একটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে হয়েছে জয় পরাজয়। এরপরও কি এমন ম্যাচ শেষে কখনই দুই দলের কোচ এবং খেলোয়াড়দের প্রাণ খুলে এমন কোলাকুলি আর হাসি বিনিময় করতে দেখেছেন? বরং অন্য সময়ে বহু কষ্টে হাত মিলিয়েই দায়িত্ব শেষ করেন কোচ-ফুটবলাররা। অথচ এই সেই ব্যতিক্রমধর্মী দৃশ্যই দেখেছেন মিয়ামির হার্ডরক স্টেডিয়ামের দর্শক এবং টিভি পর্দায় চোখ রাখা ফুটবল প্রেমীরা। কেনই বা তারা এমনটি করবেন না। ১০ গোলের একটি ম্যাচ। একদল গোল উৎসব করেছে ছয়বার অপর দল চারবার। অর্থাৎ উৎসব করতে করতে ‘ক্লান্ত’ সবাই। যেখানে বহু ম্যাচে একটি গোলই হয় না পুরো ম্যাচে। সেখানে ১০ গোল আর সাথে, বেশ কয়েকটি রেকর্ড আর রেকর্ড স্পর্শের ঘটনা ঘটেছে। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী এই ম্যাচ শেষে বেশ হাসিখুশি ছিলেন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সংশ্লিষ্টরা। আর এই প্রথম বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ৬-৪ গোলে জিতল ইংলান্ড। তার তা সম্ভব হয়েছে বুকায়ো সাকার হ্যাটট্রিকে।
তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ। তাই ইংলিশ কোচ ততোটা সিরিয়াস ছিলেন না। যে কারণে একাদশ থেকে বাদ দেয়া হ্যারি কেন, জুড বেলিংহাম এবং গোলরক্ষক পিকফোর্ডকে। সুযোগ দেন রিজার্ভ বেঞ্চের বাকি খেলোয়াড়দের। অন্য দিকে ফ্রান্স দলে কিলিয়ান এমবাপ্পেসহ অন্যরা ঠিকই আছেন। অথচ ইংল্যান্ডের এই রিজার্ভ বেঞ্চের খেলোয়াড়রাই ঝড় বাইয়ে দিয়েছে ফ্রান্স দলের ওপর। তাই প্রথমার্ধেই ইংলিশরা ৪-০তে এগিয়ে যায়। তখন মনে হচ্ছিল এই স্কোর লাইনে বা আরো বেশি গোলেই ম্যাচটি জিতে নেবে ১৯৬৬-এর বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। ৩ মিনিটেই ডেকলান রাইসের গোলে এগিয়ে যাওয়া ইংল্যান্ডের। ১৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এজরি কোনসা। এরপর ৩৭ মিনিট ও প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে জোড়া গোল বুকায়ো সাকার।
তবে বিরতির পর দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স যে কিলিয়ান এমবাপ্পের ঝলকে এভাবে ম্যাচকে ঘুরিয়ে দেবেন, তা কারোরই কল্পনাতে ছিল না। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই ব্রাডলি বারকোলা, উসমান দেম্বেলে, লুকাস ডিগনে এবং ডায়েট উমাপেকানোকে নামান কোচ। এদের উপস্থিতি ফরাসিদের এতোটাই উজ্জীবিত করে যে এমবাপ্পে যেন ফিরিয়ে নিয়ে এলেন ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের ভেনু লুসাইল স্টেডিয়ামকে। সেখানে তিনি পিছিয়ে পড়েও জোড়া গোল করে ৯০ মিনিটের খেলা ২-২ এ শেষ করতে বাধ্য করেছিলেন আর্জেন্টিনাকে। মিয়ামির মাঠে ৪৮ ও ৬৬ মিনিটে এমবাপ্পে জোড়া গোল দিয়ে স্কোর ৪-৩ করে ফেলেন। মাঝে বারকোলার গোল ছিল ৫৪ মিনিটে। ফরাসিদের এই কামব্যাকে ইংলিশদের তখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। কিন্তু এরপর মাইকেল ওলিসে, বারকোলা এবং দেম্বেলেরা একে একে সহজ সুযোগগুলো হাতছাড়া করায় চতুর্থ গোল করা হচ্ছিল না।
অবস্থা বেগতিক দেখে ইংল্যান্ডের জার্মান কোচ টমাস টুখেল ৭৮ মিনিটে জুড বেলিংহাম ও এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে মাঠে নামান। এতেই পাল্টে যায় ম্যাচের চেহারা। পুনরায় মাঝ মাঠের দখল নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে ইংল্যান্ড। এরই ফলশ্রুতিতে ৮৫ মিনিটে পেনাল্টি পায় তারা। ডিজেড স্পেন্সেকে বক্সে ফাউল করেন মালো গুস্তো। জুড বেলিংহাম এবারের বিশ্বকাপে তার সপ্তম গোল করার জন্য পেনাল্টি শট নিতে বল হাতেও নেন। পরে তিনি শট না নিয়ে হ্যাটট্রিক করার জন্য শট নিতে দেন বুকায়ো সাকাকে। সাকা বাম পায়ের শটে গোলরক্ষককে পরাস্ত করে পূর্ণ করেন তার হ্যাটট্রিক।
তবে এরপরও দমে যায়নি ফ্রান্স। ইনজুরি টাইমের ষষ্ঠ মিনিটে উসমান দেম্বেলে বাম পায়ের বাকানো শটে বল জালে পাঠানোর পর স্কোর হয়ে যায় ৫-৪। মনে হচ্ছিল বাকি দুই মিনিটেই ফরাসিরা পঞ্চম গোল দিয়ে ৫-৫ করে ফেলবে খেলা। ম্যাচ গড়াবে অতিরিক্ত সময়ে। তা আর হতে দেননি বেলিংহাম। ৯৭ মিনিটে একক প্রচেষ্টায় বক্সে ঢুকে দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ইংল্যান্ডের জয় নিশ্চিত করেন রিয়াল মাদ্রিদের এই মিডফিল্ডার। এতে ১৯৯০ এবং ২০১৮ সালের বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে হেরে যাওয়া ইংল্যান্ড অবশেষে এবার জয়ের দেখা পেল। অন্য দিকে এই হারের ফলে গত দুই বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ফ্রান্সকে হতে হলো চতুর্থ।
ম্যাচে জোড়া গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্ব্বোচ্চ ২২ গোলের মালিক হয়ে গেছেন এমবাপ্পে। টপকে গেলেন লিওনেল মেসির ২১ গোলকে। সে সাথে এবারের বিশ্বকাপে ১০ গোল দিয়ে গোল্ডেন বুট জেতার লড়াইয়ে মেসিকে পেছনে ফেলে আরো এগিয়ে গেলেন। ছুয়ে ফেললেন জার্মানির গার্ড মুলারের ১০ গোলকে, যা গার্ড মুলার করেছিলেন ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে।
বিশ্বকাপে দ্বিতীয় ফুটবলার হিসেবে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করলেন বুকায়ো সাকা। এর আগে ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে পেলে হ্যাটট্রিক করেছিলেন ফ্রান্সের বিপক্ষে।
বিশ্বকাপে চতুর্থ ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে হ্যাটট্রিক করলেন বুকায়ো সাকা। এর আগে জিওফ হাস্ট ১৯৬৬ সালে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে, ১৯৮৬ সালে গ্যারি নিলেকার পোল্যান্ডের বিপক্ষে এবং হ্যারি কেন ২০১৮ সালে পানামার বিপক্ষে তিন গোল করেছিলেন।
জোড়া গোল দিয়ে বেলিংহাম নিজের নামের পাশে জমা করেছেন ৭ গোল। ফলে তিনি টপকে গেলেন ১৯৮৬তে করা লিনেকার এবং ২০১৮তে ও চলমান আসরে করা হ্যারি কেনের ৬ গোলকে।
এই ১০ গোলের ম্যাচই বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলের মাচ নয়। ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে হাঙ্গেরি ১০-১ গোলে হারিয়েছিল এল সালভাদরকে। ১৯৫৪ সালে অস্ট্রিয়া ৭-৫ গোলে জয় পেয়েছিল সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে। এটিই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল (১২টি) হওয়া ম্যাচ। আর একই আসরে পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ গোলে হারায় হাঙ্গেরি। ১৯৫৮ সালে ফ্রান্স ৭-৩ ব্যবধানে হারিয়েছিল প্যারাগুয়েকে। আর ১৯৩৮ এ বিশ্বকাপে পোল্যান্ডকে ৬-৫ গোলে হারিয়েছিল ব্রাজিল।



