স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে শহর থেকে গ্রাম- সবখানেই শুরু হয়ে গেছে প্রস্তুতি। নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর নাগাদ ধাপে ধাপে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ- এই পাঁচ স্তর নিয়ে স্থানীয় সরকার। তবে কোন পর্যায়ের নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে সেই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। তার পরও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও তাদের সম্ভাব্য প্রার্থী নিয়ে বেশ জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। এ দিকে পতিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা রাজনৈতিক সঙ্কট ও নিষেধাজ্ঞার মুখে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচনের ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছেন। জনরোষ এড়াতে ও বিতর্কিত দলীয় পরিচয় আড়াল করতে তারা স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামাচ্ছেন। ইতোমধ্যে দলটির প্রধান শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বিশেষ নির্দেশনাও দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
সূত্র বলছে, গেল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এরপরই আলোচনার তুঙ্গে রয়েছে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। সরকার ও বিরোধীদলের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে তাদের প্রার্থিতা জানান দিতে শুরু করেছেন। এ দিকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নজিরবিহীন পতনের পর আত্মগোপনে ছিল আওয়ামী লীগের সব পর্যায়ের নেতারা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের অভ্যন্তরে আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা আড়ালে আবডাল থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে শুরু করেন। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে পতিত আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা ঘরে বসে নেই। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ- স্থানীয় সরকারের এই পাঁচ স্তরের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশগ্রহণ করার জন্য ভেতরে ভেতরে জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছে পতিত দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা।
পতিত দলের নির্বাচনী কৌশল
জনসংযোগ ও গোপন প্রস্তুতি : শীর্ষ ও বিতর্কিত নেতারা আত্মগোপনে থাকলেও, তৃণমূলের সাথে সম্পর্ক রাখা অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজের নেতারা গোপনে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। পরিচয় গোপন: ‘দলের’ সাইনবোর্ড ব্যবহার না করে ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রাধান্য দিয়ে ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা চলছে। অন্য দলের নেতাকর্মীদের সাথে আঁতাত কোথাও কোথাও পতিত আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা অন্যান্য রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের সাথে গোপন সমঝোতা বা আঁতাত করে নির্বাচনে জয়ী হওয়ারও ছক কষছেন।
দলীয় প্রতীক বাদ পড়ায় স্বস্তি : পতিত সরকারের আমলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয় করার জন্য একটি অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশ এখন নির্বাচিত সরকার জাতীয় সংসদে আইন হিসেবে পাস করেছে। যার ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচনী আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে স্বস্তি অনুভব করছে পতিত আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। আর এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েই পতিত দলটির সম্ভাব্য প্রার্থীরা কোনো দলীয় প্রতীক ব্যবহার না করে স্বতন্ত্র ব্যানারে নির্বাচনে লড়ার জন্য জোরালো প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
দলটির শীর্ষ নেতাদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার গঠন হয়েছে। আইনি মারপ্যাঁচে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিদায় হয়েছে- সেই জায়গাতে আওয়ামী লীগের জন্য কিছুটা হলেও একটা স্বস্তির জায়গা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে নেতাকর্মীরা জামিন না পেলেও নতুন সরকারের আমলে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জামিন লাভ করছেন, কারাগার থেকে অনেকেই মুক্ত হয়েছেন। নির্বাচনের পরপরই কয়েকটি জেলা-উপজেলায় আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয় খুলতে দেখা গেছে। এভাবে রাজনীতিতে ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের জন্য একটা স্পেস তৈরি হচ্ছে। আত্মগোপনে থাকা স্থানীয় অনেক নেতাই জনসমক্ষে কথা বলছেন, আগের মতোই প্রকাশ্যে সামাজিক ও ধর্মীয় নানা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করছেন, এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে কেউ কেউ তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টাও করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয় করার সিদ্ধান্ত নেয়ার সুবাদে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ও স্থানীয় প্রভাবশালী নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নামার জন্য কৌশলগত অবস্থান নিয়েছেন। তবে পতিত সরকারের এই কৌশল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে প্রচণ্ড বিরোধিতার আশঙ্কা রয়েছে। সাধারণ ভোটার এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাদের অতীত কর্মকাণ্ড ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিষয়গুলো সামনে এনে প্রচারণায় বাধা দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে, স্বতন্ত্র পরিচয়ে নির্বাচন করতে গিয়েও পতিত দলের প্রার্থীদের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সামাজিক প্রতিরোধের মুখে পড়তে হতে পারে। এ জন্য দীর্ঘ দিন থেকে দলের যারা ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান ও মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের মধ্যে বিতর্কিত নয় বরং অভিজ্ঞ, জনপ্রিয় ও ক্লিন ইমেজ-সম্পন্ন নেতাদের প্রার্থী হিসেবে স্থানীয় পর্যায়ে আগেভাগেই দলীয় প্রধানের তরফ থেকে জোরালোভাবে প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যেসব জায়গায় আওয়ামী আমলে নির্বাচিতদের কেউ মামলার কারণে প্রার্থী হতে পারবে না সেসব জায়গায় বিকল্প প্রার্থীও দাঁড় করানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে।



