- ডিজিটাল লেনদেনের কারণে বাড়ছে প্রতারণা
- গ্রাহক আস্থা হারাচ্ছেন অনলাইন কেনাকাটায়
দেশে অনলাইন কেনাকাটার জনপ্রিয়তা বাড়ার সাথে সাথে বাড়ছে প্রতারণাও। বিশেষ করে অস্বাভাবিক ছাড়, ফ্ল্যাশ সেল, ৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট কিংবা স্টক ক্লিয়ারেন্স নামের অফার দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা হাতিয়ে নেয়ার ঘটনা এখন নিয়মিত ঘটছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভিত্তিক অনলাইন দোকান, অচেনা ওয়েবসাইট ও ফেসবুক লাইভ সেলের আড়ালে এখন সঙ্ঘবদ্ধ চক্র গ্রাহকদের টার্গেট করছে। ভুয়া ডিসকাউন্ট, অগ্রিম পেমেন্ট, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) জালিয়াতি এবং ভুয়া অনলাইন শপের মাধ্যমে ই-কমার্সে প্রতারণা দ্রুত বাড়ছে।
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করছেন, পণ্য অর্ডারের পর কুরিয়ার বা ডেলিভারি ম্যান পরিচয়ে ফোন করে ভেরিফিকেশন চার্জ, কাস্টমস ফি বা ডেলিভারি কনফার্মেশন বাবদ অতিরিক্ত টাকা নেয়া হচ্ছে। পরে দেখা যায়, মূল বিক্রেতার সাথে সেই ফোন নম্বরের কোনো সম্পর্ক নেই। এ ছাড়া অনলাইনে অর্ধেক দামে মোবাইল ফোন, ব্র্যান্ডের পোশাক ও গৃহস্থালি পণ্যের বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে বিকাশ ও নগদে অগ্রিম টাকা নেয়ার পর পণ্য পাঠানো হয় না। আবার কেউ কেউ বক্সের ভেতরে পণ্যের বদলে নি¤œমানের বা সম্পূর্ণ ভিন্ন জিনিস পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনা কল্যাণ সংস্থার নাম ব্যবহার করে ৫০ শতাংশ ছাড়ে পণ্য বিক্রির একাধিক বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে পড়ে। পরে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব বিজ্ঞাপন সম্পূর্ণ ভুয়া এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হচ্ছিল। প্রতারকরা ভুয়া ফেসবুক পেজ খুলে গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা আদায় করছিল। এই ঘটনায় এক ভুক্তভোগী জানান, তিনি প্রায় তিন হাজার টাকার পণ্য অর্ডার করেছিলেন। প্রথমে আংশিক টাকা নেয়ার পর ডেলিভারি নিশ্চিত করতে আরো টাকা পাঠাতে বলা হয়। পরে পুরো টাকা নেয়ার পর যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় প্রতারকরা। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় কম দামে ফ্রিজ, মোবাইল ফোন ও গৃহস্থালি পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে টাকা আত্মসাতের ঘটনাও সামনে আসে। অনেক ক্ষেত্রে পণ্য পাঠানোর বদলে গ্রাহকদের ব্লক করে দেয়া হয়।
সিআইডি সম্প্রতি এমন একটি চক্রের তথ্য প্রকাশ করে, যারা টেলিগ্রাম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সহজে অনলাইন আয় দেখিয়ে মানুষের কাছ থেকে টাকা নেয়। প্রথমে ছোট অঙ্কের লাভ দেখিয়ে পরে বড় বিনিয়োগ করানো হয়। পরে গ্রাহকদের সব যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয়। একটি ঘটনায় প্রায় ৪০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠে।
বাংলাদেশে অতীতের বড় ই-কমার্স কেলেঙ্কারির তদন্তে সিআইডি জানিয়েছে, আটটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান প্রায় ৭০৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল ই-অরেঞ্জ, ধামাকা ও আনন্দের বাজারের মতো আলোচিত নাম। গ্রাহকদের অস্বাভাবিক ছাড় ও অবিশ্বাস্য অফার দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছিল।
চলতি মে মাসে দেশে ই-কমার্স ও অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার বেশ কয়েকটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে আসে। বিশেষ করে অগ্রিম পেমেন্ট, ভুয়া ডিসকাউন্ট এবং ডেলিভারি প্রতারণা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। এসব চক্র সাধারণত ভুয়া রিভিউ ও নকল ফলোয়ার ব্যবহার করে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করে। সবচেয়ে বেশি অভিযোগ আসে পণ্য না পাওয়া, নি¤œমানের পণ্য পাওয়া টাকা নিয়ে যোগাযোগ বন্ধ, ডেলিভারিতে অতিরিক্ত চার্জ ও ভুয়া ডিসকাউন্ট ও ক্যাশব্যাক অফার।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঘটছে তিন ধরনের প্রতারণা- অ্যাডভান্স পেমেন্ট নিয়ে পণ্য না পাঠানো, অবাস্তব ডিসকাউন্ট দেখিয়ে টাকা আত্মসাৎ এবং ডেলিভারি জালিয়াতি। দেশের ডিজিটাল বাণিজ্য বাড়লেও প্রতারক চক্র প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে অপরাধের হাতিয়ার হিসেবে। বাংলাদেশে অনলাইন কেনাকাটার বড় একটি অংশ এখন ফেসবুকভিত্তিক। ফলে নিবন্ধনহীন অসংখ্য পেইজ ও ব্যক্তিগত আইডি ব্যবহার করে গড়ে উঠছে অস্থায়ী ব্যবসা। কয়েকদিন প্রচারণা চালিয়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জন করার পর হঠাৎ করেই পেইজ বা নম্বর বন্ধ করে উধাও হয়ে যাচ্ছে প্রতারকরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতারকরা এখন খুব দ্রুত মোবাইল নম্বর, ফেসবুক পেইজ ও ব্যাংকিং তথ্য পরিবর্তন করে ফেলছে। ফলে অভিযোগের পরও অনেক সময় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু চক্র ভুয়া রিভিউ ও ফেক ফলোয়ার ব্যবহার করে নিজেদের বিশ্বস্ত অনলাইন শপ হিসেবে উপস্থাপন করছে। অনেক গ্রাহক যাচাই না করেই লোভনীয় অফারে আকৃষ্ট হয়ে অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে দেন। প্রতারকরা সাধারণত সীমিত সময়ের অফার, স্টক শেষ হয়ে যাচ্ছে কিংবা আজই শেষ সুযোগ এমন চাপ তৈরি করে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) পরিচালিত সাইবার পুলিশ সেন্টারের তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সাইবার অপরাধের শিকার হয়ে ৮৮৬ জন ভুক্তভোগী সহায়তা চেয়েছেন। মার্চে এই সংখ্যা ছিল ৬৫০ এবং ফেব্রুয়ারিতে ছিল ৪৭৬। অর্থাৎ প্রতি মাসেই অভিযোগের সংখ্যা বাড়ছে। আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২১ সালে দেশে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগ ছিল প্রায় ৪২ হাজার ৯৪৭টি। পরে অভিযোগ কমলেও ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসেই ১০ হাজার ৮০৯টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে অনলাইন শপিং প্রতারণা ছিল সবচেয়ে বেশি।
বিভিন্ন গবেষণা ও বাজার বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালে দেশের ই-কমার্স বাজারের আকার প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তা ছাড়া দেশে ই-ক্যাব নিবন্ধিত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় দুই হাজার। ফেসবুকভিত্তিক ছোট-বড় অনলাইন পেইজ ও অনানুষ্ঠানিক বিক্রয় প্ল্যাটফর্ম রয়েছে ৫০ হাজারের বেশি। এতে করে মোবাইল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল পেমেন্ট বৃদ্ধির কারণে প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে।
প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ই-কমার্স খাতে এখনো শক্তিশালী মনিটরিং ও ভোক্তা সুরক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। নিবন্ধনহীন অনলাইন ব্যবসা সহজে পরিচালনা করা যায় বলেই প্রতারণার সুযোগ বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক অভিযোগ করলেও আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় প্রতারকরা পার পেয়ে যায়। মানুষের কম দামে বেশি পাওয়ার মানসিকতাকেই এখন সবচেয়ে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে প্রতারকরা। বাংলাদেশে বর্তমানে হাজার হাজার অনিবন্ধিত ফেসবুকভিত্তিক অনলাইন দোকান রয়েছে। অনেকেরই নেই ট্রেড লাইসেন্স, অফিস ঠিকানা কিংবা কোনো ধরনের গ্রাহকসেবা ব্যবস্থা। ফলে প্রতারণার শিকার হলেও ভুক্তভোগীরা সহজে আইনি সহায়তা পান না।
বিশ্লেষকদের মতে, ই-কমার্স খাতকে নিরাপদ করতে হলে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, পেমেন্ট গেটওয়ে এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতারণা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এই খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এখনই কার্যকর নজরদারি ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনীতি ও প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রতারণা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতির বিষয় নয়; এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বারবার প্রতারণার ঘটনা ঘটলে মানুষ অনলাইন কেনাকাটার ওপর আস্থা হারাবে, যা ই-কমার্স খাতের প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করবে। ডিজিটাল বাণিজ্যের সম্ভাবনা ধরে রাখতে হলে এখনই শক্তিশালী মনিটরিং, দ্রুত বিচার এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
পুলিশ সদর দফতর সম্প্রতি জানিয়েছে, অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং ও সাইবার অপরাধ বাড়তে থাকায় পৃথক বিশেষায়িত সাইবার ইউনিট গঠনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। বর্তমানে অধিকাংশ ই-কমার্স প্রতারণা ফেসবুকভিত্তিক পেইজ, ভুয়া ওয়েবসাইট ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সংঘটিত হচ্ছে। প্রতারকরা খুব দ্রুত মোবাইল নম্বর, বিকাশ বা নগদ অ্যাকাউন্ট ও পেইজ পরিবর্তন করে ফেলায় তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। র্যাবের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সঙ্ঘবদ্ধ প্রতারক চক্র প্রথমে কম দামে পণ্য বিক্রি করে মানুষের আস্থা অর্জন করে। পরে বড় অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিয়ে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। দেশের বিভিন্ন জেলায় একই কৌশলে প্রতারণার তথ্য পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।



