ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় দরকার শুদ্ধাচার

ব্যাংকব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল একটিমাত্র বিষয়ের ওপর ভর করে, সেটি হচ্ছে আস্থা বা বিশ্বাস। অর্থাৎ আদিযুগে, মানুষ নগদ অর্থকড়ি কিংবা সোনাদানা ঘরে জমিয়ে বা লুকিয়ে রাখার চেয়ে গির্জা বা মন্দিরের সিন্দুকে রাখা অধিকতর নিরাপদ মনে করত। কিন্তু আয় বা প্রতিদান ছাড়া এরকম অলাভজনকভাবে সম্পদ জমিয়ে না রেখে তার বিপরীতে বিশ্বাসের সঙ্গে লাভ বা সুদ আয় শ্রেয়তর বিবেচিত হয়েছিল বলেই ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের জন্ম।

ব্যাংকব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল একটিমাত্র বিষয়ের ওপর ভর করে, সেটি হচ্ছে আস্থা বা বিশ্বাস। অর্থাৎ আদিযুগে, মানুষ নগদ অর্থকড়ি কিংবা সোনাদানা ঘরে জমিয়ে বা লুকিয়ে রাখার চেয়ে গির্জা বা মন্দিরের সিন্দুকে রাখা অধিকতর নিরাপদ মনে করত। কিন্তু আয় বা প্রতিদান ছাড়া এরকম অলাভজনকভাবে সম্পদ জমিয়ে না রেখে তার বিপরীতে বিশ্বাসের সঙ্গে লাভ বা সুদ আয় শ্রেয়তর বিবেচিত হয়েছিল বলেই ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের জন্ম। ব্যাংকিং সেবার ক্রমবিবর্তন এবং বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সঙ্কট ও কেলেঙ্কারি উদঘাটনের পর ব্যাংকিং সেবা ও পেশায় নৈতিকতার প্রশ্নটি জোরালোভাবে সামনে উঠে এসেছে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে আর্থিক খাতে শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়নের বিষয়ে নানামুখী আলোচনা হচ্ছে। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল মৌলিক মানবাধিকার, সামাজিক সাম্য, সুবিচার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে সরকারের কাছে বিবেচিত হয়েছে। ব্যাংক দখল করে মানুষের জমানো টাকা হাতিয়ে নেয়া, ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আঁতাত করে কিংবা সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দিয়ে ব্যাংক থেকে টাকা বের করা, বাণিজ্যের ছদ্মবেশে অর্থপাচার, ঋণখেলাপিদের নানা সুবিধা দেয়া, টাকা ছাপিয়ে ব্যাংক টিকিয়ে রাখা, বৈদেশিক মুদ্রার মজুদে ধস-ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আর্থিক খাতে ছিল এই চিত্র। দায়িত্ব নেয়ার পর অন্তর্র্বর্তী সরকারকে সবার আগে এই পচন থামাতে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে, যথেচ্ছ অনিয়মের সুযোগ বন্ধ করতে হয়েছে। এর ইতিবাচক ফলও এসেছে; কিন্তু সঙ্কট পুরোপুরি কাটেনি।

রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানেই শুদ্ধাচার অনুশীলন অতি প্রয়োজনীয় বিষয়। এটি এড়িয়ে থাকার সুযোগ নেই। বিশেষ করে আর্থিক খাতে শুদ্ধাচার অনুশীলন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। আর্থিক খাত শৃঙ্খলাবদ্ধ। এখানে আর্থিক কর্মকাণ্ড নিয়ে সব বিষয়ে আবর্তিত হয় বিধায় বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, অসাধুতা, অনৈতিকতার চর্চা যেকোনো মূল্যে প্রতিরোধ প্রয়োজন। রাষ্ট্র ও সমাজে দুর্নীতি দমন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সুখী সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, সুশাসন এবং শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া সমৃদ্ধি আশা করা যায় না। শুদ্ধাচারের চর্চা না থাকলে বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম, দুর্নীতি বাসা বাঁধে। তখন সব উন্নয়নপ্রক্রিয়া হুমকির মধ্যে পড়ে যায়। ব্যাংকব্যবস্থা যদি দুর্বল হয়ে পড়ে তার মন্দ প্রভাব পড়তে থাকে গোটা অর্থনীতিতে।

দেশের সব ব্যাংককে এখন কঠিন সময়ের মোকাবেলা করে এগোতে হচ্ছে। অনাকাক্সিক্ষত কিছু বিপর্যয় ও প্রতিকূল পরিস্থিতি গোটা ব্যাংকব্যবস্থায় অস্বস্তি ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। গত দেড় দশকে বাংলাদেশে আর্থিক খাতে সঙ্ঘটিত বিভিন্ন কেলেঙ্কারি, অনিয়ম, অর্থ লোপাটের চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো সবাইকে হতবাক করেছে। যুবক, ডেসটিনি, হলমার্ক, কিংবা বিসমিল্লাহ গ্রুপ প্রভৃতি নাম উচ্চারিত হতেই জনমনে এক ধরনের ঘৃণা, অস্বস্তি, অভক্তিভাব জেগে ওঠে। ব্যাংক খাতের এসব অনিয়ম, দুর্নীতি, অর্থ লোপাটের ঘটনা এক ধরনের ভীতির সঞ্চার করেছে কর্মকর্তাদের মধ্যে। আজকাল সবাই যেন নিজের গা বাঁচাতেই বেশি ব্যস্ত। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বড় বড় ঋণগ্রহীতারা তা ফেরত দিতে চায় না, ব্যাংক কর্মকর্তারা প্রায় ক্ষেত্রে বড় বড় ঋণখেলাপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে পদে পদে হোঁচট খান, বাধার মুখে পড়েন। এসব কারণে এখন ব্যাংক খাতে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে বিরাজ করছে স্থবিরতা, অনাগ্রহ। আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর ভর করে যে ব্যাংকিং ব্যবসার বিস্তৃতি ঘটেছে পৃথিবীব্যাপী তা শুদ্ধাচার এবং নৈতিকতার অভাবে হুমকির মধ্যে পড়ে গেছে।

ভুয়া বন্ধকির মাধ্যমে অস্তিত্বহীন ও ঋণ পরিশোধে অযোগ্য, অক্ষম প্রতিষ্ঠানকে ভুয়া জমি, সরকারি খাসজমি মর্টগেজ রেখে ঋণ দেয়া, পর্যাপ্ত জামানত ছাড়া ঋণ বিতরণ, শ্রেণীকৃত দায় থাকার পরও ত্রুটিপূর্ণ সহায়ক জামানতের বিপরীতে এবং গ্রাহকের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ঋণ দেয়ার ঘটনা হরদম ঘটেছে। কিন্তু এসব অনিয়ম এবং হয়রানি বন্ধে নেয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। এভাবেই দিন দিন ব্যাংকিং খাতে অনিয়মের পাল্লা ক্রমেই ভারী হচ্ছে। রাজনীতি ও অর্থনীতিতে চলমান অস্থিরতার মধ্যে উদ্যোক্তারা বেশ কঠিন সময় পার করছেন। অনেক প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা কমেছে, ব্যবসা সম্প্রসারণ থমকে গেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বেড়ে চলা সুদের হার, অবকাঠামোর ঘাটতি, অনিশ্চয়তা এসবের মধ্যে নতুন বিনিয়োগের সম্ভাবনা কম। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমেছে, কমেছে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র খোলাও। আসছে না বিদেশী বিনিয়োগ। আর এর পরিণামে কমছে কর্মসংস্থান। নতুন বছরে কর্মসংস্থান পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা আছে। সরকার বদলের পর বন্ধ হয়েছে এমন কিছু কলকারখানা, যেগুলোর মালিকেরা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিংবা অতিমাত্রায় ঘনিষ্ঠ ছিলেন। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ না বাড়লে কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা না করতে পারলে অথবা বিদেশী বিনিয়োগ না আনতে পারলে তরুণদের জন্য চাকরি দূরের স্বপ্ন হয়েই থাকবে।

ব্যাংকিংও যে এক ধরনের ব্যবসা, এটা যেমন সত্যি, তেমনি ব্যাংক যে অন্যের আমানত নিয়ে ব্যবসা করে সেটিও অস্বীকার করার উপায় নেই। ঠিক এ কারণে অন্যান্য ব্যবসা-প্রয়াসের চেয়ে ব্যাংকের কাছ থেকে মানুষ অধিকতর নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতা প্রত্যাশা করে। ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে তথা ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় শুদ্ধতা থাকবে, স্বচ্ছতা থাকবে এটা যে কোনো গ্রাহক মনে মনে প্রত্যাশা করেন।

কিংয়ের সাথে নৈতিকতার কোনো বিরোধ নেই। বরং ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় শুদ্ধাচার আবশ্যিক ব্যাপার হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। যদি ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় অস্বচ্ছতা-অনিয়ম গ্রাস করে, তাহলে সেখানে শুদ্ধতা আশা করা যায় না। মূলত নৈতিকতা বিবর্জিত কাজের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকারদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমারেখা নির্ধারণ করা উচিত। প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যে কেবল উচ্চবিত্ত মুষ্টিমেয় কিছু গ্রাহকের মধ্যে ঋণসুবিধা সীমিত রাখা, সহায়ক জামানতবিহীন সাধারণ মানুষ এবং দরিদ্রদের জন্য ঋণ গ্রহণের সুযোগ না রাখা, মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যে মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ করে ব্যাংককে বিপদগ্রস্ত করা কিংবা দেশ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর কোনো উদ্যোগে ঋণসুবিধা দেয়াÑ এসবকেই ব্যাংকিং খাতের অনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। আবার ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত অনৈতিক কর্ম এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপের কাছে নতিস্বীকার করে নিজেরাই অনৈতিকতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া- এসবের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করা উচিত। ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুর্নীতি, নৈতিকতাহীনতা খুব স্বাভাবিকভাবে চলে আসে- এ রকম কথা বলতে চান অনেকেই। ব্যাংকিংয়ে নৈতিকতার বিষয়টিকে পরস্পরবিরোধী বলে যে ধারণা প্রচারিত হচ্ছে, তা দূর করার জন্য ব্যাংকগুলোকে আইনের শাসন বাড়ানোর লক্ষ্যে যে কোনো ধরনের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড পরিচালনার মানসিকতা ত্যাগ করতে হবে। কার্যক্রমের সব পর্যায়ের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে হবে। স্বল্প মেয়াদে মুনাফার লক্ষ্য অর্জনের জন্য যেকোনো ধরনের ঝুঁকি গ্রহণের চেষ্টা পরিহার করতে হবে। এ কথা মনে রাখতে হবে, ব্যাংক যেমন কোনো খয়রাতি বা দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়, তেমনি জনগণ তথা সাধারণ আমানতকারীদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতি লক্ষ্য রেখে দেশ, সমাজ ও অর্থনীতিতে অবদান রাখার জন্য নৈতিক ব্যবসা পরিচালনা করাই ব্যাংকের দায়িত্ব। যেখানে শুদ্ধাচারই হবে সব কর্মকাণ্ডের ভিত্তি, যেখানে স্বচ্ছতা থাকবে প্রতিটি স্তরেই। এসব কারণেই অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ব্যাংকের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ যথেষ্ট কঠোর ও নিবিড় হওয়া উচিত। গ্রাহক সেবায় দায়বদ্ধতা, স্বচ্ছতা, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা, নিরাপত্তা, গোপনীয়তা প্রভৃতি মৌলিক আদর্শ ও নৈতিকতার প্রতিষ্ঠা বা চর্চা নিশ্চিত করা হলে ব্যাংক তার কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে তেমন কোনো প্রতিকূলতার মুখোমুখি হবে না।

আমাদের উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা সমুন্নত রেখে ভবিষ্যৎ সমৃদ্ধ অবস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে হলে সামগ্রিক অর্থনীতির শক্ত অবস্থান সৃষ্টি একান্ত জরুরি। আর এজন্য ব্যাংক খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি অসদাচরণের মাত্রা দ্রুত সহনশীল পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে অর্থনীতির যেসব খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে, ব্যাংক তাদের মধ্যে অন্যতম। এ জন্য ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সংস্কারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় ব্যাংক খাত। ব্যাংক খাত সংস্কারে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংক খাত সংস্কারের লক্ষ্যে একটি পৃথক আইন তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার টানা ১৬ বছরের শাসন আমলে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। দেশে নিয়মনীতির বাইরে অনেক কিছুই হয়েছে। বিক্ষিপ্তভাবে সংস্কার না করে ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার করতে হবে। এ জন্য সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। দেশে স্বজনতোষী পুঁজিবাদের মাধ্যমে অভিজাত ব্যক্তিরা তাদের লক্ষ্য পূরণের জন্য ব্যাংকগুলোকে ব্যবহার করছে। ব্যাংক খাতকে ঠিক করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা লাগবে। অর্থনীতি বিষয়ে সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্য থাকা দরকার। এর মধ্যে রাজনীতি খোঁজা উচিত নয়।

অর্থনীতিতে নতুন সরকারের নানা চ্যালেঞ্জ আছে। অর্থনীতিতে স্বস্তি ফেরানোর বিষয়টি তার ওপর নির্ভর করবে। স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার টানা ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসন আমলের লুটপাটে বিপর্যস্ত অর্থনীতিতে স্বস্তি ও শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগ সফল হতেই হবে।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার, কলাম লেখক