তিনি ফেরাউনের ঢঙে হুমকি দেন। বলেন, ইরান আমেরিকার সাথে সমঝোতা না করলে, ইরানকে ধ্বংস করে দেবেন। ইরানি নেতারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো হুমকিকেই আমলে নিতে প্রস্তুত নন। ইরানিরা না মরতে ভয় পায়, না হারতে ভয় পায়। ইরানের অবস্থান হচ্ছে, আগে হরমুজ প্রণালীর অবরোধ তুলে নাও, এরপর তোমাদের সাথে আলোচনা করব। আর যদি অবরোধ তুলে না নাও, তাহলে আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত আছি।
পাকিস্তান বেশ চেষ্টা করেছে, ইরান ও আমেরিকার মধ্য থেকে কোনো একটি পক্ষ যেন নিজেদের অবস্থানে নমনীয়তা দেখায় এবং উভয় পক্ষ আলোচনার দ্বিতীয় দফায় মুখোমুখি বসে। কিন্তু ইরান নৌ অবরোধ তুলে না নেয়া ব্যতীত মার্কিনিদের সাথে আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানায় এবং মার্কিন প্রতিনিধিদলের পাকিস্তান আগমন পিছিয়ে যায়। আমেরিকানরা অবাক হচ্ছে, ইরান কেন একটি সুপারপাওয়ারের সাথে সঙ্ঘাতে জড়ানোর জন্য প্রস্তুত হয়ে বসে আছে। একজন মার্কিন সাংবাদিক এক ইরানি সাংবাদিককে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমাদের আসল সমস্যা কী? ইরানি সাংবাদিক হেসে উত্তর দিলেন- আমাদের সমস্যা ইকবাল। এ উত্তরটা মার্কিন সাংবাদিকের মাথার ওপর দিয়ে গেল। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এই ইকবালটা কে? ইরানি সাংবাদিক বললেন, ইকবাল পাকিস্তানের জাতীয় কবি। মার্কিন সাংবাদিক অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ইকবাল কি তোমাদের মার্কিন প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনা করতে নিষেধ করেছেন? তোমরা যখন দুই সপ্তাহ আগে ইসলামাবাদে আমেরিকার সাথে আলোচনা করেছ, তখন ইকবাল কোথায় ছিলেন?
ইরানি সাংবাদিক উত্তর দেয়ার পরিবর্তে মার্কিন সাংবাদিককে এড়িয়ে গিয়ে মোবাইলে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মার্কিন সাংবাদিক ইকবাল নামের জাতীয় কবির ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া শুরু করে দিলেন। তাকে বলা হলো, এ কবি পাকিস্তানে আল্লামা ইকবাল এবং ইরানে ইকবাল লাহোরি নামে বিখ্যাত। কিছুক্ষণ পর ইকবালের পিছু ধাওয়াকারী ওই মার্কিন সাংবাদিক আমার কাছ পর্যন্ত পৌঁছে গেলেন। আমি তাকে বললাম, গুগলে যান। ড. মুহাম্মদ ইকবাল টাইপ করুন। বিস্তারিত সব তথ্য পাওয়া যাবেন। তিনি ল্যাপটপ খুলে দেখালেন, তিনি গুগলে ইকবাল সম্পর্কে বেশ সার্চ করেছেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারছেন না, ইকবাল তো ১৯৩৮ সালে ইন্তেকাল করেছেন, অথচ ইরানিরা ২০২৬ সালে ইকবালের কারণে আমেরিকার সাথে লড়াই করতে প্রস্তুত কেন?
এ কথা শুনে আমি মার্কিন সাংবাদিককে বললাম, আপাতত তো মার্কিন প্রতিনিধিদল পাকিস্তান আসছে না, যখন আসবে, তখন আপনাকে ইকবাল ও ইরানের সম্পর্ক বুঝিয়ে দেবো। তিনি প্রত্যুত্তরে বললেন, এখন মার্কিন প্রতিনিধিদলের আসা-যাওয়ার ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ নেই। তিনি ইরান ও ইকবালের সম্পর্ক নিয়ে স্টোরি লিখবেন। তিনি জোর দিয়ে বললেন, আপনি আমাকে ইকবাল ও ইরানের সম্পর্ক বুঝিয়ে দেবেন। আমি এক মুহূর্ত ভাবলাম, এই মার্কিনির সাথে সময় অপচয়ে কোনো লাভ নেই। এরপর মনে পড়ল, আমি তো পাকিস্তানি। আর আমার রাষ্ট্র তো আমেরিকা ও ইরানের মাঝে মধ্যস্থতাকারী হয়েছে। এ মধ্যস্থতার মানসম্মান রক্ষার্থে ওই মার্কিন সাংবাদিককে আমার কিছু গোপন কথা বলে দেয়া উচিত। কেননা, এখন তার কাছে লেখার কিছুই নেই। আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। বেশ বিনয়ের সাথে মার্কিন সাংবাদিককে বললাম, আমার হাতে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় আছে। ইকবাল ও ইরানের সম্পর্ককে পাঁচ মিনিটে যতটুকু বুঝতে পারুন বুঝে নিন। তিনি তৎক্ষণাৎ নোটবুক বের করে বললেন, জি বলুন। আমি তাকে বললাম, কয়েক দিন আগে লাহোরে আল্লামা ইকবালের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে একটি বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
ওই সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন লাহোরস্থ ইরানের কনসাল জেনারেল মেহরান মোয়াহেদ ফার। তাকে যখন বক্তব্য দেয়ার জন্য আহ্বান করা হলো, তখন আল-হামরা হলে শত শত অংশগ্রহণকারী তাকে স্বাগত জানাতে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং কয়েক মিনিট ধরে হাততালি দিতে থাকলেন। মেহরান মোয়াহেদ ফার বললেন, ইকবাল ইরানিদের যে মনোবল ও সাহস জুুগিয়েছেন, তার দ্বারাই আমরা আমেরিকাকে পরাজিত করেছি। মার্কিন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করলেন, ইরানি রাষ্ট্রদূতকে এ সমাবেশে কে ডেকেছেন? আমি বললাম, জুলফিকার চিমা ডেকেছেন। তিনি বললেন, তিনি কে? আমি বললাম, একজন অবসরপ্রাপ্ত আইজি, কলামিস্ট ও লেখক এবং একজন বড় মাপের ইকবালভক্ত। তিনি নোটবুকে দ্রুতগতিতে লিখতে লিখতে জিজ্ঞাসা করছিলেন, এ সমাবেশে আর কে কে ছিলেন? আমি বললাম, অসংখ্য ব্যক্তি ছিলেন। কিননেয়ার্ড কলেজের প্রিন্সিপাল ড. ইরাম আঞ্জুম, ড. উজমা যারিন, ব্রিগেডিয়ার ওয়াহিদুজ্জামান ও তানভির আব্বাস তাবিশ সেখানে বক্তব্য রাখেন।
আর সভাপতিত্ব করেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ড. মুহাম্মদ উমর চৌধুরি। কেননা, এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাথেও আল্লামা ইকবালের সম্পর্ক ছিল। মার্কিন সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, এদের সবাইকে তো শিক্ষক সমাজ মনে হচ্ছে। তাহলে তারা একজন ইরানি রাষ্ট্রদূতকে কেন সেখানে ডাকলেন? আমি আমার বিরক্তি নিয়ন্ত্রণ করে বললাম, ডিয়ার ফ্রেন্ড, আল্লøামা ইকবাল সম্পর্কে তোমার তো কিছুই জানা নেই। জে ডি ভ্যান্স ও ট্রাম্পেরও জানা থাকার কথা নয়। কিন্তু ইরানের শহীদ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ি কয়েক বছর আগে আল্লামা ইকবালের ওপর একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইকবালের কবিতা ইরানের বিপ্লবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তুমিই বলো, যদি আমরা ইকবাল দিবসের অনুষ্ঠানে কোনো মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে আমন্ত্রণ জানাই, তাহলে ওই বেচারা কী বক্তৃতা দেবেন? মার্কিন সাংবাদিক লা-জওয়াব হয়ে গেলেন। আমি ঘড়ি দেখলাম এবং তাকে বললাম, পাঁচ মিনিট হয়ে গেছে। তিনি হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞাসা করলেন, ইকবালের ব্যাপারে আমি আর কাকে প্রশ্ন করব? আমি তাকে মুশাহিদ হোসাইনের নাম বললাম। তিনি মুশাহিদ হোসাইনকে চেনেন।
তিনি বললেন, ইকবালের সাথে তার সম্পর্ক কী? আমি বললাম, মুশাহিদ হোসাইনও ইকবাল দিবসে ইসলামাবাদে একটি অনুষ্ঠানে জোরালো বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের জয় মানে ইকবালের চিন্তারই জয়। ওই অনুষ্ঠানের আয়োজনও করেছিলেন একজন সাবেক আমলা তারেক পিরজাদা। ওই অনুষ্ঠানে তাজিকিস্তানের রাষ্ট্রদূত শরিফ যাদোভ ইউদোভ ও আফরাসিয়াব খট্টক বক্তৃতা করেছেন। মার্কিন সাংবাদিক মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললেন, যদি ইকবাল ইরানি ও পাকিস্তানিদের যৌথ হিরো হয়ে থাকেন, তাহলে পাকিস্তান নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কিভাবে ভূমিকা পালন করবে? আমি ঝামেলা এড়ানোর জন্য ইংরেজিতে তাকে বললাম, ইকবাল সাধারণ পাকিস্তানিদের হিরো, সেই অভিজাত শ্রেণীর হিরো নয়, যারা মরতে খুব ভয় পায়। এখন ট্রাম্পকে এটি কে বোঝাবে যে, ইকবাল ফারসিতে বলেছেন, মাসেওয়া আল্লাহ রা মুসলমান বান্দে নিস্ত/পিশে ফেরাউনে সারাশ আফগান্দে নিস্ত, মুসলমান আল্লাহ ছাড়া আর কারো বান্দা নয়/তারা কোনো ফেরাউনের সামনে মাথা নত করে না। ইকবাল ‘বালে জিবরিলে’ এ কথাও বলেছেন, শাহাদাত হ্যায় মাতলুবো মাকসুদে মুমিন/না মালে গণিমত না কিশওয়ারে কুশায়ী-শাহাদত মুমিনের অভীষ্ট লক্ষ্য/না লক্ষ্য গণিমতের মাল, না দেশ জয়।
ট্রাম্পকে ফেরাউনের মতো কথা বলা ছাড়তে হবে এবং হুমকি দেয়াও বন্ধ করতে হবে। ইরানিরা হোক বা পাকিস্তানিরা হোক, ফেরাউনের ভঙ্গিমায় কথা বলা ব্যক্তিদের আনুগত্য সাচ্চা মুসলমানের জন্য বেশ কঠিন। এখন তো ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের আধ্যাত্মিক নেতা পোপ লিও পর্যন্তও ইরানিদের অবস্থানের সমর্থন শুরু করেছেন। হতে পারে তিনিও ইকবাল দ্বারা প্রভাবিত। কিন্তু ইরানিদের আসল সমস্যা হলো তারা ইকবালের চিন্তাধারায় প্রভাবিত এবং ইকবালের চিন্তাধারা হলো ফেরাউন ও ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের নাম। ট্রাম্পের এ কথা বুঝে আসবে না- ‘হুসাইন হত্যা মূলত ইয়াজিদের মৃত্যু।’ ইয়াজিদ জিতেও সর্বদা হেরে যায়।
পাকিস্তানের জাতীয় পত্রিকা দৈনিক জং ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ হতে উর্দু থেকে ভাষান্তর
ইমতিয়াজ বিন মাহতাব
হামিদ মীর : পাকিস্তানের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট



