গৌরনদীতে অবৈধ স্থাপনা রেখেই খাল খনন, পানিপ্রবাহ নিয়ে শঙ্কা

Printed Edition
অবৈধ স্থাপনা রেখেই চলছে খননকাজ : নয়া দিগন্ত
অবৈধ স্থাপনা রেখেই চলছে খননকাজ : নয়া দিগন্ত

জহুরুল ইসলাম জহির গৌরনদী (বরিশাল)

বরিশালের গৌরনদী উপজেলা সদরের গয়নাঘাট খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, কৃষকের স্বার্থে নেয়া এ প্রকল্প বাস্তবে সরকারি অর্থ অপচয়ের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। খাল খননের নামে দায়সারাভাবে কাজ করা হচ্ছে। রেখে দেয়া হচ্ছে প্রভাবশালীদের অবৈধ স্থাপনা। ফলে প্রকল্পের সুফল পাওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে কৃষকদের মধ্যে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, বাকাই-গৌরনদী-আগৈলঝাড়া-চোদ্দমেদার বিল উপপ্রকল্পের আওতায় গয়নাঘাট খাল পুনঃখননের উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রায় সোয়া দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এ খালটি গত কয়েক বছরে দখল ও অবৈধ স্থাপনার কারণে সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। পলি জমে নাব্যতা হারিয়ে কার্যত ভরাট হয়ে যায় খালটি।

১৯৯৮-৯৯ অর্থবছরে কৃষকদের সেচ সুবিধার জন্য খালের মুখে একটি স্লুইসগেট নির্মাণ করে পাউবো। তবে পরবর্তীতে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার কৃষকের বোরো চাষে সংকট দেখা দেয়। বাধ্য হয়ে কৃষকেরা বিকল্প সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে চাষাবাদ চালিয়ে আসছেন। এতে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়ে যায়।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, কৃষক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবু আবদুল্লাহ খান, পাউবোর কর্মকর্তারা ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা খালটি পরিদর্শন করেন। পরে অপরিকল্পিত স্লুইসগেট অপসারণ ও খাল পুনঃখননের জন্য প্রায় ৯০ লাখ ২৫ হাজার টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব আকারে পাঠানো হয়।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্য, ৩২ ফুট প্রস্থ ও ৬ ফুট গভীরতায় খননের জন্য ২৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়। প্রকল্পটির কার্যাদেশ পায় বরিশালের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন এন্টারপ্রাইজ। গত ১৫ মে থেকে খননকাজ শুরু হয়।

তবে কাজ শুরুর পর থেকেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, খালের দুই পাশের আবর্জনা পরিষ্কার করে তা আবার খালের মধ্যেই ফেলা হচ্ছে। কোথাও কোথাও খনন করা মাটি খালের পাশে ফেলে রাখা হয়েছে, যা সামান্য বৃষ্টিতেই আবার খালে গিয়ে পড়ছে।

স্থানীয়দের আরো অভিযোগ হলো, কয়েকজন প্রভাবশালী ও অর্থশালী ব্যক্তির কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে তাদের অবৈধ স্থাপনা অক্ষত রেখেই খননকাজ করা হচ্ছে। ফলে কোথাও কোথাও মূল খালের এক পাশ কেটে দায়সারাভাবে কাজ করা হয়েছে।

সরেজমিন দেখা গেছে, খালের মুখের অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়নি। ফলে খননের পরও শুরুতেই পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিছু স্থানে খালের ভেতরে থাকা স্থাপনা রেখেই পাশ ঘেঁষে খনন করা হয়েছে।

উত্তর বিজয়পুর গ্রামের বাসিন্দা আমজাত হোসেন ঝিন্টু বলেন, গয়নাঘাট খাল পুনঃখননের নামে সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে। কৃষকদের ভাগ্য বদলের কথা বলা হলেও বাস্তবে ঠিকাদারেরই ভাগ্য বদল হয়েছে। খাল গভীর না করে শুধু দুই পাশ পরিষ্কার করা হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা মোরশেদা বেগমের অভিযোগ, ঠিকাদার চরম স্বেচ্ছাচারিতা করছেন। প্রভাবশালীদের অবৈধ স্থাপনা রেখেই খননকাজ করা হচ্ছে।

এ দিকে কয়েকজন সুবিধাভোগী জানান, বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। গত বুধবার ইউএনও মো: ইব্রাহীম ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সরেজমিন খালটি পরিদর্শন করে গেছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মেসার্স আমিন এন্টারপ্রাইজের মালিক মো: নুরুল আমিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

তবে প্রকল্প তদারকির দায়িত্বে থাকা মো: আনোয়ার হোসেন হেমায়েত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, দখলকৃত জমিতে থাকা পাকা ভবন ভাঙা আমাদের কাজ নয়। এ ছাড়া অনৈতিক সুবিধা নেয়ার অভিযোগ সঠিক নয়।

পাউবোর উপসহকারী প্রকৌশলী মো: রুবেল হোসেন বলেন, অনিয়মের বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। যেসব ত্রুটি পাওয়া যাবে, সেগুলো সংশোধনের জন্য ঠিকাদারকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।