আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের ভূমিকা

ব্রিটিশ শাসনামলে পূর্ব-বাংলা ও আসামের একমাত্র সমুদ্রবন্দর ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে মংলা ও বাংলাদেশ আমলে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মিত হয়। তবে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের বেশির ভাগ এখনো চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের অদূরে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে যে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণাধীন; এটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে বন্দরটিতে বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) ভিড়তে পারবে, যা পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনবে— এমনটিই আশা করা হচ্ছে। এতদসত্ত্বেও বলা যায়, বে-টার্মিনালের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে আদি বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের যে গৌরবময় ঐতিহ্য আছে তা অক্ষুণ্ন থাকবে

বিশ্ব বাণিজ্যের ৮০-৯৫ শতাংশ পণ্য সমুদ্রপথে পরিবহন করা হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সমুদ্রবন্দর বিশ্ব অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। তাই এক দেশ হতে অন্য দেশে পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে সমুদ্রগামী জাহাজের ভূমিকা অপরিসীম।

চট্টগ্রাম বাংলাদেশের প্রধান সামুদ্রিক বন্দর। এটি দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রাম শহরের কর্ণফুলী নদীর মোহনায় অবস্থিত। ব্রিটিশ শাসনের প্রথম দিকে কর্ণফুলী নদীতে একটি কাঠের জেটি নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ১৮৬০ সালে দু’টি অস্থায়ী জেটি নির্মাণ করা হয়। এরপর ১৮৮৮ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে দু’টি মুরিং জেটি নির্মাণ করা হয়। ১৮৯০ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার ও আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে যৌথভাবে চারটি স্থায়ী জেটি নির্মাণ করে। ১৮৭৭ সালে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনার গঠন পরবর্তী ১৮৮৮ সালে এটি কার্যকর হয়। ১৯১০ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে রেল সংযোগ স্থাপিত হয়। ১৯২৬ সালে চট্টগ্রাম বন্দরকে মেজর পোর্ট ঘোষণা করা হয়। পাকিস্তানের শাসনামলে ১৯৬০ সালে চট্টগ্রাম পোর্ট কমিশনারকে চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্টে রূপান্তর করা হয়। অতঃপর বাংলাদেশ আমলে ১৯৭৬ সালে চট্টগ্রাম পোর্ট ট্রাস্টকে চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটিতে পরিণত করা হয়। এটি বর্তমানে একটি স্বায়ত্তশাসিত সরকারি সংস্থা। একজন চেয়ারম্যান ও চারজন সদস্য নিয়ে বর্তমানে চট্টগ্রাম পোর্ট অথরিটির প্রশাসনিক কাজ পরিচালিত হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চট্টগ্রাম বন্দর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্পায়নে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় দেশগুলোর পণ্য বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেয়ার প্রধান কেন্দ্র। চট্টগ্রাম বন্দর শুল্ক, বন্দর ফি ও কাস্টমস শুল্কের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আহরণ করে দেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখছে। বন্দরটির আশপাশে ভারী শিল্প-কারখানা ও কয়েকটি ইপিজেড গড়ে ওঠায় বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ ঘটেছে। বন্দর থেকে পণ্য খালাস-পরবর্তী তা গুদামজাত ও যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেন সচল রাখার ক্ষেত্রে সহায়তা করে।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দেশের সামুদ্রিক ক্ষমতা ও অবস্থানকে শক্তিশালী করে চলেছে। তা ছাড়া বন্দরটি শুধু পণ্য পরিবহন করে ক্ষান্ত থাকছে না; বরং কনটেইনার পরিবহন, ড্রাই ডকিং সুবিধা এবং জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

নবম শতাব্দী থেকে আরব ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রামে আসা-যাওয়া শুরু করেন। আরব ব্যবসায়ীরা এ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। চীনা অভিযাত্রী হিউয়েন সাঙ এবং মা হোয়ানের ভ্রমণ কাহিনীতে বন্দর বিষয় উল্লেখ রয়েছে। মরক্কোর অভিযাত্রী ইবনে বতুতা এবং ভেনিসীয় পর্যটক নিকোলো ডি কন্টি ১৪ শতকে চট্টগ্রাম বন্দর পরিদর্শন করেছিলেন। সে সময় চট্টগ্রাম বন্দরের সাথে আফ্রিকা, ইউরোপ, চীন এবং দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ার সাথে সমুদ্রপথে জাহাজ যোগাযোগ ছিল। চট্টগ্রাম বন্দর ঘিরে ১৬ এবং ১৭ শতকে পর্তুগিজদের বসতি গড়ে উঠে। পর্তুগিজ বিতাড়নের পর চট্টগ্রাম মোগল সাম্র্রাজ্যের অধীনে আসে। তখন এর নাম হয় ইসলামাবাদ। সে সময় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এখানকার নির্মিত জাহাজ মোগল এবং তুরস্কের অটোমান নৌবাহিনীকে সরবরাহ করা হতো। বাংলায় ব্রিটিশ আধিপত্য উত্থানের পর ১৭৭২ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে বন্দরটির ব্যবস্থাপনা হস্তান্তর করা হয়।

সেসময় ব্রিটিশ বার্মার আকিয়াব ও রেঙ্গুনের সাথে এবং কলকাতা, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের সাথে চট্টগ্রাম বন্দরের যোগাযোগ ছিল। বঙ্গভঙ্গ ও বঙ্গভঙ্গ রদের সময় চট্টগ্রাম বন্দর পূর্ব-বাংলা এবং আসামের প্রধান সমুদ্রবন্দর ছিল। এটি আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের শেষ স্টেশন ছিল। বন্দরটির মাধ্যমে ২০ শতকের শেষে ব্রিটিশ-ভারত ও ব্রিটিশ-বার্মার মধ্যে বাণিজ্যের দ্রুত প্রসার ঘটে। সেসময় বঙ্গোপসাগর বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত শিপিং হাব হয়ে উঠেছিল। আসাম এবং বার্মার পেট্রোলিয়াম শিল্পের জন্য চট্টগ্রাম বন্দর গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটির মাধ্যমে পাট ও চালের ব্যবসায় অব্যাহত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মিত্র বাহিনী বার্মা অভিযানে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার করেছিল।

চট্টগ্রাম বন্দরে একটি ড্রাই ডক আছে, যেখানে সাড়ে ১৬ হাজার ডিডব্লিউটি ওজনের জাহাজ মেরামতের ব্যবস্থা আছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন কয়েকটি জাহাজ মেরামতের ডকও আছে। জেটিসংলগ্ন এলাকায় অগ্নি নিবারণে একটি আধুনিক যন্ত্রপাতি-সজ্জিত পূর্ণাঙ্গ অগ্নিনির্বাপক ইউনিট এবং সামুদ্রিক অগ্নিকাণ্ড নিবারণে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রপাতি-সজ্জিত দু’টি জাহাজ নিয়োজিত আছে। চট্টগ্রাম বন্দরের পেছনের ভূমির সাথে সড়ক, রেলপথ ও নৌপথ দ্বারা সংযুক্ত।

বাংলাদেশের আমদানি-রফতানি পণ্যের ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে থাকে। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রধান রফতানি পণ্য হচ্ছে পাট ও পাটজাত দ্রব্য, কাঁচা ও পাকা চামড়া, চা, ন্যাপথালিন, চিটাগুড়, হিমায়িত মাছ, চিংড়ি, তৈরী পোশাক ও সার। প্রধান আমদানি পণ্য হচ্ছে— খাদ্যশস্য, সিমেন্ট, পেট্রোলিয়াম, চিনি, লবণ, সার, সাধারণ মালামাল, লৌহ, দ্রব্যসামগ্রী ও রাসায়নিক দ্রব্য। চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি-রফতানি প্রভৃতির বার্ষিক হার ১২ দশমিক ১৪ শতাংশ।

চট্টগ্রাম বন্দরে স্থায়ী পাকা জেটি আছে ১৫টি, পন্টুন জেটি দু’টি, বেসরকারি জেটি তিনটি, লাইটার জেটি আটটি, মুরিং বার্থ ১১টি এবং মাল্টিপারপাস বার্থ (কনটেইনার জেটি) ১২টি। কনটেইনার জেটিসহ মোট ১৭টি জেটির মধ্যে ১৩টি জেটিতে শোরক্রেন ও রেলওয়ে লাইনের সংযোগ আছে। ১১টি জেটিতে শেড রয়েছে। ১৬টি ট্রানজিট শেডের মোট আয়তন ১২ লাখ ৩০ হাজার ৮৫০ বর্গফুট। ওয়্যারহাউজের মোট আয়তন ছয় লাখ ৭৭ হাজার ৫৪০ বর্গফুট। মাল ধারণ ক্ষমতা ২৭ হাজার ৬০০ টন।

চট্টগ্রামের হালিশহর উপকূলে জোয়ার-ভাটার নির্ভরতামুক্ত এলাকায় বে-টার্মিনাল নির্মাণের কাজ চলমান। এটি মেরিন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়নাধীন একটি মেগা প্রকল্প। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামের সক্ষমতা কয়েকগুণ বাড়বে। বে-টার্মিনালের দৈর্ঘ্য ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার, প্রস্থ ৬০০ মিটার। চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে বর্তমানে সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৫০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানো যায়। বে-টার্মিনালটি নির্মিত হলে ১০-১২ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভেড়ানো যাবে। চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে প্রতি বছর যে সর্বোচ্চ সংখ্যক টিইইউএস কনটেইনার বোঝাই জাহাজ ভেড়ানো যায়, বে-টার্মিনালটি নির্মিত হলে বছরে এর দ্বিগুণ টিইইউএস কনটেনার বোঝাই জাহাজ ভেড়ানো যাবে। বে-টার্মিনালটির নির্মাণকাজ ২০৩১ সাল নাগাদ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বে-টার্মিনালটি আধুনিক গভীর সমুদ্রবন্দরের আদলে গড়ে তোলার পরিকল্পনা আছে। এটি নির্মিত হলে দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান লজিস্টিক হাব হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমর্যাদা উজ্জ্বল করবে।

১৮২২ সালে কর্ণফুলী নদীর মোহনার ৪০ মাইল দূরে কুতুবদিয়া দ্বীপে ‘কুতুবদিয়া বাতিঘর’ নির্মাণ করা হয়। পাথরের ভিত্তির উপর নির্মিত এ বাতিঘরের উচ্চতা ১২১ ফুট। পাকিস্তান আমলে লৌহ নির্মিত টাওয়ারের উপর আধুনিক বাতিঘর নির্মাণ করে প্রাচীন বাতিঘরটি বাতিল করা হয়। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পরিত্যক্ত বাতিঘর ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায়। বর্তমানে যেসব বাতিঘর সচল আছে তা হলো সেন্টমার্টিন বাতিঘর, কক্সবাজার বাতিঘর, নরম্যাঞ্চ পয়েন্ট বাতিঘর ও পতেঙ্গা বাতিঘর। এসব বাতিঘর থেকে প্রতি ১৫ সেকেন্ডে বিচ্ছুরিত আলো যথাক্রমে ১৭ মাইল, ২১ দশমিক ৫ মাইল, ১১ মাইল এবং ১৫ মাইল পর্যন্ত দেখা যায়।

চট্টগ্রাম বন্দরের সমুদ্রসীমা হলো পতেঙ্গা সঙ্কেত কেন্দ্র থেকে সমুদ্রাভিমুখে সাড়ে পাঁচ মাইল। কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে উজানে হালদা নদীর মোহনা পর্যন্ত ২৩ মাইল এলাকা চট্টগ্রাম বন্দরের অধিকারভুক্ত। কর্ণফুলী নদীর মোহনা থেকে উজানে ১০ মাইল পর থেকে জেটি আরম্ভ।

ব্রিটিশ শাসনামলে পূর্ব-বাংলা ও আসামের একমাত্র সমুদ্রবন্দর ছিল চট্টগ্রাম বন্দর। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমলে মংলা ও বাংলাদেশ আমলে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মিত হয়। তবে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের বেশির ভাগ এখনো চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের অদূরে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ীতে যে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণাধীন; এটির নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে বন্দরটিতে বড় জাহাজ (মাদার ভেসেল) ভিড়তে পারবে, যা পণ্য পরিবহন খরচ ও সময় ৬০ শতাংশ কমিয়ে আনবে— এমনটিই আশা করা হচ্ছে। এতদসত্ত্বেও বলা যায়, বে-টার্মিনালের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে আদি বন্দর হিসেবে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের যে গৌরবময় ঐতিহ্য আছে তা অক্ষুণ্ন থাকবে।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]