শত বছর আগের অস্ট্রেলিয়ার একটি ব্যর্থ সামরিক অভিযান বা 'ইমু যুদ্ধ' আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এক মস্ত বড় শিক্ষা হতে পারে। রয়টার্স জানিয়েছে, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব যে একটি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লড়াকু শত্রুর বিরুদ্ধে জয়ের নিশ্চয়তা দেয় না, ইরান সংকট তারই প্রমাণ।
রয়টার্স জানিয়েছে, চার দশক ধরে আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ থেকে শুরু করে খনিজ সম্পদের জোয়ার—সবকিছুই মাঠে থেকে কাভার করেছেন গ্লাসগোতে জন্ম নেওয়া ক্লাইড রাসেল। এএফপির হয়ে একসময় অ্যাঙ্গোলা ও মোজাম্বিকের রণক্ষেত্রে ছুটে চলা এই অভিজ্ঞ সাংবাদিক এখন রয়টার্সের এশিয়া কমোডিটি ও এনার্জি বিষয়ক প্রধান কলামিস্ট। তাসমানিয়া আর এশিয়ার মধ্যে সময় ভাগ করে নেওয়া রাসেলের তীক্ষ্ণ চোখ এবার আটকেছে এ অদ্ভুত সমান্তরালে।
১৯৩২ সালের শেষের দিকে পশ্চিম অস্ট্রেলিয়ায় প্রায় ২০ হাজার বিশাল আকৃতির ইমু পাখি গমের ক্ষেত ধ্বংস করতে শুরু করে। সাবেক সৈনিকদের অনুরোধে অস্ট্রেলীয় সরকার সেনা পাঠায়। রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান আর্টিলারির মেজর গ্লুইনিড পারভেস উইন-অ্যাব্রে মেরিডিথ দুটি লুইস মেশিনগান নিয়ে মাঠে নামেন। কিন্তু সেনারা গুলি চালানো মাত্রই পাখিরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম সপ্তাহে আড়াই হাজার রাউন্ড গুলি খরচ করে মোটে ৫০টি পাখি মারা যায়। এক মাস পর অস্ট্রেলীয় সরকারকে মাথা নিচু করে সেনা প্রত্যাহার করতে হয়। আধুনিক অস্ত্র কোনো কাজে আসেনি।
আজকের ইরান আর সেদিনের ইমু পাখির মধ্যে কৌশলগত মিলটা এখানেই। মার্কিন সামরিক বাহিনী সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বের সেরা। তারা ইরানের অবকাঠামোতে মারাত্মক আঘাত হানতে পারে। কিন্তু তেহরানকে পুরোপুরি পর্যুদস্ত করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তির দম্ভকে প্রায় কাচ কলা দেখিয়ে ইরান এখনো তার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বজায় রেখেছে। তারা মার্কিন ঘাঁটি এবং হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী জাহাজে যেকোনো সময় আঘাত হানতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালানোর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই হরমুজ প্রণালী দিয়েই যেত। জুনের মাঝামাঝি ৬০ দিনের এক যুদ্ধবিরতিতে আশার আলো দেখা গেলেও গত সপ্তাহে তা বানচাল হয়ে যায় এবং দুপক্ষ আবারো একে অপরকে আক্রমণ করতে শুরু করে।
ইরান ঠিক ইমু পাখিদের মতোই তার নিয়ন্ত্রণ কক্ষ ও সামরিক সরঞ্জাম চারদিকে ছড়িয়ে দিয়ে মার্কিন হামলা মোকাবিলা করছে। তেহরান খুব ভালো করেই জানে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ করে বিশ্ব অর্থনীতিকে পণবন্দী করার ক্ষমতা তাদের আছে। এই যুদ্ধে যতক্ষণ না অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি ট্রাম্পের সহ্য ক্ষমতার বাইরে চলে যায় ততক্ষণ শুধু টিকে থাকাই হবে ইরানের জয়, ।
অথচ ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনী তুলে নেওয়ার পর শুধু কাঁটাতারের বেড়া দিয়েই ইমুদের সামলানো গিয়েছিল। অর্থাৎ, সামরিক শক্তির চেয়ে 'নিয়ন্ত্রণ নীতি' বেশি কার্যকর ছিল। ট্রাম্পের এই যুদ্ধ কোনো লক্ষ্যই পূরণ করতে পারেনি। ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এখন আর নজরদারিতে নেই, বরং আরো এগিয়ে গেছে। ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতাও অক্ষুণ্ণ। হামলায় অনেক নেতা নিহত হলেও বর্তমান সরকার আরো কট্টর অবস্থান নিয়েছে, তারা কোনো আপস করতে রাজি নয়।
হরমুজ প্রণালী এখন কার্যত বন্ধ। ট্রাম্প ২০১৫ সালের যে পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, আজ এর চেয়ে ভালো কোনো চুক্তি করা আর তার পক্ষে সম্ভব নয়। সামরিক শক্তি যে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল এনে দিতে পারে না, ট্রাম্পের জন্য ইমু যুদ্ধ থেকে সেই শিক্ষা নেয়ার সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি।



