ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতায় মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনীতি

চুক্তি নিয়ে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব : লেবানন নিয়ে কঠোর অবস্থানে ইরান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত ও চরম উত্তেজনার পর বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় এসেছে। ইরান যুদ্ধের ১০৯তম দিনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অভূতপূর্ব অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা স্মারক ইলেকট্রনিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই চুক্তির পরপরই ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সম্পর্কে নজিরবিহীন ফাটল দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে লেবানন আক্রমণ এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলি সামরিক অভিযান পরিচালনার ধরন নিয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রকাশ্যেই কড়া ভাষায় জানিয়েছেন যে, লেবানন ইস্যুতে নেতানিয়াহুকে ‘আরো দায়িত্বশীল’ হতে হবে। ইসরাইলের আগ্রাসন এবং হিজবুল্লাহর সঙ্কট মোকাবেলায় নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে ট্রাম্প সরাসরি অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি মোটেও সুখী নই।’ ইসরাইলের দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বড় সামরিক ও রাজনৈতিক মিত্র আমেরিকার রাষ্ট্রপ্রধানের কাছ থেকে এমন প্রকাশ্য সমালোচনাকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা একটি ঐতিহাসিক ফাটল হিসেবে দেখছেন। ট্রাম্পের এই মনোভাবের সমান্তরালে তেহরানও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, ইসরাইল যদি লেবাননে আগ্রাসন অব্যাহত রাখে বা তার ভূখণ্ড দখল করে রাখে, তবে তা আমেরিকার সাথে তাদের সম্পাদিত চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ঐতিহাসিক সম্পর্কের টানাপড়েন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কূটনৈতিক সম্পর্কের পর্দার আড়ালে মতবিরোধ নতুন কিছু না হলেও, তা কখনো এভাবে জনসমক্ষে আসেনি। ১৯৪৮ সালে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান কর্তৃক ইসরাইল রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়ার পর থেকেই বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ দেখা গেছে।

সুয়েজ সঙ্কট ও আইজেনহাওয়ার : ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সঙ্কটের পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডুইট আইজেনহাওয়ার কঠোর অবস্থান নিয়ে ইসরাইলি বাহিনীকে সিনাই উপদ্বীপ থেকে সেনা প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

রেগান ও বেগিনের দূরত্ব : সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড রেগান ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিনকে ব্যক্তিগতভাবে একজন ‘কঠিন ও অনমনীয়’ ব্যক্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন।

বুশ ও শামির টানাপড়েন : জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশের সাথেও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ইতজাক শামিরের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত শীতল ও দ্বান্দ্বিক।

ওবামা-বাইডেন বনাম নেতানিয়াহু : আধুনিক সময়ে বারাক ওবামার আমলে নেতানিয়াহুর বিতর্কিত বসতি সম্প্রসারণ নীতি দুই দেশের সম্পর্ককে খাদের কিনারায় নিয়ে যায়। এমনকি বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইসরাইলের সুরক্ষায় পাশে দাঁড়ালেও কিছু ক্ষেত্রে ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, যা নেতানিয়াহু একেবারেই পছন্দ করেননি।

তবে অতীতের এসব বিরোধের বেশির ভাগই পর্দার আড়ালে বা কূটনৈতিক চ্যানেলে সীমাবদ্ধ ছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্তমান প্রশাসনের অধীনে যেভাবে এই ফাটল আন্তর্জাতিক মহলে ‘বিস্ফোরিত’ হয়েছে, তা মার্কিন-ইসরাইল সম্পর্কের ইতিহাসে সম্পূর্ণ নজিরবিহীন।

ঐতিহাসিক মার্কিন-ইরান সমঝোতা স্মারক

১০৯ দিনে পদার্পণ করা ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে ওয়াশিংটন ও তেহরান অবশেষে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের প্রধান পরমাণু আলোচনাকারী তথা সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের ঘালিবাফ ইলেকট্রনিকভাবে এই সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেছেন।

চুক্তির সম্পূর্ণ বিবরণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা না হলেও, ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন যে তিনি খুব শিগগিরই একটি আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করবেন এবং এই গুরুত্বপূর্ণ নথির প্রতিটি শব্দ পাঠ করে শোনাবেন। একই সাথে তিনি চুক্তিটি মার্কিন কংগ্রেসের পর্যালোচনার জন্য পাঠাতেও সম্মতি প্রকাশ করেছেন। ট্রাম্পের মতে, এই চুক্তির ফলে আগামী শুক্রবারের মধ্যে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত হয়ে যাবে। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন যে ইরানের বর্তমান নেতারা ‘উগ্রপন্থী নন’ এবং তারা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চান, যার ফলে ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের একটি নতুন ধরনের অংশীদারত্ব তৈরি হতে পারে। তবে তিনি পরিষ্কার করে দিয়েছেন, চূড়ান্ত চুক্তি যাই হোক না কেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে না। এ ছাড়া মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, ইরানের ওপর থেকে দ্বিপক্ষীয় অবরোধ তুলে নেয়া হবে এবং অবরুদ্ধ ১২ বিলিয়ন ডলারের ইরানি তহবিল প্রাথমিকভাবে অবমুক্ত করা হবে।

লেবানন সঙ্কট ও হিজবুল্লাহর কঠোর অবস্থান

এই আন্তর্জাতিক চুক্তির অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লেবানন সঙ্কট। লেবানন সরকার এবং সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ এই চুক্তিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও তাদের প্রধান শর্ত-লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি বাহিনীর সম্পূর্ণ ও অবিলম্বে প্রত্যাহার।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, লেবাননের দখলকৃত অঞ্চল থেকে ইসরাইলি বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না হলে বর্তমান সঙ্ঘাতের প্রকৃত সমাপ্তি হবে না। তার এই বক্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান সমঝোতা ও কূটনৈতিক আলোচনায় লেবানন প্রশ্ন এখন তেহরানের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। হিজবুল্লাহর মিডিয়া দফতর রয়টার্সকে জানিয়েছে যে, তেহরান তাদের আশ্বস্ত করেছে যে ওয়াশিংটনের সাথে পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয়টি অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে উত্থাপন করা হবে। হিজবুল্লাহর স্পষ্ট বার্তা, ‘ইসরাইলিরা লেবানন থেকে প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কোনো স্থায়ী পারমাণবিক চুক্তি হতে পারে না।’

সংগঠনটির মহাসচিব নাইম কাসেম ইরানের সংসদ স্পিকার ঘালিবাফকে লেখা এক চিঠিতে তেহরানের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ইরানকে ‘গর্ব ও সম্মানের প্রতীক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, তেহরানের কূটনৈতিক ও সামরিক চাপই ইসরাইলকে বিভিন্ন ফ্রন্টে সামরিক অভিযান সীমিত করতে বাধ্য করেছে।

চুক্তি সত্ত্বেও দক্ষিণ লেবানন ও গাজায় ইসরাইলি হামলা

আমেরিকার পক্ষ থেকে যুদ্ধ বন্ধের তীব্র চাপ এবং মার্কিন-ইরান চুক্তির কার্যকারিতা শুরু হওয়া সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে ইসরাইলি আগ্রাসন থামেনি। দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইসরাইলি যুদ্ধবিমান একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। বিমান হামলার পাশাপাশি আলী আল-তাহের পাহাড়ি অঞ্চলে তীব্র গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবে এই আগ্রাসন চুক্তির বাস্তবায়নকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলছে।

এ অবস্থায় ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকে লেবাননে ইসরাইল কর্তৃক যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণ ও যৌথ প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম আসন্ন ২২ জুনের ইসরাইল-লেবানন পঞ্চম দফার আলোচনার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। তারা মার্কিন-ইরান সমঝোতাকে আঞ্চলিক উত্তেজনা হ্রাসের ইতিবাচক উপাদান হিসেবে দেখছেন এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, বন্দিবিনিময় এবং পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরুর দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

একইভাবে, গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে, যাতে এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ সেন্ট্রাল গাজার নুসেইরাত শরণার্থী শিবিরের উত্তরে আল-নুরি টাওয়ারের কাছে ইসরাইলি বিমান হামলায় অন্তত দু’জন নিহত হয়েছেন। ইসরাইলের এই একগুঁয়েমি ও আগ্রাসী মনোভাবের কারণে লেবানন ও গাজায় দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠা নিয়ে গভীর সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকা ও কাতারের আশাবাদ

এই জটিল কূটনৈতিক আলোচনা সফল করার পেছনে মূল মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি দোহার এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের এই ঐতিহাসিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। কাতার নিজে সরাসরি মধ্যস্থতাকারী না হলেও পাকিস্তানের নেতৃত্বাধীন এই শান্তিপ্রক্রিয়ার অগ্রভাগে থেকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে।

কাতার আশা প্রকাশ করেছে যে, এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে আবার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) বিশ্ববাজারে সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা বিশ্ব জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে কাতার এটিও মনে করিয়ে দিয়েছে যে, গত কয়েক দশকের প্রক্সি যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পারমাণবিক জটিলতার মতো দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সমস্যাগুলো মাত্র কয়েক দিনে সমাধান হবে না। এর জন্য দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ আলোচনার প্রয়োজন। এ ছাড়া ইরানের পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের যে তহবিল গঠনের কথা সংবাদমাধ্যমে এসেছে, তাকে ‘ফেক নিউজ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। আর কাতারও নিশ্চিত করেছে যে তারা এখনো এমন কোনো তহবিল বরাদ্দ করেনি।

আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রভাব

মার্কিন-ইরান অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে দেখা গেছে। হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ খুলে যাওয়ার সম্ভাবনায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত তিন মাসের মধ্যে সর্বনি¤œ স্তরে নেমে এসেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২.৪ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৮১.১৫ ডলারে নেমেছে এবং মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ২.৮ শতাংশ কমে ব্যারেল প্রতি ৭৮.৫৩ ডলারে পৌঁছেছে।

আন্তর্জাতিক মহলে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান রাশিয়ার মস্কো সফরে গিয়ে এই চুক্তিকে একটি ‘মূল্যবান কূটনৈতিক মাইলফলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে এটি সাময়িক শান্তির পরিবর্তে মধ্যপ্রাচ্যে একটি স্থায়ী নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করবে। একই সাথে তিনি ইসরাইল কর্তৃক এই চুক্তি নস্যাৎ বা ‘সাবোটাজ’ করার যেকোনো প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে বৈশ্বিক সম্প্রদায়কে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। চ্যাথাম হাউজের আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ মার্ক ওয়েলার অবশ্য সতর্ক করেছেন যে, ইরান যদি হরমুজ প্রণালী পারাপারের জন্য কোনো ধরনের অতিরিক্ত ফি বা শুল্ক আদায় করার চেষ্টা করে, তবে তা আন্তর্জাতিক নৌ-আইনে একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করবে।

ইরানের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি

বাহ্যিক কূটনীতিতে ইরান যখন বড় ধরনের সাফল্যের মুখ দেখছে, তখন দেশের অভ্যন্তরীণ মানবাধিকার ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমের উদ্বেগ কাটেনি। চুক্তির আবহের মধ্যেই ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে জড়িত থাকার অভিযোগে জাভাদ জামানি এবং আবুলফজল সায়েদি নামে দুই যুবকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে ইরানের বিচার বিভাগ। জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্কের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের এই অল্প সময়ের মধ্যেই ইরান জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে, যার মধ্যে ১৮ জনই সাধারণ বিক্ষোভকারী। এই অভ্যন্তরীণ কঠোরতা আন্তর্জাতিক মঞ্চে ইরানের ভাবমূর্তিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

মধ্যপ্রাচ্যে কি নতুন বাস্তবতার সূচনা?

বর্তমান সমঝোতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে একটি সম্ভাব্য মোড় পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বার্থে সমঝোতার পথে হাঁটে, তবে অঞ্চলটিতে মার্কিন ও ইরানি স্বার্থের একটি ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।

তবে বাস্তবতার সমীকরণ এখনো অত্যন্ত জটিল। লেবাননে ইসরাইলি সামরিক উপস্থিতি ও প্রতিনিয়ত চুক্তি লঙ্ঘন, হিজবুল্লাহর ভবিষ্যৎ সশস্ত্র অবস্থান, হরমুজ প্রণালীর টেকসই নিরাপত্তা, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক চরম অবিশ্বাস, সব মিলিয়ে স্থায়ী শান্তির পথ এখনো অনেক দীর্ঘ।

তবুও ট্রাম্প-নেতানিয়াহু দ্বন্দ্বের প্রকাশ্য রূপ, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিক সমঝোতা এবং লেবাননকে কেন্দ্র করে নতুন কূটনৈতিক তৎপরতা মধ্যপ্রাচ্যকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আলোচনার টেবিলের দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর করার একটি বড় সঙ্কেত। যদি সমঝোতার শর্তগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হয়, তবে ২০২৬ সালের এই সঙ্কট ও তার সমাধান ভবিষ্যতে সামগ্রিক মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।