- খুলছে ১৩টি নতুন বিভাগ
- চলছে হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড
বদলে যাচ্ছে দেশের অন্যতম বৃহৎ ও উত্তর- পূর্বাঞ্চলের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি)।
নতুন ১৩টি বিভাগ চালুর উদ্যোগ ও হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের এক যুগান্তকারী কর্মযজ্ঞ চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। একই সাথে ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ১৩ বিভাগ চালু হলে শাবিপ্রবির চেহারা একদম বদলে যাবে বলে আশা করছে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার।
শাবিপ্রবির দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এভিয়েশন, আইন ও প্রকৌশল বিষয়সহ শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) নতুন ১৩টি বিভাগ খুলতে যাচ্ছে। একই সাথে ১০তলা বিশিষ্ট দুইটি আবাসিক ভবনসহ ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে এই বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন বঞ্চিত থাকলেও বিগত এক বছরে পাল্টে যাচ্ছে শাবি। গড়ে উঠছে নতুন ১৪টি বহুতল ভবনসহ ১৬ ভবন। যেখানে থাকছে একাডেমিক ভবন, আবাসিক হল, প্রশাসনিক ভবন, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হল ও মসজিদ কমপ্লেক্স।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় অধিকতর উন্নয়ন (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের পরিচালক ও শাবিপ্রবির প্রধান প্রকৌশলী জয়নাল ইসলাম চৌধুরী মঙ্গলবার দুপুরে নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, এক হাজার ২৭ কোটি টাকার এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে মোট ১৬টি প্রকল্প রয়েছে। এগুলোর মধ্যে ১৪টিই বহুতল ভবন, একটি চারতলা মসজিদ ও একটি গ্যারেজ রয়েছে। হাজার কোটি টাকার এই উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ জোরদার গতিতে এগিয়ে চলছে। এই প্রকল্পের ৫০ ভাগেরও বেশি কাজ সম্পন্ন হলেও আগামী ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সবগুলো প্রকল্প সম্পন্ন করার সময় নির্ধারিত আছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং, মেটেরিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, আইন, আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজসহ নতুন ১৩টি বিভাগ খোলা হবে। ফলে দীর্ঘ ১৭ বছর পর অত্যাধুনিক যুগোপযোগী বিভাগ চালু হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। আধুনিক বিজ্ঞানের এসব বিভাগ চালুর ফলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে শাবিপ্রবি। এমনটাই মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘ ১৭ বছর যুগের চাহিদার আলোকে কোনো বিভাগ খোলা হয়নি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বরাবরই অবহেলিত ছিল শাবিপ্রবি। জুলাই গণ-অভ্যুথানের পর ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ পান শিক্ষাবিদ ও গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যোল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী। তিনি যোগদানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক বিভাগ খোলার উদ্যোগ নেন। সেই ধারাবাহিকতায় ১৩টি বিভাগ চালুর অপেক্ষায় রয়েছে শাবিপ্রবি।
জানা গেছে, দেশের প্রথম বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ১৯৮৬ সালের ২৫ আগস্ট যাত্রা শুরু করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। রসায়ন, পদার্থ ও অর্থনীতি, এই তিন বিভাগ দিয়ে ১৯৯১ সালে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৪ বছরের একাডেমিক যাত্রায় ২৮টি বিভাগ ও দু’টি ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে। তবে গত ১৭ বছরই এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যুগের চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে কোনো বিভাগ খোলা হয়নি।
বিশ্বজুড়েই যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে দিন দিন বাড়ছে উড়োজাহাজ বা বিমানের চাহিদা ও ব্যবহার। এসব বিমান তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজন পড়ে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বা উড়োজাহাজ প্রকৌশলীদের। দেশের এভিয়েশন সেক্টরের প্রবৃদ্ধি বাড়লেও দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে এই খাতে। এই অভাব পূরণ করতে শাবিপ্রবিতে চালু হচ্ছে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ।
মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং প্রকৌশল বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা, যা যান্ত্রিক, বৈদ্যুতিক, কম্পিউটার ও নিয়ন্ত্রণ প্রকৌশলকে একত্রিত করে। এটি স্মার্ট সিস্টেম, পণ্য ডিজাইন ও তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এর মধ্যে রোবোটিক্স, অটোমেশন ও বিভিন্ন শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি অন্তর্ভুক্ত। দেশে শিল্প কারখানার বিকাশ ঘটলেও এই সেক্টরে দক্ষ জনশক্তির অভাব। এটি পূরণ করতে মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ চালুর উদ্যোগে নেয়া হয়েছে।
বর্তমান বিশ্বের অগ্রসরমান ও সম্ভাবনাময়ী ইঞ্জিনিয়ারিং সাবজেক্টগুলোর মধ্যে মেটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং অন্যতম। মেটাল, সিরামিক, সেমিকন্ডাক্টার, পলিমার, কম্পোজিট সেক্টরে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে এ বিভাগ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে শাবিপ্রবি।
এই তিনটি বিভাগের বাইরে চালু হবে আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্মেসি, সয়েল সায়েন্স, বোটানি অ্যান্ড জুওলজি, আইন, আল কুরআন দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ (শাহজালাল রহ: স্টাডিজ) ইত্যাদি।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক হল, আন্তর্জাতিক হোস্টেল, শিক্ষক কোয়ার্টার ও আধুনিক মসজিদসহ নানা অত্যাধুনিক স্থাপনা গড়ে উঠছে বিশ্ববিদ্যালয়ে। এর মধ্যে ১০তলা বিশিষ্ট দু’টি একাডেমিক ভবন, দু’টি আবাসিক হল, সাত তলাবিশিষ্ট একটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হল, ১০তলা বিশিষ্ট একটি প্রশাসনিক ভবনসহ ১০টি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এ ছাড়া শিগগির আরো ছয়টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। এসব প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হলে কাক্সিক্ষত গন্তব্যে এগিয়ে যাবে বিশ্ববিদ্যালয়, এমনটাই মনে করছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সৈয়দ ছলিম মোহাম্মদ আবদুল কাদির নয়া দিগন্তকে জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ শেষ হলে শাবিপ্রবির চেহারা বদলে যাবে। আরো বেশি যুগোপযোগী ও আধুনিক হয়ে উঠবে শাবিপ্রবি।
শাবিপ্রবির পরিকল্পনা ও উন্নয়ন দফতরের (ভারপ্রাপ্ত) পরিচালক আহমদ মাহবুব ফেরদৌসী নয়া দিগন্তকে জানান, ১৬ বছর থেকে নিদারুণ বঞ্চিত শাবিপ্রবিতে এখন উন্নয়নের জোয়ার বইছে। আরো উন্নয়ন হবে ইনশাআল্লাহ। এসব আমাদের অনেক প্রাপ্য হিস্যা। যেগুলো শাবিপ্রবি আগে পায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো: ইসমাইল হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান বাড়াতে গবেষণা মঞ্জুরি ও ভালো মানের প্রকাশনার জন্য প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। এমফিল ও পিএইচডি গবেষক এবং শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী করে তুলতে রিসার্চ গ্র্যান্ট চালু করা হয়েছে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, বিগত ১৭ বছর এ বিশ্ববিদ্যালয়ে গতানুগতিক বিভাগ খোলা হয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয় অনেক সম্ভাবনার হওয়া সত্ত্বেও অবহেলিত ছিল। তিনি বলেন, এটা সিলেটবাসীর গর্বের প্রতিষ্ঠান। অনেক সম্ভাবনাময় একটি বিশ্ববিদ্যালয়। গতানুগতিকতার বাইরে গিয়ে যুগের চাহিদার আলোকে প্রকৌশল বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ খোলা হচ্ছে। এ ছাড়া ধর্মীয় ও নৈতিক জনশক্তি তৈরি করতে আল কুরআন দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগও খোলা হচ্ছে। এসব বিভাগ চালু হলে শাবিপ্রবি তার পূর্ণাঙ্গ রূপ পাবে। প্রফেসর ড. এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী আরো বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নে বৈপ্লবিক সূচনা হয়েছে। প্রায় ১৬টিরও বেশি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এসব প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের চেহারা বদলে যাবে।



