সালমান এফ রহমানকে শেখ রেহানা

এক সেকেন্ডও দেরি কইরেন না আল্লাহ বাঁচাই রাখলে কথা হবে

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

পঞ্জিকার পাতা উল্টে যায়, কিন্তু কিছু দিন ইতিহাসের বুকে খোদাই হয়ে থাকে নিয়তির নির্মম পরিহাস হয়ে। ২০২৪ সালের সেই তপ্ত ৫ আগস্ট তেমনি এক দিন; যেদিন এক গণ-অভ্যুত্থানে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল এক পরাক্রমশালী সরকারের অহঙ্কার। সেই ঝড়ের রাতে যিনি ছিলেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, সেই শেখ হাসিনা বোনকে নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন নির্বাসনে। আর পেছনে ফেলে গিয়েছিলেন তার অনুগতদের, যারা তখন দিকবিদিকশূন্য হয়ে খুঁজছিলেন একটু আশ্রয়ের আলো। সেই মহাপ্রস্থানের ক্ষণে, ক্ষমতার অলিন্দে থাকা মানুষদের ভেতর যে হাহাকার আর উৎকণ্ঠা জমেছিল, তার এক টুকরো জীবন্ত দলিল গতকাল সোমবার প্রতিধ্বনিত হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিস্তব্ধ দেয়ালে।

জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী গণহত্যা আর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গতকাল সোমবার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিলেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর প্রভাবশালী উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এবং সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সিআইডির ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এসআই আতিকুর রহমানের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত কক্ষে যখন বেজে উঠল একটি অডিও রেকর্ড, তখন পুরো ট্রাইব্যুনালে নেমে এলো পিনপতন নীরবতা। সেটি ছিল ২ মিনিট ৯ সেকেন্ডের এক ফোনালাপ; ক্ষমতা হারানোর ঠিক ক্রান্তিলগ্নে শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানা এবং সালমান এফ রহমানের কণ্ঠস্বর।

সেই ফোনালাপে কোনো রাজনৈতিক দম্ভ ছিল না, ছিল কেবলই প্রাণ বাঁচানোর আকুল আর্তি। ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে বাজানো ইতিহাসের সেই ক্রান্তিকালের কথোপকথনটি ছিল ঠিক এমন :

সালমান : হ্যালো।

কর্নেল রাজিব : সালামালাইকুম স্যার। স্যার, কর্নেল রাজিব বলছি স্যার। রেহানা আপা একটু কথা বলত ওভার টু ওভার স্যার।

সালমান : কে?

কর্নেল রাজিব : রেহানা আপা, রেহানা আপা। জ্বি স্যার।

রেহানা : স্লামালাইকুম ভাইয়া।

সালমান : হ্যাঁ, অলাইকুমসালাম।

রেহানা : জি, আপনি কই?

সালমান : আমি আমার বাসায়।

রেহানা : থাইকেন না।

সালমান : থাকব না, হ্যাঁ, ঠিকাছে।

রেহানা : আমরা অন্য জায়গায় আছি, আমরা মানে ববি, টিউলিপ ওকে কনভিন্স করছে তো... কল না করতে পারলেও আল্লাহ যদি বাঁচাই রাখে কথা হবে।

সালমান : আচ্ছা, তো তোমরা অন্য জায়গায় চলে গেছ? আপাও গেছে?

রেহানা : জি ভাই। তো আপনি...

সালমান : আমরা যদি বাইর হইতে পারি, আমরা বের হয়ে যাব। আনিসুল হককেই বের করে ফেলি সাথে?

রেহানা : হ্যাঁ, হ্যাঁ, যেটা হয় আপনি ইমিডিয়েটলি ওই যে শায়ান আর জয় যেটা বলছে আপনি ওইটা করেন।

সালমান : ঠিকাছে, ঠিকাছে। ওকে।

রেহানা : এক সেকেন্ডও দেরি কইরেন না। কারণ সম্পার বাসায় গেছে ফটো তুলছে এবং চার দিকে মানে সাদা জোব্বা পরা দাড়িওয়ালা এই আরকি। ইউ শুড বি (ুড়ঁ ংযড়ঁষফ নব) মানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। আর আমি কনভিন্স করতেছি যে, মানে যা আছে ওইটা করব আরকি। এখানে একদম থাকা সেইফ না।

সালমান : আচ্ছা ঠিকাছে তাহলে ও কী বলবে, মার্শাল ‘ল’ ডিক্লার করতেছে না সে?

রেহানা : ওইগুলো এখন বাদ দেন, ইউ শুড বি লিভ ইমিডিয়েটলি।

সালমান : ওকে।

রেহানা : জ্বি ভাইয়া ফি-আমানিল্লাহ দোয়া করবেন।

সালমান : ফি আমানিল্লাহ।

রেহানা: স্লালামালাইকুম।

সালমান : অলাইকুমস্লাম।

যখন এই অডিও বাজছিল, তখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে সালমান এফ রহমান নিজের পুরনো কণ্ঠস্বর শুনছিলেন এক অদ্ভুত মগ্নতায়। নিয়তির কী নিষ্ঠুর খেলা! যে কণ্ঠ একসময় ছিল ক্ষমতার দাপটে কম্পমান, আজ তা স্রেফ অপরাধের অকাট্য প্রমাণ হিসেবে আদালতের ডায়েরিতে নথিভুক্ত হলো। তার পাশেই নির্বাক বসেছিলেন তারই একসময়ের সহযাত্রী আনিসুল হক, যার নামও জড়িয়ে ছিল সেই পালানোর আকুলতায়।

প্রসিকিউশনের পক্ষে আইনজীবী সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুস সাত্তার পালোয়ানদের যুক্তির পিঠে আসামিপক্ষের আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী জেরার জন্য কিছুটা সময় চেয়েছেন। ট্রাইব্যুনাল আগামী ৮ জুন পরবর্তী দিন ধার্য করেছেন।