লাগামহীন মাদক : ধরাছোঁয়ার বাইরে গডফাদাররা

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে প্রায় প্রতিদিনই মাদকসহ কারবারিদের গ্রেফতার করে আসছে। তবে ছোট কারবারিরা গ্রেফতার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে মূলহোতা বা গডফাদার ও গডমাদাররা। ফলে কিছুতেই কমছে না মাদকের বিষাক্ত থাবা। হাজারো অভিযান সত্ত্বেও মাদক সিন্ডিকেটের জাল প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত সমাজ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, দেশের সীমান্তবর্তী ২৯ জেলার ১৬২টি পয়েন্ট দিয়ে অব্যাহতভাবে দেশে প্রবেশ করছে বিভিন্ন ধরনের মাদক। সক্রিয় রয়েছে অন্তত এক হাজার ৬০০ গডফাদার ও প্রায় ২১ হাজার সদস্যের একটি মাদক নেটওয়ার্ক।

আব্দুল কাইয়ুম
Printed Edition
  • রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তি ব্যবহারে তৈরি হচ্ছে সিন্ডিকেট
  • মাদকের টাকা ডলারে রূপান্তর করে পাচার হচ্ছে
  • প্রশাসনের সাহায্যে চোরাকারবারির অভিযোগ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান পরিচালনা করে প্রায় প্রতিদিনই মাদকসহ কারবারিদের গ্রেফতার করে আসছে। তবে ছোট কারবারিরা গ্রেফতার হলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে মূলহোতা বা গডফাদার ও গডমাদাররা। ফলে কিছুতেই কমছে না মাদকের বিষাক্ত থাবা। হাজারো অভিযান সত্ত্বেও মাদক সিন্ডিকেটের জাল প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত সমাজ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, দেশের সীমান্তবর্তী ২৯ জেলার ১৬২টি পয়েন্ট দিয়ে অব্যাহতভাবে দেশে প্রবেশ করছে বিভিন্ন ধরনের মাদক। সক্রিয় রয়েছে অন্তত এক হাজার ৬০০ গডফাদার ও প্রায় ২১ হাজার সদস্যের একটি মাদক নেটওয়ার্ক।

ডিবি সূত্রে জানা যায়, মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের মাধ্যমে ‘ব্লক রেইড’ অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের প্রচ্ছন্ন আশ্রয় এবং অবৈধ অর্থের জোরে অনেক গডফাদার আইনি ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক জাতীয় গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় চার দশমিক ৮৮ শতাংশ।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল ও গোল্ডেন ক্রিসেন্টের মাদক চোরাচালানের প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মায়ানমার ও ভারতের সীমান্ত দিয়ে নদীপথ, বঙ্গোপসাগর এবং পাহাড়ি রুট ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশে প্রবেশ করছে নতুন নতুন রাসায়নিক মাদক। বর্তমানে কক্সবাজার চট্টগ্রামের বড় সিন্ডিকেটগুলো মিয়ানমারের অপরাধীদের কাছ থেকে কোনো অগ্রিম টাকা ছাড়া সম্পূর্ণ বাকিতে মাদকের চালান আনছে এবং হুন্ডির মাধ্যমে পরে অর্থ পাচার করছে।

মাদকের এই বিশাল বাজার থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কয়েকটি শক্তিশালী চক্র। আড়ালে থাকা মাদকের গডফাদার ও গডমাদার বা শীর্ষ অপরাধীরা কখনো সামনে আসে না। তারা রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থবিত্ত এবং পেশিশক্তি ব্যবহার করে পুরো সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। মাদক বিক্রির লভ্যাংশ দেশে ধরে রাখা ঝুঁকিপূর্ণ। তাই এই চক্রের প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা, যারা মাদকের কালো টাকা ডলারে রূপান্তর করে বিদেশে পাচার করে। স্থানীয় পর্যায়ে মাদক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে এবং নির্বিঘেœ চালান পার করতে প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিপরায়ণ সদস্য চোরাকারবারিদের তথ্য দিয়ে বা নীরব থেকে আর্থিক সুবিধা নেয়। মাদকের খুচরা বিক্রেতা বা বাহক হিসেবে সাধারণত নারী ও শিশুদের ব্যবহার করা হলেও এর মূল সুবিধাভোগী সমাজের আড়ালে থাকা মাদক গডফাদার ও সিন্ডিকেট প্রধানরা।

সংশ্লিষ্ট তথ্য মতে, মাদক কেনাবেচার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইন্টারনেট। ‘ডার্ক ওয়েব’-এর গোপন সাইটগুলোতে মাদকের অর্ডার হচ্ছে। যোগাযোগ রক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে সিগন্যাল, টেলিগ্রাম বা হোয়াটসঅ্যাপের মতো এনক্রিপ্টেড অ্যাপ। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজর এড়াতে মাদকের আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় লেনদেনে কাগজের টাকার বদলে বিটকয়েনসহ বিভিন্ন ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গোপন হিসাব ব্যবহার করা হচ্ছে। ই-কমার্স ও অনলাইন ফুড ডেলিভারির আড়ালে সাধারণ পণ্যের প্যাকেটে ভরে ক্রেতাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাচ্ছে মাদক।

চলতি বছরের শুরুতে ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়’ (বিএমইউ) এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, মাদক গ্রহণকারীদের ৩৩ শতাংশই ৮ থেকে ১৭ বছর (শিশু-কিশোর) বয়সে প্রথম মাদক নেয়। ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সের তরুণ। শীর্ষ মাদক হিসেবে গাঁজা ব্যবহার করে ৬০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ। ইয়াবা সেবনকারী ২২ লাখ ৯৩ হাজার এবং অ্যালকোহল ব্যবহারকারী ২০ লাখ। এ ছাড়া আইস, এলএসডি ও এমডিএমএর মতো সিনথেটিক মাদকের নীরব বিস্তার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। একজন মাদকসেবী মাসে গড়ে ৬ হাজার টাকা মাদকের পেছনে খরচ করে।

নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদকের শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে শুধু চুনোপুঁটি বা খুচরা বিক্রেতা ধরলে হবে না, নেপথ্যে থাকা হোতাদের (গডফাদার) আইনের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি পরিবার থেকে নৈতিক শিক্ষার চর্চা বাড়াতে হবে। সীমান্তে নজরদারি আরো আধুনিক করতে হবে। ডার্ক ওয়েব এবং সাইবার অপরাধের মাধ্যমে যে মাদক কেনাবেচা হচ্ছে, তা রুখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘সাইবার উইং’ বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়ানো দরকার। একই সাথে মাদক সংশ্লিষ্ট অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং) বন্ধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও গোয়েন্দা সংস্থাকে যৌথভাবে কাজ করতে হবে। শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে মাদক নির্মূল করা অসম্ভব।

পুলিশ সদর দফতরের এআইজি (মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন বলেন, পুলিশ মাঠপর্যায়ে শত শত খুচরা বিক্রেতা ও বাহককে গ্রেফতার করছি তবে সীমান্ত গলিয়ে মাদকের যে বিপুল প্রবাহ, তা পুরোপুরি বন্ধ করতে সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সাথে সমন্বিত যৌথ অ্যাকশন আরো জোরদার করা হচ্ছে। অভিযানে গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে গডফাদারদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিশেষ এলাকাগুলোতে মাদকবিরোধী কার্যক্রম আরো কঠোর করা হয়েছে।

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং সূত্র জানায়, মাদক চক্রগুলো এখন অত্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তি এবং অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে হোম ডেলিভারি দিচ্ছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আমরা নতুন ধরনের সিনথেটিক মাদক চক্রের বেশ কয়েকজন হোতাকে ধরেছি। তবে গডফাদারদের মূলোৎপাটন করতে আরো কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি চলছে। মাদক কারবারিরা দীর্ঘ দিন যাবৎ দেশের সীমান্তবর্তী এলাকা হতে অবৈধভাবে মাদকদ্রব্য সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে আসছে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, দেশে বিভিন্ন মাধ্যমে মাদক আসা বন্ধ করতে বাংলাদেশ চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। যেহেতু সীমান্তের রুটগুলো অরক্ষিত নয়- সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে, মাদকের চালান নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না নাকি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। অনলাইন-অফলাইনে প্রতিনিয়ত বিক্রি হচ্ছে মাদক। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সত্যিকারের জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন ও সংশ্লিষ্ট বাহিনীর কেউ কেউ মাদক কারবারে জড়ালে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।