নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে কীটনাশক ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আসছে

Printed Edition

কাওসার আজম

নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে বালাইনাশক (কীটনাশক) আইন ও ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন নীতিমালায় কীটনাশক ডিলারের জন্য ন্যূনতম এসএসসি পাস এবং বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণের শর্ত আরোপের চিন্তা করছে। পাশাপাশি খুচরা বিক্রেতা (রিটেইলার) ব্যবস্থা ধাপে ধাপে তুলে দিয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডিলার অথবা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার প্রেসক্রিপশনের ভিত্তিতে কীটনাশক বিক্রির সুপারিশ আসছে বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে। একই সাথে প্রতি ওয়ার্ডে একজন বা প্রয়োজন হলে দু’জন অনুমোদিত ডিলার রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার কৃষি মন্ত্রণালয় গঠিত উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রথম বৈঠকে এসব নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ কৃষিসচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন। উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি আগামী তিন মাসের মধ্যে বিদ্যমান বালাইনাশক আইন, বিধিমালা, নিবন্ধন ও লাইসেন্সিং ব্যবস্থা, প্রশাসনিক কাঠামো, গবেষণাগারের সক্ষমতা এবং মনিটরিং ব্যবস্থা পর্যালোচনা করে নতুন নীতিমালার সুপারিশ করবে।

এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) মহাপরিচালক মো: আব্দুর রহিম জানান, বৈঠকে ডিলারদের শিক্ষাগত যোগ্যতাসহ আইনটিকে আরো যুগোপযোগী করার বিষয়ে নানা মত এসেছে। সবার মতামতের ভিত্তিতে বালাইনাশক আইন, বিধিমালার একটি সুপারিশ তৈরি করা হবে। যাতে শিক্ষাগত যোগ্যতার বিষয়টিও থাকবে।

বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো: আবদুছ ছালাম নয়া দিগন্তকে বলেন, টেকসই কৃষি উন্নয়ন, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্য কীটনাশকের পরিমিত ও মানসম্পন্ন ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, বর্তমানে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত বিভিন্ন কীটনাশকের গ্রুপ, সক্রিয় উপাদান (অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট), তাদের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পরীক্ষার মাধ্যমে কার্যকারিতা নিশ্চিত করেই বাজারজাত করার বিষয়টি নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত হবে।

ডিলারের জন্য এসএসসি ও প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক : ড. আবদুছ ছালাম বলেন, কৃষক সবচেয়ে বেশি নির্ভর করেন কীটনাশক ডিলারের পরামর্শের ওপর। অথচ অনেক বিক্রেতার প্রয়োজনীয় কারিগরি জ্ঞান নেই। ফলে নির্দিষ্ট পোকার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের পরিবর্তে দোকানে থাকা অন্য ওষুধ বিক্রি করা হয়। এতে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না; বরং পোকার মধ্যে কীটনাশকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা (রেজিস্ট্যান্স) তৈরি হয়। তিনি বলেন, আমরা চাই এই ব্যবসার সাথে যুক্ত সবাই অন্তত এসএসসি পাস হোক। পাশাপাশি বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। কোন পোকার জন্য কোন কীটনাশক, কত মাত্রায় ব্যবহার করতে হবে- এসব বিষয়ে তাদের দক্ষ হতে হবে।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ভবিষ্যতে কৃষক ফসলে রোগ বা পোকার আক্রমণ হলে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা অথবা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে পরামর্শ বা প্রেসক্রিপশন নিয়ে নির্দিষ্ট কীটনাশক ব্যবহার করবেন।

কমিটি খুচরা বিক্রেতা ব্যবস্থা বাতিলের সুপারিশও বিবেচনা করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক রিটেইলার প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। ফলে প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকলে বিকল্প কীটনাশক কৃষকের হাতে তুলে দেন। এতে সমস্যা সমাধান না হয়ে বরং আরো জটিল হয়।

প্রতি ওয়ার্ডে একজন ডিলার : কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে দেশে নিবন্ধিত কীটনাশক ডিলারের সংখ্যা প্রায় আট হাজার। নতুন ব্যবস্থায় বাজারে সঙ্কট সৃষ্টি না করে ধাপে ধাপে প্রতি ওয়ার্ডে একজন বা প্রয়োজন অনুযায়ী দু’জন অনুমোদিত ডিলার রাখার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে বিদ্যমান ডিলারের সংখ্যা, কৃষকের চাহিদা ও ভৌগোলিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের কীটনাশকের চাহিদার প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানিনির্ভর। বর্তমানে দেশে কীটনাশকের বাজার প্রায় সাড়ে সাত হাজার কোটি টাকার। এর মধ্যে ৫৫ শতাংশ বাজার সাতটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে। দেশীয় উৎপাদনকারীদের অংশ মাত্র চার শতাংশ।

বর্তমানে দেশে স্থানীয় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মাত্র ২২টি। বিপরীতে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯০০-এর বেশি।

আন্তর্জাতিক সংস্থা সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্স ইন্টারন্যাশনালের (ক্যাবি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭২ সালে দেশে কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল মাত্র চার হাজার টন। বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪০ হাজার টনে পৌঁছেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশে প্রায় ৩৯ হাজার ২৮৩ টন কীটনাশক আমদানি হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত ও অপরিকল্পিত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে শুধু কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ই বাড়ছে না, মাটি, পানি, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং জনস্বাস্থ্যও ঝুঁকির মুখে পড়ছে। একই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্যে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ (রেসিডিউ) পাওয়া গেলে রফতানিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।