নাম ঠিকানা সবই আছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো অস্তিত্বই নেই কয়েকটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের। আবার কিছু বিশ^বিদ্যালয়ের সাময়িক অনুমোদন নেয়া হলেও বাংলাদেশ বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) শর্ত পূরণ না হওয়ায় সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রমও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১১টি বিশ^বিদ্যালয় আছে যেখানে ভিসি প্রোভিসি এমনকি ট্রেজারারের পদও খালি। ইউজিসির তালিকায় থাকার পরও চারটি বিশ^বিদ্যালয়ের কোনো অস্তিত্ব নেই বলেও জানা গেছে। সূত্রমতে কার্যক্রমে না থাকা এমন সব বিশ^বিদ্যালয়ের তালিকা করে সেগুলোর অনুমোদন বাতিল করার কথা ভাবছে ইউজিসি।
এ দিকে ইউজিসি থেকে ৫ এপ্রিল প্রকাশিত তালিকার ১১৬টি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ের ১১৩, ১১৪, ১১৫ এবং ১১৬ নং ক্রমিকের চারটি বিশ^বিদ্যালয়ের বিবরণে এগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই চারটি বিশ^বিদ্যালয়ের মধ্যে শুধু দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার ঠিকানা দেখানো হয়েছে ১৫ নং হোল্ডিংয়ের ছায়াবাড়ি ভবন, রোড নং ৩১, সেক্টর ৭ উত্তরা ঢাকা ১২৩০। বাকি তিনটি বিশ^বিদ্যালয় তথা ইবাইস ইউনিভার্সিটি, কুইন্স ইউনিভার্সিটি এবং আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির কোনো ঠিকানাই নেই বা তালিকায় উল্লেখ করা হয়নি। এই চারটি প্রতিষ্ঠানের কোনো অস্তিত্বও নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ইবাইস ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ নিয়ে বর্তমানে আদালতে একাধিক মামলা চলমান। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে বৈধ কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক, প্রশাসনিক, আর্থিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি, পরীক্ষা ও এর ফলাফল এবং প্রদত্ত একাডেমিক সনদের আইনগত কোনো বৈধতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়টির সাময়িক সনদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী তাদের কার্যক্রমের আইনগত আর কোনো ভিত্তি নেই। অপর দিকে দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লা সরকার কর্তৃক ০৬/১২/১৯৯৫ তারিখে অনুমোদন দেয়া হয়। সাময়িক সনদের শর্তাবলি প্রতিপালন এবং গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার ২২/১০/২০০৬ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়টি বন্ধ ঘোষণা করে। ওই বন্ধ আদেশের বিরুদ্ধে রিট পিটিশন নং-১৬৭১/২০১৪ এর প্রেক্ষিতে আদালত রায় প্রদান করে। বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা চলমান। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে চ্যান্সেলর তথা বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োজিত ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার নেই। এটির বৈধ কোনো কর্তৃপক্ষ নেই বর্তমানে। ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির একাডেমিক, প্রশাসনিক, আর্থিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি, পরীক্ষা ও এর ফলাফল এবং প্রদত্ত একাডেমিক সনদের আইনগত কোনো বৈধতা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়টির সাময়িক সনদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রমের আইনগত আর কোনো ভিত্তি নেই।
কুইন্স ইউনিভার্সিটিও এখন বন্ধ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০ অনুযায়ী শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ০৬-০৯-২০১৫ তারিখের পত্রের ভিত্তিতে এক বছরের জন্য সাময়িকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার শর্ত সাপেক্ষে অনুমতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে সক্ষম হয়নি তারা। ইউজিসির তালিকায় নাম থাকলেও আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটির অনুমোদিত কোনো ক্যাম্পাস ও ঠিকানা নেই। সূত্র জানায়, সাময়িক সনদের শর্তাবলি প্রতিপালন এবং গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় সরকার ২২/১০/২০০৬ তারিখে এস.আর.ও জারির মাধ্যমে আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি বন্ধ ঘোষণা করে। ওই বন্ধ আদেশের বিরুদ্ধে আদালত ২০/১১/২০১৩ তারিখে রায় প্রদান করে। বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়টির অনুমোদিত কোনো ক্যাম্পাস ও ঠিকানা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজ নিয়ে আদালতে একাধিক মামলা চলমান। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমানে বৈধ কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। বিষয়টি নিয়ে মামলা চলমান থাকায়, মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ভিসি প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার না থাকার কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ এর ১২(১) ধারা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রমের আইনগত আর কোনো ভিত্তি নেই।
শুধু এই চারটি বিশ^বিদ্যালয়ই নয়, ইউজিসি সূত্র জানায়, কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমোদন পেয়েছে, শিক্ষার্থী ভর্তি করছে, ডিগ্রিও দিচ্ছে কিন্তু নিজস্ব স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে পারেনি বছরের পর বছর। এমন বাস্তবতায় দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক পদক্ষেপে বিষয়টি আবারো আলোচনায় এসেছে। ইউজিসির তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের বাধ্যবাধকতা অমান্য করায় গত বছর ১৬ থেকে ১৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ১২ থেকে ২০ বছর ধরে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এখনো স্থায়ী ক্যাম্পাসে পুরোপুরি স্থানান্তর হয়নি।
এদিকে সাম্প্রতিক এক সতর্কবার্তায় ইউজিসি জানিয়েছে, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনবহির্ভূত ক্যাম্পাসে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভর্তি হওয়ার আগে ইউজিসির ওয়েবসাইটে তথ্য যাচাই করার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ইউজিসি স্পষ্টভাবে বলেছে, অবৈধ ক্যাম্পাস বা অনুমোদনবহির্ভূত কার্যক্রমে ভর্তি হলে তার দায় কমিশন নেবে না।
ইউসিজির পরিচালক ড. মো: সুলতান মাহ্মুদ ভুইয়া নয়া দিগন্তের এই প্রতিবেদককে জানান, আমরা দীর্ঘদিন ধরেই বেশ কিছু বিশ^বিদ্যালয়ের নানা অনিয়মের বিষয়ে সতর্ক করে আসছি। কিন্তু এর পরেও কোনো সমাধান হচ্ছে না। তিনি জানান, সর্বশেষ পদক্ষেপ হিসেবে ইউজিসি এখন গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের উদ্যোগ নেবে। শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের সতর্ক করতে এর কোনো বিকল্প নেই বলেও তিনি জানান। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রয়োজন নিজস্ব একাডেমিক ভবন, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, খেলার মাঠ এবং গবেষণা অবকাঠামো। ভাড়া করা ভবনে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব সুবিধা গড়ে তোলা কঠিন। ফলে শিক্ষার মান, গবেষণা কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উচ্চশিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ‘নাম আছে, ঠিকানা আছে, কিন্তু ক্যাম্পাস নেই’ এমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগের বিষয়। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তর নিশ্চিত করা এখন জরুরি।



