নিউইয়র্ক টাইমস ও রয়টার্স
যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিতে অনুমোদন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এটির আওতায় সৌদি আরব ভবিষ্যতে নিজস্ব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ (এনরিচ) করার সুযোগ পেতে পারে। ৩০ বছর মেয়াদি এই প্রস্তাবিত চুক্তিতে মার্কিন সংস্থাগুলো সরাসরি যুক্ত থাকবে। তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা এবং ইসরাইলের কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরব আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সদস্য। কিন্তু সূত্র মতে, এই চুক্তিতে আইএইএর ‘অতিরিক্ত প্রোটোকল’ অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না। ফলে সেখানে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের জোরালো তদারকি বা পরিদর্শনের সুযোগ সীমিত থাকবে।
চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্টের ১২৩ ধারা অনুযায়ী একটি ‘১২৩ এগ্রিমেন্ট’। এ ধরনের চুক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও অন্য দেশের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার আইনি কাঠামো নির্ধারণ করে। বর্তমানে ৫১টি সরকার ও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সাথে এ ধরনের ২৬টি চুক্তি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক আরো জোরদার করতে চায় ওয়াশিংটন। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক শিল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে। বিশেষ করে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউজ সৌদির জন্য পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। যৌথ অর্থনৈতিক সমীক্ষার পর সৌদি আরবকে নিজস্ব ভূখ-ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কিংবা প্লুটোনিয়াম পুনঃপ্রক্রিয়াজাত করার অনুমতি দেয়া হতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতার ভিত্তিও তৈরি করতে পারে। এ কারণেই মার্কিন কংগ্রেসের উভয় দলের কয়েকজন সদস্য এবং ইসরাইলি কর্মকর্তারা চুক্তিটির বিরোধিতা করছেন। তাদের আশঙ্কা, বেসামরিক কর্মসূচির আড়ালে সৌদি আরব ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে এগোতে পারে।
চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটমিক এনার্জি অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেসে পর্যালোচনার জন্য পাঠানো হবে। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভেটো অতিক্রম করার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এটি অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চুক্তির আওতায় সৌদি আরবের সাথে দু’টি গোপন পার্শ্বচুক্তিও করা হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, এসব নথিতে বাণিজ্যিক ও জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য রয়েছে। তবে কংগ্রেসের অনেক সদস্য পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ ছাড়া অনুমোদন দিতে অনাগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ২০০৯ সালের পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তিকে এত দিন পারমাণবিক বিস্তাররোধের ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ওই চুক্তিতে ইউএই নিজস্ব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার ত্যাগ করেছিল এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের কঠোর শর্ত মেনে নিয়েছিল। সৌদি আরবের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন সেই কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। চুক্তিটি এমন এক সময়ে হচ্ছে, যখন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তাহলে সৌদি আরবও একই পথে হাঁটবে।
বাইডেন প্রশাসনের সময় সৌদি আরবের সাথে পারমাণবিক সহযোগিতাকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বৃহত্তর কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সেই পরিকল্পনা কার্যত স্থগিত হয়ে যায়। ক্ষমতায় ফিরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক সহযোগিতাকে ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার শর্ত থেকে আলাদা করে এগিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন।



