কমছে গমের উৎপাদন, বাড়ছে আমদানি নির্ভরশীলতা

যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতি বছর গম আসবে ৭ লাখ টন

শাহ আলম নূর
Printed Edition

বাংলাদেশে গমের উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমে আসছে। বিপরীতে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ গম আমদানি করতে হচ্ছে। গত ২০২৩-২৪ অর্থবছরে রেকর্ড ৬২ লাখ টন গম আমদানি করা হয়েছে, যা ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ। এ দিকে দেশীয় উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১১ লাখ টনে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গম চাষে কৃষকের আগ্রহ কমে যাওয়া, রোগবালাই ও নীতিগত উদাসীনতার কারণে গমের ক্ষেত্রে আমদানি নির্ভর হয়ে যাচ্ছে দেশ। এমন পরিস্থিতি ভবিষ্যতে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে গম আমদানি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

তথ্যে দেখা যায় দশ বছর আগে গম আমদানি ছিল গড়ে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টনের মধ্যে। বর্তমানে প্রতি বছর গম আমদানি করতে হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টন। এই বিপুল পরিমাণ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে গম চাষের জমি কমে যাওয়া, কৃষকদের ভুট্টার মতো বেশি লাভজনক ফসলে ঝুঁকে পড়া এবং গম চাষে সরকারের পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে বছরে গমের চাহিদা দাঁড়িয়েছে ৭০ থেকে ৭৫ লাখ টনের মধ্যে। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশীয় উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১১ লাখ টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে গম উৎপাদন ১ লাখ টন কমে ১০ লাখ টনে নেমে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি বছরে গম আবাদের জমি ২৫ হাজার হেক্টর কমেছে। এমন পরিস্থিতি গমের সরবরাহ ঘাটতি আরো বাড়িয়ে তুলেছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায় ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে গম উৎপাদন ছিল প্রায় ১৩ দশমিক ৪ লাখ টন। এবং আমদানি ছিল প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টনের মধ্যে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১৪ ও ২০১৫ সালে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ‘উইট ব্লাস্ট’ নামে একটি ছত্রাকঘটিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে, যা ওই অঞ্চলে গমের ফলন ৭০-৮০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস করে। সেই ধ্বংসাত্মক ঘটনার পর, বহু কৃষক স্থায়ীভাবে ভুট্টা চাষের দিকে ঝুঁকে পড়ে। বর্তমানে এসব অঞ্চলে গমের জায়গা ভুট্টা দখল করেছে বলে তারা মনে করছেন।

কৃষি অর্থনীতিবিদ গোলাম হাফিজ কেনেডি নয়া দিগন্তকে বলেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষও এখন সকালের নাশতায় অনেকেই রুটি, পরোটা, পাউরুটির মতো গমভিত্তিক খাদ্য গ্রহণ করছেন। গম মানুষের খাদ্যাভ্যাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তিনি আরো বলেন, দেশের কনফেকশনারি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রসার গমের চাহিদাকে বাড়িয়ে তুলেছে।

উৎপাদন হ্রাসের এই প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারি নীতিতে হস্তক্ষেপের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়কে এখনই গম চাষে প্রণোদনা দিতে হবে, না হলে আমদানির ওপর নির্ভরতা অর্থনীতিতে আরো চাপ সৃষ্টি করবে। বর্তমানে গম আমদানির বার্ষিক ব্যয় দাঁড়ায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন থেকে ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে। বৈশ্বিক দামের ওপর এ ব্যয় ওঠানামা করতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক ড. এ এইচ এম শামসুল ইসলাম নয়া দিগন্তকে বলেন, ভুট্টা বেশি লাভজনক ও বিভিন্ন সহায়তার আওতায় থাকায় কৃষকরা গম চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এমনকি কিছু এলাকায় ধানের পরিবর্তে ভুট্টা চাষের দিকে কৃষক ঝুঁকছে। তিনি বলেন, জলবায়ু সহনশীল গমের জাত উদ্ভাবন এবং কৃষকদের জন্য লাভজনক দামের নিশ্চয়তা দিলে দেশীয় উৎপাদন আবার উৎসাহ পাবে। তার মতে, দেশের চর ও হাওর এলাকায় প্রায় তিন লাখ হেক্টর পতিত জমি গম চাষে ব্যবহার করা হলে অতিরিক্ত ১০ লাখ টন গম উৎপাদন সম্ভব হবে।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহ-সভাপতি এস এম নাজের হোসেন নয়া দিগন্তকে বলেন, আমদানিকারক এবং তাদের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাই এখন মূলত গমের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে। গত ১৮ মাসে বৈশ্বিক বাজারে গমের দাম কমলেও দেশে তার প্রভাব পড়েনি। তিনি আরো বলেন, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় গমভিত্তিক পণ্যের দাম এক লাফে বেড়ে যায়। এর পর থেকে সেই উচ্চ দামে বিক্রি অব্যাহত আছে। এতে বাজার ব্যবস্থাপনা ও মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে তিনি জানান।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের খাদ্যনিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে শস্য বৈচিত্র্যকরণ এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোকে সরকারি নীতিতে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এক দিকে উৎপাদন হ্রাস, অন্য দিকে বাজার অস্থিরতা ও আমদানি নির্ভরতা। এই তিনটি চ্যালেঞ্জ একসাথে মোকাবেলা করতে না পারলে গম খাতে বড় ধরনের সঙ্কট সৃষ্টি হতে পারে। তারা বলছেন এখনই সময়, গম চাষে ন্যায্যমূল্য, গবেষণা, জাত উন্নয়ন ও কৃষি সহায়তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি টেকসই নীতি কাঠামো গড়ে তোলা।

এ দিকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দেশের সার্বিক খাদ্য নিরাপত্তা, পুষ্টিমান এবং খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ এবং আমেরিকার মধ্যে এই সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে আগামী পাঁচ বছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে সাত লাখ টন করে উচ্চমানের গম আমদানি করতে দেশটির সাথে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশে আমদানিকৃত গমের ৬৪ শতাংশ আসে রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে, যা চলমান যুদ্ধের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগে অনিয়মিতভাবে গম এলেও এবার নিয়মিত আমদানির পথে এগোচ্ছে বাংলাদেশ।