বাঁশের ভাঙা সাঁকোই ২০ হাজার মানুষের ভরসা

রেজাউল ইসলাম, সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা)
Printed Edition
মাথায় বস্তা নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো পার হচ্ছেন এক যুবক। পেছনে আছেন স্থানীয়রাও : নয়া দিগন্ত
মাথায় বস্তা নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো পার হচ্ছেন এক যুবক। পেছনে আছেন স্থানীয়রাও : নয়া দিগন্ত

  • ৪০ বছর ধরে একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা
  • বাঁশের সাঁকোয় পার হতে হয় শুনে আগ্রহ দেখায় না পাত্রপক্ষ

দুপুরের তপ্ত রোদ তখনো পুরোপুরি নরম হয়নি। বইখাতা কাঁধে নিয়ে বাঁশের নড়বড়ে সাঁকোর ওপর ধীরে ধীরে পা ফেলছিল চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী রিয়াদ। এক হাতে বই, অন্য হাতে বাঁশের হাতল শক্ত করে ধরা। হাত ছাড়ালেই বিপদ! তবুও এ পথই তার প্রতিদিনের যাত্রা, স্কুলে যাওয়া আসার একমাত্র ভরসা। স্থায়ী সেতু না থাকায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় এই নদী। সামান্য অসতর্কতাই ডেকে আনতে পারে বড় দুর্ঘটনা। তবুও বাধ্য হয়েই এই অনিশ্চিত পথ ধরে চলছে চরাঞ্চলের মানুষ।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের চর খোর্দ্দা, নিজাম খাঁ ও লাটশালা, চর তারাপুর গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা এখনো বাঁশের তৈরি সাঁকো। বুড়াইল নদীর ওপর স্থায়ী কোনো সেতু না থাকায় এই সাতটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন পারাপার করেন প্রায় ২০ হাজার মানুষ। সরেজমিনে দেখা যায়, তারাপুর ইউনিয়নের চরখোর্দা গ্রামে শতাধিক পরিবারের চলাচলের একমাত্র ভরসা একটি বাঁশের সাঁকো। সেই সাঁকো বেয়ে উঠতে হচ্ছে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের। সাঁকোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অনেক বাঁশ পচে গেছে, বিভিন্ন জায়গার পাটাতন উঠে গিয়ে বড় বড় ফাঁকা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও দড়ি দিয়ে বাঁশ বেঁধে কোনোভাবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে কাঠামো।

শুধু চরখোর্দা গ্রাম নয়, এমন জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকোয় ভরসা আরো দুই গ্রামের। চরখোর্দা, লাটশালা ও নিজাম খাঁ চর তারাপুর গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা এসব সাঁকো। তিনগ্রামে বুড়াইল নদীর ওপর নির্মিত সাতটি সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে প্রায় ৫০০ পরিবারের ২০ হাজার মানুষকে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ৪০ বছর ধরে তারা একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। সম্প্রতি কয়েকটি সাঁকোর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেলে স্থানীয় চেয়ারম্যান উদ্যোগ নিয়ে কিছু সংস্কার কাজ করেন। নতুন বাঁশ বসিয়ে আপাতত চলাচলের উপযোগী করা হলেও সেটিকে সাময়িক সমাধান হিসেবেই দেখছেন এলাকাবাসী। তবে বর্ষা এলেই আবারো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে এই সাঁকো। স্থানীয় কৃষক আব্দর রাজ্জাক জানান নদীর ওপারে জমিতে কাজ করতে যান। হাতে কৃষি সরঞ্জাম আর কাঁধে ফসলের বোঝা নিয়ে এই সাঁকো পার হতে হয়।

তবে, সম্প্রতি কয়েকটি সাঁকোর অবস্থা আরো খারাপ হয়ে গেলে স্থানীয় চেয়ারম্যান উদ্যোগ নিয়ে কিছু সংস্কার কাজ করেন। নতুন বাঁশ বসিয়ে আপাতত চলাচলের উপযোগী করা হলেও সেটিকে সাময়িক সমাধান হিসেবেই দেখছেন এলাকাবাসী। চরখোর্দা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, মেয়ের বিয়ের কথা বলতে গেলে প্রথমেই রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করে। যখন শুনে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে যেতে হয়, তখন অনেকে আর আগ্রহ দেখায় না।

স্থানীয় ব্যবসায়ী শাহাদুল ইসলাম ভাষ্য, একটি পাকা সেতু নির্মিত হলে পুরো এলাকার জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির চেহারা বদলে যেত।

তারাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লেবু জানালেন, জরাজীর্ণ সাতটি বাঁশের সাঁকো নিজ উদ্যোগে সংস্কারের কাজ চলছে। সুন্দরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মাজেদুর রহমান, বাঁশের সাঁকো সংস্কারের জন্য সহযোগিতা করা হয়েছে। স্থায়ী ব্রিজ বরাদ্দের জন্য চাহিদা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই ব্রিজসহ রাস্তা পাকাকরণের বরাদ্দ পাব।