নয়া দিগন্ত ডেস্ক
- গাজায় বেকারত্বের হার ৭৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে
- ইসরাইলি হামলায় কৃষিজমিতে ৭ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি
ইসরাইলের অব্যাহত আগ্রাসনে ফিলিস্তিনি অর্থনীতি মারাত্মক মন্দার মধ্যে পড়েছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ গাজার বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৭৭ শতাংশে। একই সময়ে সরকারি ঋণ বেড়ে হয়েছে ১৪ দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনকে ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে আলজাজিরা। ইসরাইলের অব্যাহত হামলা, পশ্চিমতীরে চলাচল ও বাণিজ্যে কঠোর বিধিনিষেধ এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতি এই সঙ্কটকে আরো গভীর করেছে। ফিলিস্তিনি সরকার ক্রমবর্ধমান আর্থিক সঙ্কট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার সীমায় পৌঁছে গেছে এবং মৌলিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো ও ফিলিস্তিন মুদ্রা কর্তৃপক্ষের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে অর্থনীতি গভীর মন্দায় নিমজ্জিত ছিল। গাজায় মোট দেশজ উৎপাদন ২০২৩ সালের তুলনায় ৮৪ শতাংশ কমেছে, আর পশ্চিমতীরে কমেছে ১৩ শতাংশ। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতি যুদ্ধপূর্ব অবস্থার অনেক নিচে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় প্রায় সব অর্থনৈতিক কার্যক্রম ভেঙে পড়েছে। পশ্চিমতীরেও অধিকাংশ খাতে বড় ধরনের সঙ্কোচন দেখা গেছে। ২০২৫ সালে গাজায় বেকারত্বের হার ৭৭ শতাংশ ছাড়িয়েছে। ফিলিস্তিনি অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-আমুর জানিয়েছেন, ইসরাইল প্রায় ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব আটকে রেখেছে। তিনি এটিকে সমষ্টিগত শাস্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, নভেম্বর ২০২৫ শেষে মোট সরকারি ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের জিডিপির ১০৬ শতাংশ। ঋণের মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের কাছে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, স্থানীয় ব্যাংক খাতের কাছে ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বকেয়া ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন, বেসরকারি খাতের কাছে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন, বহিঃঋণ ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন এবং অন্যান্য দায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন।
তিনি বলেন, এসব চাপ বাজেট ঘাটতি বাড়িয়েছে এবং সরকারের কার্যক্রম ও মৌলিক দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে। তার মতে, ১৯৯৪ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার পর এটাই সবচেয়ে কঠিন সময়। জাতিসঙ্ঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনি অর্থনীতি ২২ বছর আগের অবস্থায় ফিরে গেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিডিপি ২০২৩ সালের তুলনায় ২৯ শতাংশ কমেছে এবং মাথাপিছু আয় কমেছে ৩২ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকার জরুরি পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করা, পশ্চিমতীরের সি এলাকায় নাগরিকদের সহায়তা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে সমর্থন এবং শিল্প ও কৃষি খাতকে এগিয়ে নেয়া।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ খাত ৪১ শতাংশ সঙ্কুচিত হয়েছে। শিল্প ও কৃষি খাত কমেছে ২৯ শতাংশ করে। পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য কমেছে ২৪ শতাংশ। পর্যটন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইলের গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইনবাউন্ড পর্যটন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। প্রতিদিন প্রায় দুই মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয়েছে। ২০২৪ সালের শেষে ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় এক বিলিয়ন ডলার।
ফিলিস্তিনি অর্থনৈতিক নীতিগবেষণা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, ২০২৪ সালের প্রথমার্ধে পশ্চিমতীরে হোটেল দখল হার আগের বছরের তুলনায় ৮৪ শতাংশ কমেছে। শুধু আবাসন ও খাদ্যসেবায় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২৬ মিলিয়ন ডলার। অর্থমন্ত্রী বলেছেন, সরকার বেসরকারি খাত টিকিয়ে রাখতে কাজ করছে। সাতটি খাতে ইসরাইলি আমদানি প্রতিস্থাপন, ডিজিটাল ও সবুজ অর্থনীতি উন্নয়ন এবং ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার ৫০০ নতুন কোম্পানি নিবন্ধিত হচ্ছে।
আল-কুদস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সামির হাজবুন বলেছেন, গত পাঁচ বছরে ধারাবাহিক সঙ্কট অর্থনীতিকে দুর্বল করে দিয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারী এবং গাজায় যুদ্ধ পর্যটন খাতকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তার মতে, পর্যটনে সরাসরি ক্ষতি হয়েছে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি। হোটেল, দোকান, ভ্রমণ সংস্থা, গাইড ও ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, হোটেল খাতে প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে, কিন্তু কোনো আয় নেই। ফলে অনেক কর্মী চাকরি হারিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদ হাইথাম দারাঘমে বলেছেন, ফিলিস্তিনি ঋণ মাসে মাসে বাড়ছে। ব্যাংক, সরবরাহকারী, ঠিকাদার, টেলিযোগাযোগ ও স্বাস্থ্য খাতের কাছে ঋণ জমেছে। তার মতে, রাজস্ব আটকে রাখার কারণে অর্থনীতি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সরকার আর বেতন বা কার্যক্রমের খরচ মেটাতে পারছে না। সরকার এখন কেবল এটিএমের মতো কাজ করছে, বিনিয়োগ বা অর্থনৈতিক প্রণোদনা দেয়ার ক্ষমতা নেই। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেতন ও দায় পরিশোধে ব্যর্থতা সামগ্রিক অর্থনৈতিক পতন ডেকে আনতে পারে। যদিও ফ্রান্স ও সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। দারাঘমে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন। সবচেয়ে সম্ভাব্য হলো রাজস্ব আটকে রাখা ও সম্পদের সঙ্কটের কারণে ধীরে ধীরে পতন।
দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ হতে পারে যাতে সম্পূর্ণ পতন ঠেকানো যায়। তৃতীয়ত, শর্তসাপেক্ষ অগ্রগতি হতে পারে, যা ইউরোপীয় দেশগুলোর আর্থিক সংস্কার, দুর্নীতি দমন, পাঠ্যক্রম পরিবর্তন ও নির্বাচনের দাবির সাথে যুক্ত থাকবে। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, রাজস্ব আটকে রাখা বন্ধ না হলে, আন্তর্জাতিক সহায়তা পুনরায় না এলে এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি না বদলালে ফিলিস্তিনি অর্থনীতি দীর্ঘস্থায়ী সঙ্কট থেকে সরাসরি পতনের দিকে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি অর্থনীতি কত দিন টিকে থাকতে পারবে এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন সময়মতো আসবে কি না।
চিকিৎসকদের স্নাতক সমাবর্তন
গাজার ধ্বংসপ্রাপ্ত আল-শিফা হাসপাতালের ধ্বংসস্তূপের মধ্যে ১৬৮ জন ফিলিস্তিনি চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসা সনদ অর্জন করেছেন। গত বৃহস্পতিবার গাজা সিটির আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্সের ভাঙা ভবনের সামনে এই স্নাতক সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। দুই বছরের ইসরাইলি যুদ্ধের মধ্যে তারা নিজেদেরকে ‘হিউম্যানিটি কোহর্ট’ নামে পরিচিত করেছেন বলে জানিয়েছে মিডল ইস্ট আই।
চিকিৎসকরা গাজার হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন কাজের পাশাপাশি দুর্ভিক্ষ, বাস্তুচ্যুতি ও গণহত্যার মধ্যে পড়াশোনা ও পরীক্ষা সম্পন্ন করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আহত হয়েছেন, কেউ বন্দী হয়েছেন, আবার কারো পরিবারের সদস্য নিহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা ইউসুফ আবু আল-রেইশ বলেন, এই স্নাতক সমাবর্তন হলো ‘বোমাবর্ষণ, ধ্বংসস্তূপ ও রক্তের নদীর মধ্যে কষ্টের গর্ভ থেকে জন্ম নেয়া একটি অর্জন।’
আল-শিফার মেডিক্যাল পরিচালক ডা: মোহাম্মদ আবু সালমিয়া বলেন, ইসরাইল স্বাস্থ্যসেবা ধ্বংস করে ফিলিস্তিনের মানবসম্পদ ধ্বংস করতে চেয়েছিল, কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়েছে। স্নাতক ডা: আহমেদ বাসিল বলেন, ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন সময়ে ডিগ্রি অর্জন প্রমাণ করে যে ফিলিস্তিনিরা জীবনকে ভালোবাসে এবং বিজ্ঞানচর্চায় অঙ্গীকারবদ্ধ। অনুষ্ঠানে খালি চেয়ার রাখা হয়েছিল, যেখানে যুদ্ধে নিহত স্বাস্থ্যকর্মীদের ছবি প্রদর্শিত হয়।
কৃষিজমিতে ৭ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি
ইসরাইলি সেনা ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় পশ্চিমতীরে এক সপ্তাহে আট হাজারের বেশি জলপাই গাছ ধ্বংস হয়েছে। এতে প্রায় সাত মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার জানিয়েছে ফিলিস্তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়। খবর আনাদোলুর।
সাপ্তাহিক প্রতিবেদনে মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা দ্রুত ও বিপজ্জনকভাবে বেড়ে চলেছে। এসব হামলা সরাসরি কৃষি খাত ও খাদ্যনিরাপত্তার উৎসকে লক্ষ্য করছে। মন্ত্রণালয়ের দাবি, ডিসেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে সংঘটিত এসব হামলা ফিলিস্তিনি ভূমি দখল এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করার একটি পরিকল্পিত নীতির অংশ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলাগুলো মূলত উত্তর ও মধ্য পশ্চিমতীরে হয়েছে। জেনিনের পশ্চিমে সিলাত আল-হারিথিয়া শহরে পাঁচ হাজার জলপাই গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে এবং রামাল্লাহর পূর্বে তুরমুস আয়া শহরে আরো তিন হাজার জলপাই গাছ ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া পূর্ব জেরুসালেমে ১৫৬টি জলপাই গাছ, তুলকারেমে ১০০টি ডুমুর গাছ, পূর্ব কালকিলিয়ায় ১৩টি জলপাই গাছ এবং সালফিত ও বেথলেহেমে ১৯টি জলপাই গাছ, যার মধ্যে ১০টি প্রাচীন গাছ ছিল, ধ্বংস করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে কৃষি অবকাঠামো ধ্বংসের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৩টি পানির কূপ ও কৃষিকক্ষ ভেঙে ফেলা, সেচ নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত করা ও পানির পাম্প চুরি, ৮২টি মৌচাক ধ্বংস এবং বিভিন্ন এলাকায় ভেড়ার পাল বিষ প্রয়োগে হত্যা। পশ্চিমতীরে ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বেড়েই চলেছে। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, ফসল তোলা ও রোপণের মৌসুমে এসব হামলা বাড়ানো হয় যাতে কৃষকরা জমি ছেড়ে চলে যায়। কলোনাইজেশন অ্যান্ড ওয়াল রেজিস্ট্যান্স কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর মাসে অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনি ও তাদের সম্পত্তির ওপর ৬২১টি হামলা চালিয়েছে।
গাড়ি হামলায় ২ জন নিহত
আল আরাবিয়ার খবর অনুসারে, উত্তর ইসরাইলে এক ফিলিস্তিনির ছুরিকাঘাত ও গাড়ি হামলায় দু’জন নিহত হয়েছেন বলে গতকাল শুক্রবার জানিয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ। ইসরাইলের জরুরি সেবা বিভাগ জানিয়েছে, প্রায় ৬৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তি গাড়ির নিচে চাপা পড়ে মারা গেছেন। ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম জানিয়েছে, প্রায় ২০ বছর বয়সী এক নারীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া আরো দু’জন সামান্য আহত হয়েছেন। ইসরাইলি পুলিশ জানিয়েছে, অভিযুক্ত হামলাকারী পশ্চিমতীরের একজন ফিলিস্তিনি বাসিন্দা।



