মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন
মানুষকে সুষ্ঠু, সুন্দর, স্বাধীন ও সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনার জন্য যে নিয়মকানুন তৈরি ও প্রয়োগ করা হয় তাকে আইন বলে। এই পৃথিবীতে আইন দুইভাবে সৃষ্টি হয়েছে, যথা- ১. স্বয়ং আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত আইন; ২. মানব রচিত আইন। শরিয়াহ আইন আল্লাহ প্রদত্ত ইসলামের অপরিহার্য আইন। মুসলমানদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য আইন হচ্ছে শরিয়াহ আইন, যা কুরআন ও হাদিসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ইসলামী শরিয়াহ আইন হলো একটি জীবন পদ্ধতি ও ধর্মীয় অনুশাসন যা মুসলমানদের ব্যক্তিগত, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবনের সব ক্ষেত্রে সঠিক নির্দেশনা প্রদান করে। শরিয়াহ আইনের মূল ভিত্তি হলো পবিত্র কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ সা:-এর সুন্নাহ। শরিয়াহ আইনের উদ্দেশ্য হলো মানুষকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে জীবনযাপন করতে সাহায্য করা। মানুষের সার্বিক কল্যাণকামিতাই শরিয়াহর মূল উদ্দেশ্য। ইসলামী শরিয়াহ আইনের ভিত্তি হলো আইন সবার জন্য সমান। এই আইনে ধনী-গরিব, রাজা-প্রজা সবার জন্য আইন সমান। যার ফলে শরিয়াহ আইন মুসলিম উম্মাহকে একসূত্রে গেঁথে রাখে। ইসলামী আইন শরিয়াহকে অস্বীকার করা মানে আল্লাহর আইন, স্বার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্বকে অস্বীকার করা। শরিয়াহ আইন মানার অর্থ আল্লার আইন কাঠামোকে মানা। শরিয়াহ আইন অমান্য করা মানে তাওহিদ ও রিসালাতের মূল নীতির পরিপন্থী। পৃথিবীতে মানুষের তৈরি আইন পরিবর্তনশীল আর শরিয়াহ আইন অপরিবর্তনশীল। শরিয়াহ আইন আল্লাহ প্রদত্ত আইন। মানুষের হাত দেয়ার ক্ষমতা নেই। পশ্চিমা আইন তথা মানুষের তৈরি আইনে উকিল কেনা যায় এবং অর্থ দিয়ে রায়কে প্রভাবিত করা যায়। পশ্চিমা আইন ধনী ও গরিবের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করে। ধনীরা গরিবের চেয়ে অধিক আইনি সুবিধা ভোগ করে। শরিয়াহ আইন ঐশ্বরিক বিধান, এখানে উকিলের কোনো ভূমিকা নেই। কারণ হলো- বিচারের রায় আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত। কোন অপরাধের জন্য কি শাস্তি প্রয়োগ করতে হবে স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। পশ্চিমা আইনে রাষ্ট্রপ্রধান ইচ্ছা করলে যেকোনো অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারে। শরিয়াহ আইনে বাদি কোনো অপরাধীকে ক্ষমা করে দিলেও কাজী বা বিচারক তাকে দণ্ডিত করতে পারেন। পশ্চিমা আইন হলো গাছে তুলে মই কেড়ে নেয়ার মতো। শরিয়াহ আইন না থাকার কারণে মানুষ আইনকে তুয়াক্কা করছে না, যখন তখন আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। নানা রকম কুনীতির জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে নিরিহ জনগণ। ঘুষ ব্যতীত অফিস-আদালতে কোনো কাজ হচ্ছে না। শরিয়াহ আইনে না থাকার ফলে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেন- ‘তোমরা যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর আইন মানবে না ততক্ষণ পর্যন্ত শান্তি পাবে না। চুরি-ডাকাতি, মারামারি-হানাহানি, খুন-ধর্ষণ লেগেই থাকবে। যদি এ দেশে সুষ্ঠু সুন্দর ইসলামী শরিয়াহ আইন ও আইনের প্রয়োগ থাকতো তাহলে চুরি-ডাকাতি, খুন-ধর্ষণ, রাহাজানি, দুর্নীতি ও টাকা পাচার বন্ধ হয়ে যেতো।
কুরআনের আইন ও বিধিবিধান মানা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। আর নবীর আদর্শ অনুসরণ এবং তাঁর দেখানো পথ অনুসরণ করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য সুন্নত। শরিয়াহকে বলা হয় ইসলামী অনুশাসন। ইসলামী শরিয়াহ আইনের মূল কথা হলো আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন চালু করা। তাই ইসলামী শরিয়াহকে অবশ্য সবাই পালন করতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক কুরআনে বলেন- ‘আমি তোমাদের প্রত্যেকের জন্য জীবনবিধান (শরিয়াহ) ও সুস্পষ্ট জীবনযাপন প্রণালী (মানহাজ) নির্ধারণ করে দিয়েছি’ (সূরা মায়িদা-৪৮)। স্থান-কাল, বর্ণ-গৌত্র নির্বিশেষে সব মানুষের জন্য এই জীবনবিধান (শরিয়াহ) ও সুস্পষ্ট জীবন প্রণালী (মানহাজ) অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘তিনি তোমাদের জন্য সেই কিতাব (শরিয়াহ) দিয়েছেন যা দিয়েছি নূহকে এবং একই (কিতাব) শরিয়াহ আমি ইবরাহিম, মূসা ও ঈসাকে দিয়েছিলাম, বলেছিলাম দ্বীন কায়েম করো, এ নিয়ে মতবিরোধ করো না’ (সূরা শুরা-১৩)। আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন- ‘আমি আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সাথে দিয়েছি কিতাব ও মিজান (ন্যায়দণ্ড)। যাতে মানুষ ইনসাফের সাথে চলতে পারে।’ আল্লাহ কর্তৃক নাজিলকৃত বিধান দিয়ে রাষ্ট্র চালানো বা বিচার-ফয়সালা করা তাওহিদে রুবুবিয়াতের অন্তর্ভুক্ত। যে ব্যক্তি আল্লাহর আইন দিয়ে বিচার করে না; বরং অন্যের বিধান দ্বারা বিচার-ফয়সালা করতে চায়, তাদের ব্যাপারে কুরআনের আয়াতগুলো দুই ভাগে বিভক্ত। প্রথম প্রকারের আয়াতে তাদেরকে ঈমানহীন (মুনাফিক) দ্বিতীয় প্রকারের আয়াতে কাফির, জালিম ও ফাসিক বলা হয়েছে। ইসলাম হচ্ছে একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। এই বিধান ও দ্বীনকে ব্যক্তিগত জীবন, সমাজ জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবনে পালন করতে হবে। একজন মুসলমান হিসেবে ইসলামী শরিয়াহ তথা ইসলামী অনুশাসনকে মানতে হবে। শুধু নামাজ, রোজা, হজ আদায় করলে পরিপূর্ণ মুমিন মুসলমান হওয়া যায় না। মানুষকে পরিপূর্ণ ঈমানদার হওয়ার জন্য ইসলামী দ্বীন ও জীবনবিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে। পৃথিবীতে ইসলামী শাসনব্যবস্থা হচ্ছে উত্তম শাসনব্যবস্থা। যা অন্য কোনো শাসনব্যবস্থা (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র) মানুষকে মুক্তি ও শান্তি দিতে পারেনি। ইসলামী শরিয়াহ আইন জীবনের সব ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করে।
আরব দেশের আইনের কথাই ধরুন, আরব দেশের আইন হচ্ছে কুরআনের আইন। ওখানে ধনী-গরিব সবার জন্য আইন সমান। সে জন্য আইনের প্রতি তারা খুবই শ্রদ্ধাশীল। আরবরা অন্যায়ভাবে মানুষ খুন করে না, কারণ শরিয়াহ আইনে খুনের বদলে খুন করা হয়। ওরা চুরি করে না, হাত কাঁটার শাস্তির ভয়ে। অথচ আমাদের দেশে চুরি-ডাকাতি, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি-দখলবাজি, খুন-ধর্ষণ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। টাকা থাকলে আইনকে ঘাইন বানানোর বহু নজির এ দেশে রয়েছে। আপনার জায়গা অন্যজন ভোগদখল করে খাচ্ছে। আপনি কোর্টে মামলা করে ২০ বছরেও নিজ দখলে আনতে পারছেন না; বরং এতে লাভবান হচ্ছে পুলিশ, উকিল, মুন্সি, পেশকার। মামলার রায় পেতে আপনার পকেটের বারোটা বেজে যাচ্ছে। ততদিন আপনার হায়াতের বাজেট শেষ হয়ে যাচ্ছে। কোনো কারণে আপনার একজন প্রতিবেশীকে অজ্ঞাত কোনো লোক হত্যা করে ফেললো। আপনার পকেটে টাকা না থাকলে আপনি মামলাও চালাতে পারবেন না। আর রায় পেতে সময় লাগবে কয়েক যুগ। ততদিনে আপনার ভিটামাটি বিক্রি করে নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এটিই হলো আমাদের দেশের বর্তমান আইন। এই আইনগুলো ভারত, ব্রিটেন, আমেরিকা থেকে নকল করা। অথচ এ দেশে ইসলামী শরিয়াহ আইন ও অনুশাসন চালু থাকলে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হতো। সাধারণ মানুষকে ন্যায়বিচারের আশায় থানা-পুলিশ ও কোর্ট-কাচারিতে ঘুরে ঘুরে পেরেশানি হতে হতো না।
আল কুরআনের আইন ও কুরআনের বিধিবিধান মানা প্রত্যক মুসলমানের জন্য ফরজ। মুসলমান হিসেবে কুরআন-সুন্নাহর বাইরে কোনো আইন মানা বাধ্যতামূলক নয়। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলেছেন- ‘তিনিই প্রেরণ করেছেন আপন রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীন সহকারে যেন এ দ্বীনকে অপরাপর দ্বীনের উপর জয়যুক্ত করেন’ (সূরা তাওবাহ-১৩)। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রত্যেকটি আদেশ পালনে নিহিত আছে মানবকল্যাণ ও শান্তি। পক্ষান্তরে, আল্লাহ ও রাসূল সা:-এর প্রত্যেকটি নিষিদ্ধ ও বর্জনীয় কাজের মধ্যে নিহিত রয়েছে উভয় জগতে অশান্তি, যা বাস্তবে বর্তমানে দৃশ্যমান ও বিরাজমান। আপনি ঈমান গ্রহণের সময় আল্লাহর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন আমি আসমানি কিতাবকে পরিপূর্র্ণভাবে বিশ্বাস করবো এবং সে অনুযায়ী জীবনযাপন করবো। আল্লাহকে দেয়া অঙ্গীকার আপনি ভুলে গেলেন। এ দেশ থেকে কোনো দিন খুন-খারাবি বন্ধ হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত কুরআনের আইন ও ইসলামী অনুশাসন চালু করা হবে না। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যে ধর্ম সব মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে পেরেছে। পৃথিবীতে অন্য কোনো ধর্ম এতগুলো ন্যায়নীতি-আদর্শ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। আজকে ইসলামী শাসন ও শরিয়াহ আইন না থাকার কারণে দেশের মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। মানুষ খুন করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। দুর্নীতি, লোটপাট, চুরি-ডাকাতি, খুন-ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না। অথচ ইহুদি খ্রিষ্টান ও তাদের দালালরা এই শরিয়াহ আইনকে জংলি, বর্বর আইন বলে মিডিয়ায় প্রচার করতেছে। যেটি একজন কাফের মুশরেক বললে শোভা পায়। কিন্তু যখন একজন মুসলমান তাদের সাথে তাল মিলিয়ে উগ্র বর্বর আখ্যা দেয় তখন শোভা পায় না। ইসলাম শুধু পালন করার বিষয় নয়, শুধু নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত আদায় করলে ঈমানদার হওয়া যায় না। নিজেকে একজন পরিপূর্ণ মুসলমান হিসেবে দাবি করতে হলে আল্লাহর দেয়া বিধিবিধান ও রাসূলের সুন্নাহকে মানতে হবে। আমরা নিজেকে বড় মুসলমান দাবি করি অথচ কুরআনের আইন ও রাসূলের সুন্নাহকে প্রতিষ্ঠা করার কথা বললে মানতে চায় না। আমাদের নবী পাক সা: ও সাহাবায়ে কেরামরা সুন্নাহও পালন করেছেন আবার ইসলামী হুকুমত তথা ইসলামী শাসন ও আল্লাহর শরিয়াহ আইন প্রতিষ্ঠা করার জন্য এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফর করেছেন এবং সেখানে ইসলাম প্রচার ও আল্লাহর শাসন কায়েম করেছেন। যেখানে আল্লাহর আইন ও নবীর সুন্নাহ থাকবে না সেখানে বিদয়াতি কাজকর্ম ও নানা রকম অপসংস্কৃতি চালু হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট



