফআইয়ের জেআইসি সেলে (যা আয়নাঘর হিসেবে পরিচিত) বন্দী ছিলেন। সেখান থেকে তাকে র‌্যাব-২ এ ৪০ দিন রাখা হয়, এরপর র‌্যাব-১০-এ এক রাত এবং সর্বশেষ র‌্যাব-৭ এ ৯ দিন রাখার পর একটি ‘মিথ্যা মামলা’ দিয়ে তাকে চট্টগ্রাম জেলহাজতে পাঠানো হয়।

সাক্ষীর এই জবানবন্দী যখন রেকর্ড করা হচ্ছিল, তখন আবারো বাধা দেন অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু। তিনি দাবি জানান যে, এই সাক্ষ্যের বিষয়ে আসামি পক্ষের যে আপত্তি আছে তা যেন নথিতে লিখে রাখা হয়। বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ তখন বলেন যে এটার কোনো প্রয়োজন নেই, তখনই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অ্যাডভোকেট দুলু মন্তব্য করেন, ‘আপনারা না লিখলেও কাল হাসরের ময়দানে এটি রেকর্ড থাকবে।’ একজন আইনজীবীর মুখে বিচারিক কার্য চলাকালীন এমন ধর্মীয় রেফারেন্স ও মন্তব্য শুনে প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন বিচারপতি। তিনি তৎক্ষণাৎ কড়া ভাষায় বলেন, ‘আপনি কী বলেন এসব? কোর্টে কি কেউ এভাবে কথা বলে? আপনাকে রুম থেকে বের করে দেয়া উচিত।’

এ ঘটনার পর এজলাসে কিছুক্ষণ থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর অ্যাডভোকেট দুলু কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেন এবং হাসিমুখে পরবর্তী তারিখ জানতে চান। কিন্তু বিচারপতির ক্ষোভ তখনো প্রশমিত হয়নি। দুলুর হাসিকে আদালতের প্রতি অসম্মান হিসেবে গণ্য করে বিচারপতি মো: শফিউল আলম মাহমুদ অত্যন্ত কঠোরভাবে বলেন, ‘আপনি কোর্টে দাঁড়াবেন না। বারবার হাসেন দাঁত কেলিয়ে কেলিয়ে।’ দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন আইনজীবীর এমন আচরণ এবং আদালত কক্ষের গাম্ভীর্য রক্ষায় বিচারপতির এই কঠোর অবস্থান উপস্থিত আইনজীবী ও সংবাদকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে আদালতের নির্ধারিত প্রক্রিয়া শেষ হলেও দিনভর আদালত প্রাঙ্গণে এই বাদানুবাদ ও ‘হাসরের ময়দান’ সংক্রান্ত মন্তব্যটি আলোচনার কেন্দ্রে ছিল।

জেআইসিতে গুম করে রাখার এই মামলায় ১৩ আসামির মধ্যে তিনজন সাবজেলে আছেন। তারা হলেন- প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিন পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো: সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। তাদের গতকাল ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।

মামলার অন্য ১০ আসামি পলাতক। পলাতক আসামিদের মধ্যে আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচ মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব:) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব:) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব:) হামিদুল হক।

পলাতক আসামিদের মধ্যে আরো আছেন ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব:) মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব:) মখছুরুল হক। আছেন আসামি গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব:) তারিক আহমেদ সিদ্দিক।

আগামী ২ জুন এই মামলার পরবর্তী সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণের জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়েছে।