রোজা কবুলের আলামত হৃদয়ের বিগলন

Printed Edition

লিয়াকত আলী

আজ মাহে রমজানুল মোবারকের ২৭ তারিখ। আর মাত্র দুই বা তিন দিন পর অফুরন্ত রহমতের মাস বিদায় নেবে। এ পর্যায়ে আমাদের উচিত আমাদের রোজা কবুল হচ্ছে কিনা বা কবুল হওয়া যোগ্য হচ্ছে কি না। কোনো ইবাদতের বিশেষত্ব ও তা কবুলযোগ্য হওয়ার একটি প্রমাণ এই যে, তা পালনের সময়ে অন্তর বিগলিত হবে, অন্তর নরম হবে এবং বিনয় ও ঈমানের চেতনা সৃষ্টি হবে। পক্ষান্তরে যখন অহমিকা ও অহঙ্কার এবং আত্মম্ভরিতা সৃষ্টি হবে, তখন মনে করতে হবে, আমার এই ইবাদত কবুল হয়নি। এতে ত্রুটি রয়ে গেছে। তাই এসব বিষয় মনে রাখা এবং এসব দোষ দূর করার চিন্তা থাকা প্রয়োজন। কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়া বা না বুঝে নিয়ত না করে রোজা রাখা, অন্য যেকোনো ইবাদতও এভাবে পালন করা অনর্থক। কেউ হয়তো রাজা রাখেন এজন্য যে, ইফতারের সময় যে স্বাদ অনুভব হয়, পৃথিবীর কোনো খাবারেই তা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ তিনি সারা দিন উপবাসের পর পূর্ণ ক্ষুধা ও আগ্রহের সাথে খাবার গ্রহণ করে তৃপ্তিলাভের উদ্দেশ্যে রোজা রাখেন। এমন নিয়তে রোজা রাখলে আসল উদ্দেশ্য বা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাকওয়া অর্জন হবে না। এজন্য আমাদের উচিত দিনে কয়েকবার নিয়ত সতেজ করা, রোজার উদ্দেশ্য সব সময় স্মরণ রাখা। রাসূলে আকরাম সা: ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন, আদম সন্তানের প্রতিটি কাজ তার জন্য এবং সে দশ থেকে সাত শ’ গুণ ছওয়াব পাবে। কিন্তু রোজা আমার জন্য এবং আমিই এটির প্রতিদান দেবো। এই বান্দা তার সব প্রিয়বস্তু আমার জন্যই পরিহার করে। তাই আমি নিজেই তার প্রতিদান দেবো।

দ্বিতীয়ত শরিয়তের যত রোকন রয়েছে সেগুলো পরস্পরে শক্তি সঞ্চারিত করে। অর্থাৎ এক ইবাদত আরেক ইবাদতের সহায়ক হয়, অন্য ইবাদতের শক্তি সঞ্চার করে। একটি খাদ্য যেমন অন্য খাদ্যের সহায়ক হয়, তেমনি একটি ফরজ আদায় অন্যান্য ফরজ আদায়ের জন্য সহায়ক হয়, তাতে শক্তি সঞ্চার করে। এমন নয় যে, প্রতিটি রোকন বিচ্ছিন্ন। অবশ্য প্রতিটির আবশ্যিকতা ও গুরুত্ব যথাস্থানে প্রযোজ্য। তবে একটি থেকে অন্যটি বিচ্ছিন্ন নয়। বরং একটি অপরটির সহায়তার জন্য। এভাবে রমজানের রোজা বছরের পুরো এগার মাসের ইবাদতের জন্য শক্তি জোগায়। রোজার কারণে অন্যান্য ইবাদত আদায়ে আগ্রহ উদ্দীপনা তৈরি হয় এবং শক্তি পাওয়া যায়।

তৃতীয়ত. রোজার উদ্দেশ্য প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণে আনা। রোজার কারণে প্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়, শরিয়তের বিধান পালনের আগ্রহ তৈরি হয়, অন্যান্য ইবাদত পালনের উৎসাহ জন্ম নেয়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন- হে মুমিনরা, তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো, যেমন তা ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের আগে যারা ছিল তাদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার। (সূরা বাকারা, আয়াত ১৮৩)

চতুর্থত. রোজাকে যেসব বিষয়ে সমৃদ্ধ করা হয়েছে সেগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে। রোজার উদ্দেশ্য এই প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তায়ালার প্রতি যেন বান্দার মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। শুধু রোজা রাখা হলো। কিন্তু নেই তেলাওয়াত, নেই সদকা খয়রাত, নেই তারাবিহ। তাহলে সেই রোজার ফল সামান্যই। বরং রমজানে গুরুত্ব দেয়া দরকার তওবা ইস্তেগফারে। দুয়ায় মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। শেষ রাতে উঠে তাহাজ্জুদ ও দোয়ায় আত্মনিয়োগ করা প্রয়োজন। কেননা এই সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ঘোষণা হতে থাকে- আছে কি আমার কোনো প্রিয় বান্দা, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। মহানবী সা: তাহাজ্জুদে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আত্মনিয়োগ করতেন। মানুষকে বুঝতে হবে- আমাদের ইবাদত কতটুকু। আমরা আল্লাহতায়ালার যথোপযুক্ত ইবাদত করতে পারি না। আমরা ভালোভাবে তওবা ইস্তেগফার করতে পারি না। এজন্য আমাদের উচিত অনাহারি, অসহায় ও দরিদ্রদের সহায়তা করা। তাহলে হয়তো আল্লাহর কোনো বান্দার অন্তর খুশি হবে। এতে আল্লাহ তায়ালা তা কবুল করে নেবেন। আর আমাদেরও উদ্দেশ্য সফল হবে। আমাদের ইবাদত, আমাদের তেলাওয়াত, আমাদের নামাজ কবুল হওয়ার যোগ্য নয়। তবে আল্লাহর পথে কিছু অর্থ ব্যয় করলে হয়ত এরই বদৌলতে তিনি সব ইবাদত কবুল করে নেবেন। এজন্য এ মাসে দান সদকার প্রতি পুরো মনোযোগ ও জোর দেয়া প্রয়োজন। তাহলে এ মাসের সুফল পাওয়া যাবে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, রমজান মাস শুরু হলে আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়- হে কল্যাণপ্রত্যাশী, তুমি অগ্রসর হও। আর হে অকল্যাণ প্রত্যাশী তুমি পিছিয়ে যাও।