ঈদযাত্রা শুভ হোক

ট্রেন, বাস-ট্রাক, লঞ্চ-স্টিমার যাতায়াতের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে নৌ ও সড়কপথে চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে একই সাথে ছোট যানবাহন ওভারটেক করার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যেন ফিটনেসবিহীন গাড়ি কিংবা লঞ্চ চলাচল করতে না পারে এবং হেলপার দিয়ে গাড়ি ও লঞ্চ চালানো না হয়, প্রশাসনকে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। আতঙ্ক নিয়ে নয়, বাড়ি ফেরা হোক স্বস্তির

ঈদের আগে শহর ছেড়ে গ্রামে রওনা দেয় কম করে হলেও এক থেকে দেড় কোটি মানুষ। তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে ঈদযাত্রা কতটা স্বস্তিদায়ক হবে। ত্রুটিপূর্ণ বা ফিটনেসহীন যানবাহন, চালকের অদক্ষতা, অনেক ক্ষেত্রে গাফিলতি, ট্রাফিক আইনের প্রতি উদাসীনতা, সড়ক-মহাসড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও বাঁক, রোড সাইন বা সিগন্যালের ঘাটতি, মহাসড়কগুলোতে মোটরসাইকেল ও অটোরিকশার মতো ছোট যানের আধিক্য- ইত্যাদি নানা কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঝরে যায় মানুষের জীবন। পঙ্গুত্ব বরণ করে, ধ্বংস হয় সম্পদ।

আমাদের দেশের সড়ক দুর্ঘটনার চিত্র কতটা ভয়াবহ, তার প্রমাণ পাওয়া যায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে- পবিত্র ঈদুল ফিতরে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ৩৭৭ দুর্ঘটনায় ৩৯৪ জন নিহত ও এক হাজার ২৮৮ জন আহত হয়। এর মধ্যে শুধু সড়ক-মহাসড়কে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে এক হাজার ৪৬ জন। ঈদযাত্রা শুরুর দিন ১৪ মার্চ থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় ২৮ মার্চ পর্যন্ত বিগত ১৫ দিনে ৩৪৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৫১ জন নিহত এক হাজার ৪৬ জন আহত হয়েছে। সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার তথ্য মতে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছর পাঁচ সহস্রাধিক মানুষ মারা যায়। দুর্ঘটনায় আহত হয় প্রায় ১০ হাজারের মতো মানুষ। অর্থাৎ- সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের দেশে যে পরিমাণ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে, সে পরিমাণ মানুষ অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো যুদ্ধের মাঠেও নিহত হয় না।

আমাদের সড়ক-মহাসড়কের দুর্ঘটনাপ্রবণতার মধ্যেই এই ঈদুল আজহার সময়ে ঝড়বৃষ্টি ও বজ্রপাতের আশঙ্কা, সড়কে বৃষ্টির পানি জমে থাকা, অর্থবছরের শেষ সময়ের কারণে সড়কে উন্নয়ন কাজের প্রভাব, যানজট, মহাসড়কের পাশে কোরবানির হাট বসানো, জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে বাড়তি ভাড়া আদায়ের কৌশল- ইত্যাদি নানা কারণে ঘরমুখো যাত্রীদের ভোগান্তির শঙ্কা থাকে।

গাবতলী ও কল্যাণপুর থেকে দূরপাল্লার যেসব বাস ছেড়ে যায় এর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই যাত্রীদের চাপ বাড়লে কৃত্রিম টিকিট সঙ্কট দেখিয়ে ইচ্ছামতো ভাড়া বাড়িয়ে দেয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের অনেক স্থানে এখনো উন্নয়ন কাজ চলমান। ফলে এসব সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভয়াবহ যানজটের আশঙ্কা আছে। যদিও ঘরমুখী মানুষের যাত্রা নিরাপদ করার আশ্বাস দিয়েছে সরকার। ঘোষণা করা হয়েছে সাত দিনের ছুটি।

এত কিছুর পরও ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো যাত্রীদের ভোগান্তি কতটা লাঘব হবে, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। কারণ আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ঈদ উপলক্ষে যাত্রীদের চাপ বাড়ায় অনেক ক্ষেত্রেই পরিবহন সঙ্কট, সময় মতো সায়েদাবাদ ও গাবতলী ইন্টার-ডিস্ট্রিক্ট বাসটার্মিনাল, মহাখালী এবং ফুলবাড়িয়া বাসটার্মিনাল থেকে বাস ছেড়ে না যাওয়া, লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী নেয়ার প্রবণতা, ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় ইত্যাদি নানা কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। ঈদে সাধারণত শহর থেকে গ্রামে যাওয়ার সময় অনেক পরিবার নারী ও শিশুকে সাথে নিয়ে ভ্রমণ করে। ফলে নির্ধারিত সময়ে বাস এবং ট্রেন গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা না দিলে প্রচণ্ড গরমের মধ্যে যাত্রীদের কষ্টের সীমা থাকে না। আর যদি কোনো কারণে দীর্ঘ সময় ধরে রাস্তায় জ্যামে আটকা পড়তে হয়, তবে তো ভোগান্তির শেষ নেই।

তা ছাড়া ঈদ সামনে রেখে রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা বাড়ে। ঈদের আগে বিভিন্ন মালবাহী ট্রাকের পাশাপাশি কোরবানির পশুবাহী ট্রাক, দূরপাল্লার বাসগুলো দ্রুত নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাত্রী পৌঁছে দিয়ে পুনরায় বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে নতুন করে যাত্রী বোঝাই করার তাড়ায় থাকে। একই সময় ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার বাড়ে। অপর দিকে সুযোগ কাজে লাগিয়ে একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী পরিত্যক্ত লক্কড়ঝক্কড় ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি সড়কে নামিয়ে দেয়। এতে রাস্তায় গাড়ি বিকল হয়ে অনেকসময় যানজট সৃষ্টি করে।

ঈদযাত্রা নিরাপদ করতে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সাথে যাত্রীসহ পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। ট্রেন, বাস-ট্রাক, লঞ্চ-স্টিমার যাতায়াতের সময় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে নৌ ও সড়কপথে চলাচলকারী যানবাহনগুলোকে একই সাথে ছোট যানবাহন ওভারটেক করার ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই যেন ফিটনেসবিহীন গাড়ি কিংবা লঞ্চ চলাচল করতে না পারে এবং হেলপার দিয়ে গাড়ি ও লঞ্চ চালানো না হয়, প্রশাসনকে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। আতঙ্ক নিয়ে নয়, বাড়ি ফেরা হোক স্বস্তির।

লেখক : আইনজীবী