ফেসবুক ও ফেক আইডি নেটওয়ার্কে ছড়াচ্ছে ভুয়া তথ্য

অনলাইনে অপপ্রচার ও গুজবের ছড়াছড়ি

Printed Edition

হারুন ইসলাম

দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি যখনই উত্তপ্ত বা সংবেদনশীল হয়ে ওঠে, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য ও পরিকল্পিত অপপ্রচারের মাত্রা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। বর্তমানে ফেসবুকসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করলেই দেখা যায় ‘ব্রেকিং নিউজ’ শিরোনামে অসংখ্য বিভ্রান্তিকর পোস্ট, ভুয়া ফটোকার্ড, সম্পাদিত ভিডিও এবং মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। এসব কনটেন্টের বড় অংশই এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীরা সহজেই সেগুলোকে সত্য বলে বিশ্বাস করেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- দেশের পরিচিত মূলধারার গণমাধ্যমগুলোর লোগো, ফন্ট ও গ্রাফিক্স ডিজাইন হুবহু নকল করে এসব ভুয়া কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতা, বিশিষ্ট ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নামে কাল্পনিক বক্তব্য জুড়ে দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেগুলো হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। পরে ফ্যাক্টচেকিংয়ের মাধ্যমে দেখা যায়, এসব তথ্যের বড় অংশই সম্পূর্ণ মিথ্যা, বিকৃত অথবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ছড়ানো হয়েছে।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের পর্যবেণ বলছে, রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ার সাথে সমানতালে বাড়ছে ডিজিটাল অপপ্রচারও। ভুয়া ফটোকার্ড, এডিটেড অডিও-ভিডিও এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিতে তৈরি ডিপফেক কনটেন্ট এখন অপপ্রচারের বড় হাতিয়ার। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব কর্মকাণ্ড বিচ্ছিন্ন ব্যক্তির আবেগতাড়িত আচরণ নয়; বরং নির্দিষ্ট ল্য ও বাজেট নিয়ে পরিচালিত সুসংগঠিত ফেক আইডি নেটওয়ার্ক, ফেসবুক পেজ, গ্রুপ সিন্ডিকেট ও বুস্টিং এজেন্সির মাধ্যমে এগুলো পরিচালিত হচ্ছে।

ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে বারবার একই অভিযোগ

সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, রাজনৈতিক গুজব ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণার েেত্র একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নাম ঘন ঘন উঠে আসছে। বিশেষ করে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মতাচ্যুত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর কিছু ভেরিফায়েড পেজ ও চিহ্নিত অ্যাকাউন্ট থেকে অপতথ্য ছড়ানোর অভিযোগ সামনে আসে।

ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক মাসে দেশের সাইবার স্পেসে প্রায় দেড় হাজারের কাছাকাছি ভুল, অসত্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শনাক্ত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এসব অপপ্রচারের বড় অংশ রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত এবং পরিকল্পিতভাবে জনমত বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক সমর্থকদের সক্রিয় রাখা, সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি করা এবং সামাজিক অস্থিরতা বাড়ানোর ল্েযই এসব ডিজিটাল প্রচারণা পরিচালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অনেক রাজনৈতিক গোষ্ঠীর জন্য সবচেয়ে সহজ ও কম ব্যয়বহুল প্রোপাগান্ডা প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতিতেও অপপ্রচার

২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার সময়ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা থেমে থাকেনি। যখন সাধারণ মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও শিার্থীরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন, তখন বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগের ছবি ও ভিডিওকে রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি হিসেবে প্রচার করার অভিযোগ ওঠে।

ফ্যাক্টচেক অনুসন্ধানে এমন একাধিক ঘটনা শনাক্ত হয়। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি ও ফেনীতে স্থানীয় সামাজিক সংগঠনের উদ্ধার কার্যক্রমকে ছাত্রলীগের উদ্যোগ হিসেবে প্রচার করা হয়। মিরসরাইয়ে একটি সামাজিক সংগঠনের রেসকিউ কার্যক্রম উপজেলা ছাত্রলীগের কর্মসূচি বলে দাবি করা হয়। নোয়াখালীর কাদিরপুরে প্রবাসীদের অর্থায়নে পরিচালিত ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতার উদ্যোগ হিসেবে চালিয়ে দেয়া হয়। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এসব দাবির সত্যতা অস্বীকার করেন।

একইভাবে সেনবাগ ও করিমপুর এলাকায় সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরিচালিত ত্রাণ কার্যক্রমও রাজনৈতিক ব্যানারে প্রচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

পুরনো ভিডিও দিয়ে নতুন বিভ্রান্তি

গুজব ছড়ানোর আরেকটি বহুল ব্যবহৃত কৌশল হলো- পুরনো বা ভিন্ন ঘটনার ভিডিওকে নতুন রাজনৈতিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করে উপস্থাপন করা।

সম্প্রতি একটি ভিডিও ভাইরাল করে দাবি করা হয়, কুড়িগ্রামে এক নারী রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। কিন্তু ফ্যাক্টচেক অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি পুরনো এবং সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অপরাধমূলক ঘটনার। একইভাবে খুলনায় রাজনৈতিক নির্যাতনের অভিযোগে ভাইরাল হওয়া আরেকটি ভিডিওও পরে পুরনো ও অসংশ্লিষ্ট বলে প্রমাণিত হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ভিডিও সাধারণ মানুষের আবেগকে দ্রুত নাড়া দেয়। ফলে যাচাইয়ের আগেই মানুষ সেগুলো শেয়ার করতে শুরু করেন এবং অল্প সময়েই তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

যেভাবে কাজ করে ‘আইটি সেল’

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে গুজব ছড়ানো একটি সংগঠিত ও পেশাদার প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এর পেছনে কাজ করে ভাড়াভিত্তিক তথাকথিত ‘আইটি সেল’।

প্রথমে একটি ভুয়া পোস্ট, বিকৃত ফটোকার্ড বা বিভ্রান্তিকর ভিডিও তৈরি করা হয়। এরপর নির্দিষ্ট পেজ, গ্রুপ ও ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তা দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া হয়। পরে শত শত ফেক আইডি ও বট অ্যাকাউন্ট সমন্বিতভাবে বিভিন্ন গ্রুপে পোস্টগুলো শেয়ার করতে থাকে। অনেক েেত্র কনটেন্টের রিচ বাড়াতে অর্থ ব্যয় করে বুস্টিংও করা হয়। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লাখো মানুষের নিউজফিডে পৌঁছে যায় একটি মিথ্যা তথ্য। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের আবেগ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং যাচাই না করে শেয়ার করার প্রবণতাকেই কাজে লাগায় এসব অপপ্রচারকারী চক্র।

জাল ফটোকার্ড ও ডিপফেকের বিস্তার : জাতীয় নির্বাচন, রাজনৈতিক জোট, সরকারি সিদ্ধান্ত কিংবা ব্যক্তিগত ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভুয়া ফটোকার্ড তৈরির প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। দেশের পরিচিত গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে মনগড়া উদ্ধৃতি ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর কন্যা জায়মা রহমানকে উদ্ধৃত করে একাধিক ভুয়া ফটোকার্ড ভাইরাল হয়। পরবর্তীতে দেখা যায়, এসব বক্তব্যের কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। একইভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের নামেও ভুয়া উদ্ধৃতি ছড়িয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে।

অপপ্রচার এখন শুধু রাজনৈতিক দল বা নেতাদের ঘিরেই সীমাবদ্ধ নেই। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও বিচারিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও অনলাইনে সমন্বিত চরিত্র হননের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

বাস্তব জীবনেও প্রভাব ও বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা : বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইনের গুজব এখন আর ভার্চুয়াল জগতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা বাস্তব জীবনেও গুরুতর প্রভাব ফেলছে।

সম্প্রতি পুরনো অগ্নিসংযোগের ভিডিও নতুন করে ছড়িয়ে দিয়ে গোপালগঞ্জ ও ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতার দাবি করা হয়। পরে সেগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হলেও, এরই মধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই জরুরি প্রয়োজনেও ঘর থেকে বের হননি। গণপরিবহন চলাচলেও প্রভাব পড়ে।

একইভাবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেক পোস্ট ও স্ক্রিনশটকে কেন্দ্র করে শিার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অনেক সময় গুজবের সত্যতা যাচাই করতে কয়েক ঘণ্টা লেগে যায়, কিন্তু ততণে সেটি লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।