চলতি বছরের শেষের দিকে অথবা আগামী বছরের প্রথম দিকে শুরু হতে পারে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। আগামী এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে দেশের সব স্তরের স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে ইসি। আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে আইনি সংশোধনীর কার্যক্রম শেষ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল প্রার্থী তালিকাও ঘোষণা করেছে। জাতীয় নির্বাচনের পর অনুষ্ঠিতব্য নির্দলীয় এই নির্বাচন দেশব্যাপী রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে। আসন্ন ঈদুল আজহার ছুটিতে তৃণমূলে আরো ব্যাপকভিত্তিক গণসংযোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে সম্ভাব্য প্রার্থীদের। সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডসহ নানাভাবে ভোটারদের মন জয়ের চেষ্টা থাকবে সবার। তবে নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে কিনা এ নিয়ে বিরোধী দলগুলো তাদের সংশয় প্রকাশ করছে। তারা বলছে, বিএনপি সরকারের অধীনে একটি স্থগিত ও একটি উপনির্বাচনে যেভাবে দলীয় ও প্রশাসনিক শক্তির প্রয়োগ হয়েছে, তাতে স্থানীয় নির্বাচনেও পেশি শক্তির ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
নির্বাচন কমিশনার মো: আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, কমিশনের সামনে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো স্থানীয় সরকার নির্বাচন। তিনি বলছেন, এ নির্বাচন আয়োজনে ইসি প্রস্তুতি শুরু করেছে। আগামী এক বছরের মধ্যে ধাপে ধাপে সব নির্বাচন সম্পন্ন করা তাদের লক্ষ্য। এ জন্য প্রয়োজনীয় আইন, বিধি ও নীতিমালা সংশোধন, বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনিক প্রস্তুতি এবং মৌসুমী বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে।
এর আগে গত ৫ মে জেলা প্রশাসক সম্মেলনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ের সব নির্বাচন সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হবে।
সূত্র মতে, দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন, ৪৯০টির মতো উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টির মতো পৌরসভা ও ৬১টি জেলা পরিষদের নির্বাচন মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে। এগুলো এখনই নির্বাচন করার উপযোগী। এসব নির্বাচন আয়োজনে আইনগত কোনো জটিলতা নেই। এ ছাড়া সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে প্রায় ৬০০ ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করার যে ১৮০ দিন সময়সীমা রয়েছে, তা এপ্রিল মাসে শুরু হয়েছে। আগামী জুলাই মাসের মধ্যে আরো তিন হাজার ইউনিয়ন পরিষদের সময়সীমা শুরু হবে। এ অবস্থায় সরকারের সবুজ সঙ্কেত পেলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করতে পারবে ইসি। সরকারের তরফে এ বছরের শেষ দিকে স্থানীয় নির্বাচন শুরু করার কথা বলা হচ্ছে। তবে বিএনপি তাদের প্রস্তুতি শেষ করেই তফসিল ঘোষণার দিকে যাবে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী এবং এনসিপিসহ অন্য দলগুলো স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে। বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা ইতোমধ্যে এলাকায় এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তাদের পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানারে সয়লাব হাট-বাজার, গুরুত্বপূর্ণ সড়কের অলিগলি ও জনসমাগমস্থল। নিজেদের পরিচিতি তুলে ধরতে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন এসব প্রার্থী। ভোটারদের মনোযোগ টানতে ব্যক্তিগত যোগাযোগের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও জোর দিচ্ছেন তারা। আসন্ন ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে এ প্রচারণা আরো বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এবার দলটির নজর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে। এই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও সরকার থেকে বলা হচ্ছে শিগগিরই অনুষ্ঠিত হবে এই নির্বাচন। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে বিএনপির শীর্ষ পদে থাকা বেশ কয়েকজন জেলা নেতা জানান, জাতীয় নির্বাচনের পরপরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কাজ করছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ভালো ফলের আশাবাদী তারা। এজন্য দলীয় সংগঠনকে আরো সক্রিয় ও সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আগাম এই তৎপরতা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরো তীব্র করে তুলবে বলেও মনে করে বিএনপির তৃণমূল। একইসাথে এসব নির্বাচনে দলীয় প্রতীক না থাকার সুযোগে একাধিক প্রার্থী যাতে ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না থাকে, সে বিষয়েও নজর রাখা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপিকে।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আমাদের দলীয় প্রস্তুতি রয়েছে। নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা হওয়ার পর পূর্ণ শক্তি নিয়ে সবাই (নেতাকর্মী) ভোটের মাঠে নামবে। সরকার গঠনের পর গত তিন মাসে বিএনপি সরকারের যে অর্জনগুলো রয়েছে, তাতে জনমনে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে। সরকারের কার্যক্রমের সফলতায় জাতীয় নির্বাচনের সাফল্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পড়বে বলে মনে করেন বিএনপির এ সিনিয়র নেতা।
এদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। ইতোমধ্যে ১২টি সিটি করপোরেশনে দলটি তারণ্য নির্ভর প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। জামায়াতের নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় নির্বাচন জোটগতভাবে হওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ জোট মূলত জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নয়। দলটির নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীক ছাড়াই অনুষ্ঠিত হবে এবং এ ক্ষেত্রে দলগুলো নিজস্ব কৌশলে এগোবে। তবে কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া হচ্ছে না।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ গণমাধ্যমে বলেন, পৌরসভা, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দলীয় প্রার্থীদের চূড়ান্ত করা হচ্ছে। প্রার্থী বাছাইয়ে অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এসব যোগ্যতায় কিছু এলাকায় ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকদের সাথে সমঝোতা হতে পারে। তবে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে এককভাবে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।
সূত্র মতে, ২০০৩ সালের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অবিভক্ত ঢাকায় একটি এবং ২০১৫ সালে উত্তরে একটি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে জয় পেয়েছিল। ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে ৩৬ উপজেলায় চেয়ারম্যান, ১২৬ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২৬ উপজেলায় নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয় পেয়েছিল দলটি। প্রথম দিকের নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থীদের বিজয়ের হার ছিল সবচেয়ে বেশি। তৃতীয় ধাপ থেকে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ছিল মূলত অনেকটা দখলের নির্বাচন। এরপর জামায়াত আর কোনো স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি। দলটি নিবন্ধন হারালেও ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৭৯টিতে চেয়ারম্যান পদে জামায়ত সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন। ২০১৯ সালে তারা চারটি পৌরসভায় জয়ী হয়। তবে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবার বিএনপির চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে দলটি জয়ের আশা করছে।
জানা গেছে, দীর্ঘদিন কোণঠাসা থাকা জামায়াতে ইসলামী ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর প্রকাশ্যে বড় ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ পায়। জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি জোটের কাছাকাছি ভোট পায় দলটি। এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নিজেদের শক্তি প্রমাণের আরো বড় মাধ্যম হিসেবে দেখছে তারা। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানান, এবারের নির্বাচনে অংশ নেয়ার মূল লক্ষ্য তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠনের ভিত্তি আরো মজবুত করা এবং জনগণের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়ানো। দলটির বিশ^াস, জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে স্থাণীয় নির্বাচনে তাদের প্রার্থীরা অধিকাংশ স্থানেই জয়লাভ করবে।
অন্য দিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রথম ধাপে ইতোমধ্যে ঢাকার দুই সিটির মেয়র,উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও পৌরসভার মেয়র পদে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গত ১০ মে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে এই তালিকা প্রকাশ করা হয়। এনসিপির স্থানীয় সরকার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান সারজিস আলম জানান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে আসা ও রাজনীতির বাইরে থাকা যোগ্য ব্যক্তিদের যাচাই-বাছাই করে এই প্রার্থী তালিকা তৈরি করা হয়েছে। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, তারা নিজেদের শক্তি যাচাই ও সাংগঠনিক অবস্থান আরো দৃঢ় করতে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করছে। যদিও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভবিষ্যতে জোটগত সমঝোতার পথও খোলা রাখা হয়েছে।
এ দিকে ১১ দলীয় জোটের শরিক কয়েকটি দলের নেতারা মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচনেও জোটগত অংশগ্রহণ হলে তা আরো কার্যকর হতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, এককভাবে নির্বাচনে অংশ নিলে দলগুলোর নিজস্ব সক্ষমতা যাচাইয়ের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন সময়, আইন ও রাজনৈতিক সমন্বয়ের এক জটিল হিসাব-নিকাশে অবস্থান করছে। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর দ্বিতীয় বড় এই পরীক্ষায় বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশন কতটা সফলভাবে সমন্বয় করতে পারবে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে দেশব্যাপী সরকারি দলের কর্মকাণ্ডে অনেকেই স্থানীয় নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে তাদের শঙ্কা প্রকাশ করছেন।



