মাফিকুল ইসলাম কলকাতা থেকে
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি বরাবরই নাটকীয় পরিবর্তনের ইতিহাস বহন করে। কখনো দীর্ঘ ৩৪ বছরের বাম শাসন, কখনো তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থান, আবার কখনো জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিস্তারÑ এই বাংলার নির্বাচন কেবল মতার পালাবদল নয়; এটি মানুষের মনস্তত্ত্ব, সামাজিক পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও প্রতিফলন।
কিন্তু ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন সেই ইতিহাসে এক নতুন, জটিল এবং বিতর্কিত অধ্যায় যোগ করেছে। বিজেপির অভূতপূর্ব বিজয় যেমন রাজনৈতিক পর্যবেকদের বিস্মিত করেছে, তেমনি ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া ঘিরে উঠেছে তীব্র প্রশ্ন। লাখ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া, বহু আসনে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বিজয়ী ব্যবধানের চেয়েও বেশি হওয়া এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ভোটাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তাÑ সবমিলিয়ে বাংলার গণতন্ত্র যেন এক কঠিন আত্মসমালোচনার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
এই নির্বাচন তাই কেবল সরকার পরিবর্তনের গল্প নয়; এটি নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতা এবং গণতান্ত্রিক আস্থারও এক গভীর পরীা।
২০২৬ সালের নির্বাচনে ২৯৪ আসনের মধ্যে বিজেপি ২০৭টি আসনে জয় পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। ২০১১ সাল থেকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে প্রায় অপ্রতিরোধ্য শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল কংগ্রেস নেমে এসেছে মাত্র ৮০ আসনে। এক দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক বাস্তবতা মুহূর্তেই পাল্টে গেছে।
কিন্তু এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের আড়ালে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে এসআইআর বা ভোটার তালিকা পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া। নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ছিল মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট ও অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেয়ার একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ। কিন্তু বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়া এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে যাতে বিপুলসংখ্যক প্রকৃত ভোটারÑ বিশেষ করে দরিদ্র, সংখ্যালঘু, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীÑভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। মাত্র ২৯ দিনের এই পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়ায় পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ৯১ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়ে বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। এটি মোট ভোটারের প্রায় ১২ শতাংশের সমান। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে প্রায় ২৭ লাখ মানুষের আবেদন এখনো ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ, তাঁদের নাগরিক অধিকার কার্যত অনিশ্চয়তার মধ্যে ঝুলছে।
গণতন্ত্রে সরকার বদলাবে, রাজনৈতিক দল হারবে বা নতুন শক্তি উঠে আসবেÑ এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, ‘আমার ভোট কি সত্যিই গণনা হয়েছে?’ তখন সেই প্রশ্ন আর কেবল রাজনৈতিক থাকে না; তা গণতন্ত্রের ভিতকেই নাড়িয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গের এবারের নির্বাচনে বিতর্কের মূল জায়গাটি এখানেই। বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, বিজেপি যে বহু আসনে জয় পেয়েছে, সেখানে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা বিজয়ী ব্যবধানের চেয়েও বেশি। একটি গবেষণামূলক পর্যালোচনায় দাবি করা হয়েছে, বিজেপি এমন ১০৫টি আসনে জয়ী হয়েছে যেখানে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা ছিল জয়ের ব্যবধানের চেয়ে বেশি। আরো গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই ১০৫টি আসনের মধ্যে ৬৮টি আসনে বিজেপি এর আগে কখনো জয় পায়নি।
এই পরিসংখ্যান নিছক সংখ্যার খেলা নয়; এগুলো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করে।
দণি কলকাতার যাদবপুর কেন্দ্রের কথাই ধরা যাক। দীর্ঘদিন ধরে এটি ছিল বামপন্থী রাজনৈতিক চেতনার অন্যতম প্রতীক। সেই কেন্দ্রে এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৫৬ হাজারের বেশি ভোটারের নাম বাদ পড়ে। পরে বিজেপি প্রায় ২৭ হাজার ভোটে জয়ী হয়। অর্থাৎ বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা জয়ের ব্যবধানের দ্বিগুণেরও বেশি।
টালিগঞ্জেও দেখা যায় একই চিত্র। তৃণমূলের প্রবীণ নেতা ও মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস মাত্র ৩ হাজার ১৩ ভোটে পরাজিত হন, অথচ ওই কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩৭ হাজার ৮৮৯ ভোটারের নাম বাদ দেয়া হয়েছিল। সবচেয়ে আলোচিত কেন্দ্র ভবানীপুর। এই আসনেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দু অধিকারীর কাছে প্রায় ১৫ হাজার ভোটে হেরে যান। অথচ ওই কেন্দ্র থেকে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ৫১ হাজারের বেশি নাম বাদ পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাঁকুড়ার ইন্দাস কেন্দ্র আরও নাটকীয় উদাহরণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেখানে তৃণমূল প্রায় ৯ হাজার ভোটে এগিয়ে ছিল। কিন্তু এসআইআর প্রক্রিয়ায় ৭ হাজার ৫৫৫ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার পর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি মাত্র ৩০০ ভোটে জয়ী হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এসব তথ্য নির্বাচনী ফলাফলের পেছনের বাস্তবতা নিয়ে গভীর অনুসন্ধানের দাবি রাখে।
তবে সবচেয়ে বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলোÑ যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের বড় অংশই সমাজের প্রান্তিক মানুষ। শহরের উচ্চবিত্ত নাগরিক হয়তো অনলাইনে আপিল করতে পারেন, ট্রাইব্যুনালে যেতে পারেন কিংবা আইনজীবী নিয়োগ করতে পারেন। কিন্তু গ্রামের দরিদ্র কৃষক, দিনমজুর, বস্তির শ্রমজীবী নারী বা বৃদ্ধ ভোটারের জন্য সেই সুযোগ প্রায় অপ্রাপ্য।
ভাবুন, একজন বৃদ্ধা নারী যিনি স্বাধীনতার পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন, তিনি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শুনলেনÑ তার নাম তালিকায় নেই। কিংবা কোনো তরুণ, যার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পশ্চিমবঙ্গেই, সে ‘যাচাই-বাছাই’ প্রক্রিয়ায় সন্দেহভাজন হয়ে ভোটাধিকার হারাল। এটি কেবল প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি নাগরিক মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্ন।
তবে পুরো নির্বাচনী বাস্তবতাকে শুধু ভোটার তালিকা বিতর্ক দিয়ে ব্যাখ্যা করাও একপীয় হবে। তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের জনঅসন্তোষও বিজেপির উত্থানের বড় কারণ। নিয়োগ দুর্নীতি, শিক নিয়োগ কেলেঙ্কারি, সিন্ডিকেট সংস্কৃতি, পঞ্চায়েত নির্বাচনে সহিংসতা, দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং নারী নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক মানুষের মধ্যে প্রবল প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব তৈরি করেছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে ২১৫ আসনে জয়ী তৃণমূল এবার ৮০ আসনে নেমে এসেছে। এই পতনের পেছনে জনরোষের বাস্তবতা অস্বীকার করা যাবে না। ইতিহাসও বলে, বাংলার রাজনীতিতে কোনো শক্তি চিরস্থায়ী নয়। একসময় কংগ্রেস ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। পরে বামফ্রন্ট টানা ৩৪ বছর মতায় থেকেছে। তারপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্থান। এখন আবার নতুন রাজনৈতিক অধ্যায় শুরু হয়েছে।
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেইÑ মানুষই শেষ পর্যন্ত মতার চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রক।
কিন্তু সেই গণতন্ত্র তখনই শক্তিশালী থাকে, যখন নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকে। ভারতের নির্বাচন কমিশন বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পরিচালনাকারী অন্যতম সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। শতকোটি মানুষের ভোট পরিচালনা নিঃসন্দেহে একটি অসাধারণ প্রশাসনিক সমতার পরিচয়। ফলে এই প্রতিষ্ঠানের নিরপেতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা শুধু ভারতের জন্য নয়, গোটা দণি এশিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ দণি এশিয়ায় নির্বাচনকে ঘিরে অবিশ্বাস নতুন কিছু নয়। কোথাও প্রশাসনের নিরপেতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, কোথাও ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, আবার কোথাও বিরোধী দলের অংশগ্রহণ নিয়েই অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সেই প্রোপটে পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা শুধু একটি রাজ্যের নয়; এটি পুরো অঞ্চলের গণতান্ত্রিক বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি।
আজকের রাজনীতিতে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতাও স্পষ্টÑ প্রতিপকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং ‘শত্রু’ হিসেবে তুলে ধরা। সামাজিকমাধ্যমে ঘৃণা, বিভাজন ও মেরুকরণের ভাষা ক্রমেই বাড়ছে। অথচ বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতির অন্যতম শক্তি ছিল মতভেদের মধ্যেও সহাবস্থান ও বিতর্কের ঐতিহ্য।
বিজেপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলোÑ এই বিপুল বিজয়কে টেকসই রাজনৈতিক আস্থায় রূপ দেয়া। জয় পাওয়া যত সহজ, মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখা তত কঠিন। বেকারত্ব, শিল্পায়নের স্থবিরতা, কৃষকের সঙ্কট, সীমান্ত রাজনীতির জটিলতা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রশ্নে কার্যকর সমাধান দিতে না পারলে এই বিজয়ও দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে।
একইভাবে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্যও এটি আত্মসমালোচনার সময়। দীর্ঘদিন মতায় থাকলে অনেক সময় দল বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বারবার দেখিয়েছে, তারা কাউকে স্থায়ী শাসক হিসেবে মেনে নেয় না।
সবমিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ সালের নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের কাহিনী নয়; এটি গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার এক জটিল উপাখ্যান। বিজেপির এই বিজয় হয়তো বাস্তব জনসমর্থনের প্রতিফলন। আবার এটাও সত্য, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো সহজে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন আমাদের একটি মৌলিক সত্যের সামনে দাঁড় করিয়েছেÑ গণতন্ত্র শুধু ব্যালট বাক্সের ফল নয়; এটি মানুষের বিশ্বাসের নাম। সরকার বদলাবে, নতুন শক্তির উত্থান হবে, পুরনো দুর্গ ভাঙবেÑ এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক গতি। কিন্তু কোনো নাগরিক যদি মনে করেন তার ভোটাধিকার অনিশ্চিত, তাহলে সেই গণতন্ত্রের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে।
পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ইতিহাসজুড়ে স্বাধীন চিন্তা ও রাজনৈতিক সচেতনতার পরিচয় দিয়েছে। তাই আজ সবচেয়ে জরুরি হলোÑ জয়ের উল্লাস বা পরাজয়ের হতাশার বাইরে গিয়ে এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, যেখানে প্রতিটি নাগরিক নির্ভয়ে বলতে পারেনÑ ‘আমার ভোট, আমার কণ্ঠস্বর, সত্যিই গণনা হয়েছে।’



