ট্রান্সজেন্ডার সংস্কৃতি বনাম সামাজিক মূল্যবোধ

সুতরাং এ বিষয়ে প্রয়োজন দায়িত্বশীল আলোচনা এবং সুস্থ সামাজিক সংলাপ। রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, ধর্মীয় চিন্তাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের উচিত বিষয়টি নিয়ে গবেষণাভিত্তিক মতামত প্রদান করা। একই সাথে তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিবার, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের গুরুত্ব তুলে ধরা জরুরি। তাহলেই আমরা একটি সুস্থ, সুন্দর, কল্যাণমুখী স্থিতিশীল ও মূল্যবোধসমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে সর্বস্তরের শিক্ষক, ছাত্র, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন পেশার এক হাজার ২০০ বিশিষ্ট নাগরিক ‘ট্রান্সজেন্ডারদের পুরস্কৃত করার অপচেষ্টা বন্ধ করুন’ শিরোনামে বিবৃতি দেন। ৮ মার্চ এই বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। মূল্যবোধ আন্দোলনের মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার মুহাম্মাদ সাদাতের পাঠানো এ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা দেশের সচেতন নাগরিকরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছি যুব উন্নয়ন অধিদফতরের ঘোষিত জাতীয় যুব পুরস্কার-২০২৬ প্রদানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে জাতীয় যুব পুরস্কার নীতিমালা (সংশোধিত)-২০২৬ অনুসরণ করে নির্ধারিত আবেদন ফরমে মোট ২০টি পুরস্কারের মধ্যে দু’টি (১০ শতাংশ) পুরস্কার ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। সফল আত্মকর্মী ক্যাটাগরির ১৪টি পুরস্কারের মধ্যে একটি এবং যুব সংগঠক ক্যাটাগরির ছয়টি পুরস্কারের মধ্যে একটি ট্রান্সজেন্ডারদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের সরকারি নীতিমালায় স্বীকৃত জেন্ডার মাত্র তিনটি- নারী, পুরুষ ও হিজড়া। আসলে ‘ট্রান্সজেন্ডার’ নামে কোনো জেন্ডার এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি। সেই বাস্তবতায় প্রশ্ন জাগে, সরকারি স্বীকৃতির বাইরে থাকা একটি ধারণাকে কীভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হলো এবং সেই নীতিমালার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রদান করার উদ্যোগ নেয়া হলো?’

বিষয়টি সত্যিকার অর্থে উদ্বেগজনক। আমাদের দেশে সরকারের ভেতরে বাইরে এক শ্রেণীর লোক ‘ট্রান্সজেন্ডার’ সংস্কৃতি প্রমোট করার চেষ্টা চালাচ্ছেন, উপর্যুক্ত বিবৃতি তার প্রমাণ। উদ্বেগের বিষয় হলো ট্রান্সজেন্ডারের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল কিছু সাংস্কৃতিক ধারা প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধের সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করছে। বাংলাদেশের মতো ধর্মপ্রধান সমাজে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রের উচিত এমন নীতিমালা প্রণয়ন করা, যাতে কোনো পক্ষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্য পক্ষের বিশ্বাসে অপ্রয়োজনীয় আঘাত না করা হয়। বিশ্বায়নের যুগে পৃথিবীর একপ্রান্তের চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতি খুব দ্রুত অন্যপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। বর্তমান যুগে গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বৈশ্বিক সংস্কৃতির আদান-প্রদানের ফলে ট্রান্সজেন্ডার সংস্কৃতির বিস্তার আরো সহজ হয়েছে। অশ্লীল বিনোদন, দায়িত্বহীন জীবনযাপন, মাদকাসক্তি কিংবা অনৈতিক আচরণ যখন আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপিত হয়, তখন তা তরুণদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠার ঝুঁকি সৃষ্টি করে। ফলে ধীরে ধীরে সমাজের মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। অনেক সময় কোনো কোনো নতুন প্রবণতা সমাজের প্রচলিত নৈতিকতা, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক বাস্তবতার সাথে সঙ্ঘাত তৈরি করে। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী আলোচিত এমন একটি বিষয় হলো ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতির বিস্তার।

ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়
ট্রান্সজেন্ডার বলতে এমন ব্যক্তিকে বোঝায়, যার নিজের লিঙ্গ-পরিচয়ের অনুভূতি (Gender identity) তার জন্মের সময় নির্ধারিত জৈবিক লিঙ্গের (Biological sex) সাথে মেলে না। সহজভাবে বুঝলে : কেউ জন্মের সময় শারীরিকভাবে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত হলো কিন্তু সে নিজের ভেতরে নিজেকে নারী হিসেবে অনুভব করে, তাহলে সে ট্রান্সজেন্ডার হতে পারে অথবা এর উল্টোটাও হতে পারে। জেন্ডার আইডেন্টিটি কী? এটি হলো একজন মানুষ নিজেকে ভেতরে ভেতরে কী হিসেবে অনুভব করে- পুরুষ, নারী বা অন্য কোনো পরিচয়। জৈবিক লিঙ্গ কী? জন্মের সময় শরীরের গঠন, হরমোন, ক্রোমোজোম ইত্যাদির ভিত্তিতে যে লিঙ্গ নির্ধারণ করা হয়। ট্রান্সজেন্ডার হলো এমন মানুষ, যারা ‘জন্মগত লিঙ্গ’-এর সাথে নিজেদের ‘অন্তরের লিঙ্গ’-পরিচয়ের অমিল অনুভব করে।

ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে বিশ্বাস করা হয় যে, মানুষকে স্রষ্টা একটি নির্দিষ্ট লিঙ্গে সৃষ্টি করেছেন এবং সেই পরিচয়ই তার জন্য নির্ধারিত। লিঙ্গ পরিবর্তন বা বিপরীত লিঙ্গের অনুকরণ নিষিদ্ধ। মানুষের দায়িত্ব হলো স্রষ্টার নির্ধারিত অবস্থা মেনে নেয়া। লিঙ্গ পরিবর্তন করা মানে আল্লাহর সৃষ্টি পরিকল্পনা অস্বীকার ও বিদ্রোহের শামিল। এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে বিপজ্জনক। এই দৃষ্টিকোণ থেকে ট্রান্সজেন্ডার হওয়াকে ‘রুচি বিকৃতি’ বা সামাজিক ও নৈতিক মানদণ্ডের বিপরীত হিসেবে বিবেচনা করা যায় ।

ট্রান্সজেন্ডার মূলত অপসংস্কৃতি যা সমাজের প্রচলিত নৈতিকতা, শালীনতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ ও ইতিবাচক সামাজিক রীতিনীতির পরিপন্থী এবং ব্যক্তি ও সমাজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অপসংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য হলো নৈতিকতা ও শালীনতার অবক্ষয় ঘটায়, পরিবার ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল করে, ধর্মীয় ও ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের সাথে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে, অশ্লীলতা, ভোগবাদ বা অসামাজিক আচরণকে উৎসাহিত করে, তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত বা বিপথগামী করে, অশ্লীল বিনোদন বা কনটেন্টের প্রসার ঘটায়, মাদকাসক্তি বা অনৈতিক জীবনাচরণকে জনপ্রিয় করে তোলে এবং এমন সামাজিক ট্রেন্ড, যা দায়িত্ববোধ ও শৃঙ্খলা নষ্ট করে। এক কথায় যে জীবনাচার বা সংস্কৃতি সমাজের কল্যাণ, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে- তাই অপসংস্কৃতি।

ট্রান্সজেন্ডার শব্দটি এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট ধারণা মূলত ২০ শ’ শতাব্দীর শেষ ভাগ ও ২১ শ’ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বব্যাপী আলোচনায় আসে। বাংলাদেশেও ২০০০ সালের পর থেকে, বিশেষ করে ২০১০-এর দশকে- এই বিষয়টি মিডিয়া, এনজিও কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক আলোচনার মাধ্যমে পরিচিতি পেতে শুরু করে।

পশ্চিমা বিশ্বে গত কয়েক দশকে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়কে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন গড়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশে আইনগতভাবে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়কে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ অধিকারও দেয়া হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, ক্রীড়াঙ্গন এমনকি শিশুদের পাঠ্যক্রমেও এ বিষয়ে নানা উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি পশ্চিমা সমাজের ভেতরেও এ নিয়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

অনেক সমাজবিজ্ঞানী ও সংস্কৃতি বিশ্লেষক মনে করেন, লিঙ্গ পরিচয়কে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অনুভূতির ওপর নির্ভরশীল করে দেখার প্রবণতা সমাজের প্রচলিত পারিবারিক কাঠামো ও সামাজিক নৈতিকতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোরদের মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিষয় অত্যন্ত সংবেদনশীল। অনেক অভিভাবক ও শিক্ষাবিদ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, অল্প বয়সে লিঙ্গ পরিচয় নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনার ফলে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।

বিশ্বের কিছু দেশে ইতোমধ্যে এ নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি বিতর্কও তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কীভাবে লিঙ্গ পরিচয়ের বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে, শিশুদের জন্য কোন ধরনের নির্দেশিকা প্রযোজ্য হবে, এসব প্রশ্নে বিভিন্ন মতামত সামনে এসেছে। কেউ কেউ এটিকে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন হিসেবে দেখছেন, আবার অন্যরা মনে করছেন সমাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তি ও পারিবারিক মূল্যবোধ রক্ষার প্রশ্নও এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের মতো ধর্মীয় ও পারিবারিক মূল্যবোধভিত্তিক সমাজে এ ধরনের বিষয় আরো সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো পরিবারকেন্দ্রিক এবং এখানে ধর্মীয় বিশ্বাস ও নৈতিক মূল্যবোধ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ফলে বিদেশী কোনো সাংস্কৃতিক ধারণা গ্রহণ করার আগে তার সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন।

ট্রান্সজেন্ডার এবং হিজড়া এক বিষয় নয়
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝা জরুরি- ট্রান্সজেন্ডার এবং হিজড়া এক নয়। অনেক সময় সাধারণ মানুষের মধ্যে এই দুই ধারণা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা যায়। আমাদের উপমহাদেশে হিজড়া একটি ঐতিহাসিক ও সামাজিক বাস্তবতা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তারা সমাজের একটি বিশেষ জনগোষ্ঠী হিসেবে বিদ্যমান। জন্মগত বা শারীরিক জটিলতার কারণে তারা প্রচলিত নারী-পুরুষ লিঙ্গ পরিচয়ের মধ্যে পড়ে না। ফলে তাদের জীবন শুরু থেকেই নানা সামাজিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়। বাস্তবতা হলো, হিজড়া জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক অবহেলা, দারিদ্র্য এবং বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। সমাজের মূলধারায় প্রবেশের সুযোগ না থাকায় অনেক সময় তারা বাধ্য হয়ে এমন পেশায় জড়িয়ে পড়ে, যা সম্মানজনক নয়। হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতি ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ যেমন জরুরি, তেমনই তাদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো এবং পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে তারা সমাজের মূলধারায় সম্মানজনকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে। মানবিক সমাজ গঠনের জন্য এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

অন্য দিকে ট্রান্সজেন্ডার পরিচয়ের বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে একটি নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক হিসেবে সামনে এসেছে। পশ্চিমা বিশ্বে এই পরিচয় ঘিরে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা অনেক সময় অন্যান্য সমাজেও প্রভাব ফেলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক প্রবাহের কারণে তরুণ প্রজন্মের ওপর এর প্রভাব দ্রুত বিস্তার লাভ করছে।

কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আচরণ, কিংবা নতুন কোনো সংস্কৃতির অনুসরণ যদি একটি সমাজের লালিত ঐতিহ্য, ধর্মীয় অনুভূতি ও মূল্যবোধকে আঘাত করে, তখন বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে মোকাবেলা করা প্রয়োজন। শিক্ষা ও সচেতনতা গড়ে তোলা গুরুত্বপূর্ণ। সমাজের নিজস্ব মূল্যবোধ, ইতিহাস ও সংস্কৃতির ইতিবাচক দিকগুলো যদি শিক্ষার মাধ্যমে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সেগুলো ধারণ করবে। জোর করে চাপিয়ে দেয়ার প্রয়োজন হবে না। সমাজে শৃঙ্খলা ও মূল্যবোধ রক্ষার ক্ষেত্রে আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তি। যখন কোনো আচরণ বা প্রবণতা সমাজের নৈতিকতা, শালীনতা ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তখন তা নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের আইনি ভূমিকা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। ট্রান্সজেন্ডার সংস্কৃতির বিস্তার রোধেও প্রচলিত আইনের যথাযথ প্রয়োগ একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন কনটেন্ট অপসংস্কৃতি ছড়ানোর একটি বড় মাধ্যম। তাই সাইবার আইন ও নীতিমালার মাধ্যমে ক্ষতিকর, অশ্লীল বা বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে আইনের অপব্যবহার না হয়।

প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

ট্রান্সজেন্ডার সংস্কৃতির প্রভাব কোনো আকস্মিক ঝড় নয়, এটি এক নীরব স্রোত, যা ধীরে ধীরে সমাজের ভেতরে প্রবেশ করে মূল্যবোধ, চিন্তাধারা ও আচরণকে প্রভাবিত করে। তাই এ প্রভাব মোকাবেলায় প্রয়োজন সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও সমন্বিত উদ্যোগ।

প্রথমত, শিক্ষা ও সচেতনতার প্রসার অপরিহার্য। একটি জাতির সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ টিকে থাকে তার মানুষের চিন্তায় ও চেতনায়। তাই এমন শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা কেবল তথ্য নয়, নৈতিকতা, ইতিহাস ও নিজস্ব ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জাগ্রত করে। সচেতন নাগরিকই পারে সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে।

দ্বিতীয়ত, পরিবারকে হতে হবে মূল্যবোধ গঠনের প্রধান ভিত্তি। শিশুর প্রথম শিক্ষালয় পরিবার- এখানেই সে নৈতিকতা, শালীনতা ও দায়িত্ববোধের বীজ রোপণ করে। যদি পরিবার সুদৃঢ় হয়, তবে বাইরের নেতিবাচক প্রভাব সহজে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।

তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান যুগে মিডিয়া মানুষের চিন্তা ও রুচি গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। তাই তাদের উচিত এমন বিষয়বস্তু প্রচার করা, যা সমাজকে ইতিবাচক পথে উদ্বুদ্ধ করে এবং নৈতিক অবক্ষয় রোধে সহায়ক হয়।

চতুর্থত, রাষ্ট্রের ভূমিকাও অনস্বীকার্য। সময়োপযোগী ও ভারসাম্যপূর্ণ আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সম্ভব। আইন ও নীতির মাধ্যমে কল্যাণকর সংস্কৃতিকে উৎসাহিত এবং ক্ষতিকর প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

পঞ্চমত, ওলামা-মাশায়েখ ও ধর্মীয় চিন্তাবিদদের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তাদের জ্ঞানগর্ভ ওয়াজ-নসিহত ও দিকনির্দেশনা মানুষের অন্তরে নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার চেতনা জাগ্রত করতে পারে, যা অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

সুতরাং এ বিষয়ে প্রয়োজন দায়িত্বশীল আলোচনা এবং সুস্থ সামাজিক সংলাপ। রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী, ধর্মীয় চিন্তাবিদ এবং নীতিনির্ধারকদের উচিত বিষয়টি নিয়ে গবেষণাভিত্তিক মতামত প্রদান করা। একই সাথে তরুণ প্রজন্মের কাছে পরিবার, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের গুরুত্ব তুলে ধরা জরুরি। তাহলেই আমরা একটি সুস্থ, সুন্দর, কল্যাণমুখী স্থিতিশীল ও মূল্যবোধসমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে সক্ষম হবো।

লেখক : অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

[email protected]