গ্রাহক আস্থায় অবিচল : ঘুরে দাঁড়াচ্ছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

দেশের ব্যাংক খাতে অস্থিরতা, সুশাসনের সঙ্কট ও গ্রাহক আস্থাহীনতার মধ্যেও ব্যতিক্রমী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে আল-আরাফা ইসলামী ব্যাংক। নতুন বছরের শুরুতে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ব্যাংকটি এখন আবারো গ্রাহকের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সঙ্কটকালেও বাংলাদেশ ব্যাংকের তারল্য সহায়তা ছাড়াই স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা, কোনো চেক ডিজঅনার না হওয়া এবং ধারাবাহিকভাবে আমানত ও গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধি- এসবই ব্যাংকটির পুনরুদ্ধারের ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারের শুরুর দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ১২টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে। এর মধ্যে ছিল আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকও। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগে ব্যাংকটির শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়। এতে ২০২৫ সালজুড়ে কিছুটা অস্থিরতা তৈরি হলেও বড় ধরনের আর্থিক লুটপাটের প্রমাণ না পাওয়ায় ব্যাংকটি দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে সক্ষম হয়। ব্যাংকের আর্থিক সূচকেও মিলছে সেই ইতিবাচক চিত্র। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকটির আমানত দাঁড়ায় ৫৪ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা বেশি। একই সময়ে আমানত হিসাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ লাখ ৬৬ হাজারে। বিনিয়োগও বেড়ে হয়েছে ৫০ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে পরিচালন মুনাফা হয়েছে ৮৫ কোটি টাকা এবং নতুন যুক্ত হয়েছে প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার হিসাব।

ব্যাংক-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই পুনরুদ্ধারের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে গ্রাহকসেবার ধারাবাহিকতা। সঙ্কটের মধ্যেও কোনো গ্রাহকের চেক ফেরত যায়নি, কোনো শাখায় সেবাবিঘœ তৈরি হয়নি। ফলে গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়নি। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রেও জানা গেছে, অন্যান্য দুর্বল ব্যাংকের মতো আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে কখনোই জরুরি তারল্য সহায়তা নিতে হয়নি।

গত দেড় বছরে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নেও বড় পরিবর্তন এনেছে ব্যাংকটি। নতুন কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ‘আবাবিল এনজি’ চালুর ফলে ইন্টারনেট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, এটিএম, আরটিজিএস ও এনপিএসবি সেবা আরো দ্রুত, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন হয়েছে। একই সাথে ডিজিটাল ব্যাংকিং ও ইসলামিক ওয়ালেটভিত্তিক একটি সমন্বিত আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলেছে ব্যাংকটি। গ্রামীণ অর্থনীতিতেও ভূমিকা বাড়িয়েছে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। বর্তমানে দেশের ৩০৬টি উপজেলায় ৭৩৮টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেটের মাধ্যমে সেবা দিচ্ছে ব্যাংকটি। এর ৮৮ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত এবং প্রায় অর্ধেক গ্রাহক নারী। এ ছাড়া আল-আরাফাহ রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় দুই হাজার ৭৮০টি গ্রামে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ ও সঞ্চয় কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো: রাফাত উল্লাহ খান বলেন, ‘আস্থা হারানো সহজ; কিন্তু ফিরে পাওয়া কঠিন। নানা চ্যালেঞ্জ ও গুজবের মধ্যেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক গ্রাহকের আস্থা ধরে রাখতে পেরেছে। সুশাসন, স্বচ্ছতা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমরা আবারো শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হচ্ছি।’ সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, ব্যাংক খাতের চলমান সঙ্কটের মধ্যেও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের এই পুনরুদ্ধার দেশের আর্থিক খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। সুশাসন, জবাবদিহিতা ও গ্রাহককেন্দ্রিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে সঙ্কট কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব- আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক এখন তারই একটি উদাহরণ।