বুটেক্স প্রতিনিধি
বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুটেক্স) শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত অটোমেশন একপ্রকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। প্রশাসনিক মারপ্যাঁচ এবং শিক্ষক, আইসিটি সেল ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ত্রিমুখী দ্বন্দ্বের কারণে এই উদ্যোগ এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। মূলত, ব্যক্তিগত জেদ আর দায় এড়ানোর রাজনীতির কবলে পড়ে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার এই বিশাল কর্মযজ্ঞ এখন বাতিলের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। যেখানে শিক্ষকদের দাবি প্রকল্পের সফটওয়্যার অংশের কাজ কিছুই সম্পন্ন হয়নি, অপর দিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বলছে কাজ অনেকটা এগিয়েছে, এমন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে থমকে আছে পুরো প্রক্রিয়া।
মূলত বুটেক্স উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ‘ প্রকিউরমেন্ট অব মেশিনারিজ অব নেটওয়ার্ক অ্যান্ড কমিউনিকেশন ল্যাব’ অংশের আওতায় ইন্টিগ্রেটেড ইউনিভার্সিটি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের (আইইউএমএস) মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল রূপান্তরের কাজ শুরু হয়েছিল। ২০২৪ সালের জুন মাসে প্রকল্পের মেয়াদ হলেও অজানা কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এখনো প্রকল্পটি বুঝে নিচ্ছে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ অনেকটা সম্পন্ন করার দাবি করলেও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা অসম্পূর্ণতার দোহাই দিয়ে তা বুঝে নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন। ফলে নতুন ওয়েবসাইট, অনলাইন রেজাল্ট পাবলিশ, সিটি ও অ্যাটেনডেন্সের মার্ক অনলাইন হওয়া, এমনকি ফরম ফিলাপ ও হলের সিট বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সুবিধাগুলোর ডিজিটালাইজেশন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
গত ৩১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চিঠি দিয়ে প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। চিঠিতে যতটুকু কাজ হয়েছে তা দ্রুত বুঝে নিয়ে ঠিকাদারের বিল পরিশোধ এবং আগামী এক মাসের মধ্যে প্রজেক্ট কমপ্লিটেন্স রিপোর্ট (পিসিআর) জমা দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে এই নির্দেশনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবগুলো বিভাগ এবং দফতরের প্রতিনিধিদের সাথে মিটিং করেও প্রকল্প বুঝে নেয়ার বিষয়ে সম্মত হতে পারেনি প্রকল্পের টেকনিক্যাল কমিটি।
কমিটির সদস্য অধ্যাপক ড. মো: সাইদুজ্জামান অভিযোগ করেন, কাজ শেষ না হতেই আমাদের ওপর বুঝে নেয়ার চাপ দেয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো (রেজিস্ট্রার, অ্যাকাউন্টস) কেউ ফর্মে লেখেনি যে কাজ সম্পন্ন হয়েছে। সবাই ‘চলমান’ বা ‘অসন্তুষ্ট’ মন্তব্য করেছে। তাহলে আমরা কিভাবে বুঝে নেবো। তা ছাড়া ২০২৪ সালের প্রজেক্ট এখন বুঝে নিতে হলে ব্যাকডেটে সই করতে হবে, যা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে।
আইইউএমএস সফটওয়ার ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভারে সমন্বয় করা হয়েছে। এর মাধ্যমে গত তিনবার এমবিএ এবং একবার এমএসসি ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হয়েছে এবং শুরুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম ব্যাচ দিয়ে সিস্টেম শুরু করা হয়। কিন্তু কিছুসংখ্যক শিক্ষকের অসহযোগিতায় কোনো বিভাগই তাদের লেভেল-১ টার্ম-২ এর ফলাফল না দেয়ায় ওই ব্যাচকে আর সিস্টেমে রাখা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম ব্যাচের লেভেল-১ টার্ম-২ এর ক্লাস প্রায় শেষ হতে চললেও অনেক বিভাগ তাদেরকে এখনো এই সিস্টেমে তোলেনি এবং হাজিরা, ক্লাস, পরীক্ষা ইত্যাদি কোনো নম্বর সিস্টেমের মাধ্যমে দিতে শুরু করেনি বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।
ইউজিসির চিঠির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন পরিচালক অধ্যাপক ড. শেখ মো: মামুন কবীর বলেন, আমাকে প্রকল্পটি দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে।
এ দিকে প্রকল্পের কাজ পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাইপারট্যাগ সল্যুশনসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। চুক্তি অনুযায়ী প্রকল্প বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই। ওয়েবসাইট বা সফটওয়্যার যদি কিছুই না হয়ে থাকে, তবে মাস্টার্সসহ কয়েকটি বিভাগের রেজাল্ট এই সিস্টেম দিয়ে কিভাবে পাবলিশ হলো। আমরা পরবর্তী তিন বছর টেকনিক্যাল সাপোর্ট দেয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ আছি। চেক অ্যান্ড এররের মাধ্যমে এটি নিয়মিত আপডেট করতে হবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ শুরুতেই বলছে কিছুই হয়নি।
ভিসি অধ্যাপক ড. জুলহাস উদ্দিন বলেন, প্রকল্পটি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সময় আমি উপাচার্যের দায়িত্বে ছিলাম না। আমি দায়িত্ব নিয়েছি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস পরে। তবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কাজ বুঝে নিয়ে পিসিআর জমা দেয়ার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করার অনুরোধ জানিয়েছি।
এ দিকে প্রশাসন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এই রশি টানাটানিতে শেষ পর্যন্ত বলি হচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ডিজিটাল ক্যাম্পাসের স্বপ্ন এখন ব্যক্তিগত জেদ ও প্রশাসনিক মারপ্যাঁচে বিলীন হওয়ার পথে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ৫০তম ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করতে অনেক সময় লাগে এবং নম্বর ও ফলাফল নিয়মিতভাবে আপডেট করা হয় না। ফলে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে। দ্রুত এসব সমস্যার সমাধান করে সিস্টেমটিকে কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য করা প্রয়োজন, যেন ডিজিটাল ক্যাম্পাসের উদ্যোগ বাস্তবে শিক্ষার্থীদের উপকারে আসে।



