দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় সম্ভাব্য জঙ্গি হামলার আশঙ্কাকে কেন্দ্র করে সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় জোরদার পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব বিমানবন্দরে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। একইসাথে কারাগারগুলোতেও সতর্কতা জোরদার করা হয়েছে, বিশেষ করে জঙ্গি সংশ্লিষ্ট বন্দীদের ঘিরে নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
কারা অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশের বিভিন্ন কারাগারে মোট ২৬০ জন জঙ্গি বন্দী রয়েছে। এদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য সব ডিভিশনের ডিআইজি প্রিজনদের কাছে জরুরি নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। এর আওতায় কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, ভিআইপি বন্দীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষ কারাগার এবং কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের অন্যান্য কারাগারে নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরো শক্তিশালী করা হয়েছে।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা এবং গোয়েন্দা সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। কারা কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আটক জঙ্গিদের প্রতিটি কার্যক্রম- চলাফেরা, যোগাযোগ, খাদ্যগ্রহণ- সবকিছু যেন সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের আওতায় থাকে। এজন্য কারারক্ষীদের আলাদাভাবে ব্রিফিং দেয়া হচ্ছে এবং দায়িত্ব পালনের আগে নির্দিষ্ট নির্দেশনা বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে সবচেয়ে বেশি জঙ্গি বন্দী রাখা হয়েছে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে। অন্য দিকে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে দু’জন উগ্রপন্থী, যাদের একজন নিষিদ্ধ সংগঠন হিজবুত তাহরীরের সদস্য। এ ছাড়া ময়মনসিংহ বিভাগের বিভিন্ন কারাগারে আরো পাঁচজন জঙ্গি বন্দী রয়েছে।
কারাগারগুলোতে আটক জঙ্গিদের মধ্যে বিভিন্ন নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো আনসারউল্লাহ বাংলা টিম, হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি, হিজবুত তাহরীর, আনসার আল ইসলাম, আল্লাহর দল, জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারকিয়া, কেএনএফ, কেএনএ ও আরসার সদস্যরা।
কারা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যেসব কারাগারে জঙ্গি বন্দী রয়েছে, সেসব প্রতিষ্ঠানে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। কারারক্ষীদের আলাদা করে ব্রিফিং দিয়ে জঙ্গিদের ওপর নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে তাদের যোগাযোগব্যবস্থা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা হচ্ছে।
কারা অধিদফতরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা সব সময়ই সতর্ক থাকি। তবে সাম্প্রতিক গোয়েন্দা তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনায় এখন আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। সব বন্দীর ওপর নজরদারি থাকলেও জঙ্গিদের ক্ষেত্রে তা আরো বাড়ানো হয়েছে। সিসিটিভি মনিটরিং, সশস্ত্র পাহারা ও ডিউটির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে।”
কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারের এক কর্মকর্তা জানান, সেখানে আটক জঙ্গিদের একটি নির্দিষ্ট সুরক্ষিত জোনে রাখা হয়েছে। তাদের প্রতিটি কার্যক্রম- খাবার গ্রহণ থেকে শুরু করে টেলিফোনে কথোপকথন- সবকিছু কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কারারক্ষীদের দায়িত্ব পালনের আগে এসব বিষয়ে বিস্তারিতভাবে ব্রিফ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে কারা বিশ্লেষক ও সাবেক ডিআইজি প্রিজন মেজর (অব:) সামছুল হায়দার সিদ্দিকী বলেন, কারাগার কর্তৃপক্ষ যে জঙ্গিদের ওপর বাড়তি নজরদারি করছে, তা ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, বিষয়টিকে হালকাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি উল্লেখ করেন, গত ৫ আগস্টের পর কারাগার ভেঙে বন্দী পালানো এবং অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটেছিল। সেই সুযোগে কিছু জঙ্গিও পালিয়ে যায়, যাদের অনেকেই এখনো গ্রেফতার হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার আশঙ্কা নিয়ে যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা উচিত।
তার মতে, জঙ্গিদের যোগাযোগব্যবস্থা- বিশেষ করে টেলিফোনে কার সাথে কথা বলছে- তা কঠোরভাবে নজরদারির আওতায় রাখা প্রয়োজন। একইসাথে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাতেও সতর্কতা জোরদার করতে হবে, যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা নিরাপত্তা ঝুঁকি সৃষ্টি না হয়।
তিনি আরো বলেন, আন্তর্জাতিক কোনো জঙ্গি সংগঠন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা করতে পারে। সেই আশঙ্কা থেকেই সরকার আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে, যা সময়োপযোগী এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
মেজর (অব:) সামছুল হায়দার সিদ্দিকী নয়া দিগন্তকে আরো বলেন, এই মুহূর্তে দেশে নির্বাচিত সরকার এবং সারা দেশে এখনো সেনাবাহিনী মোতায়েন আছে। তারপরও জঙ্গি হামলার ঘটনা যদি ঘটে তাহলে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা দুর্বল বলে প্রতীয়মান হবে। এতে সেনাবাহিনীর ভাবমর্যাদাও তো নষ্ট হবে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার পুলিশ সদর দফতর থেকে জারি করা এক সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত একটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং কারা কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।



