যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরান যুদ্ধের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক চীন সফর নিয়ে নানা আঙ্গিকে বিশ্লেষণ চলছে। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ট্রাম্পের সফরকে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতা বেশি বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে চমৎকার একজন নেতা এবং বাণিজ্য চুক্তিকে দারুণ সফল হিসেবে অভিহিত করেছেন। যদিও মার্কিন এই প্রেসিডেন্ট সবসময় নিজের সাফল্যকে সবচেয়ে বড় করে দেখেন।
সে যাই হোক, কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্টদের চীন সফরের ঘটনাবলি নানাভাবে সাফল্য ও ব্যর্থতার আঙ্গিকে বিশ্লেষিত হয়ে আসছে। সেই সব সফরের পরিপ্রেক্ষিতে ট্রাম্পের বর্তমান সফরের ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণ হওয়া স্বাভাবিক। আর এই বিষয়টি যখন বিশ্বের দুই অর্থনৈতিক ও সামরিক পরাশক্তির মধ্যকার ঘটনা হয় তখন তো বটেই। বিশেষ করে যখন চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের দীর্ঘ বাণিজ্য লড়াই এবং ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পানামা কিংবা ভেনিজুয়েলার মতো সাফল্য না পাওয়ার ব্যর্থতার পটভূমিতে এই সফরের গুরুত্ব অপরিসীম হয়ে উঠেছে। তাই এই সফর নিয়ে এত আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় বয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।
এখানে উল্লেখ করতে হয়, ৯ বছর আগে ট্রাম্প যখন প্রেসিডেন্ট হিসেবে চীন সফর করেছিলেন তখন তার দৃষ্টিভঙ্গিতে ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবেগ। কারণ তখন আমেরিকা ছিল বিশ্বের একক পরাশক্তি। তাই সেই সফর শেষে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে গিয়ে চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্যযুদ্ধ ঘোষণা করেন। কিন্তু এবারের সফরে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে প্রতিযোগিতার আভাস দিয়েছেন জোরালোভাবে। একইভাবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং শত্রুতা নয়; সহযোগিতামূলক সম্পর্কের আশা ব্যক্ত করেছেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল তাইওয়ান ইস্যু ও দক্ষিণ চীন সাগর বিষয়টিও এড়িয়েই গেছেন।

তবে একটি বিষয় খুবই সত্য, ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে সবার ধারণা এমন, তিনি নিজের স্বার্থ রক্ষায় অনড় অবস্থান নেয়া এমন একজন নেতা যিনি মূলত শক্তি প্রয়োগের হুমকি কিংবা নানা উপায়ে চাপ দেয়ার মাধ্যমে সুবিধা আদায়ের কূটনীতিতে অভ্যস্ত। এরই প্রেক্ষাপটে তিনি চীনা পণ্যের উপর উচ্চ ট্যারিফ আরোপ করে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই বাণিজ্যযুদ্ধ সত্ত্বেও চীন নানা পন্থায় তার সাপ্লাই লাইন অটুট রাখতে সক্ষম হয়েছে। পক্ষান্তরে উচ্চ ট্যারিফের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে যেমন জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়েছে; তেমনি কয়েকটি যুদ্ধে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেয়ায় সেখানের জনগণের জীবনযাত্রা ব্যয় সীমা ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ- রাশিয়াকে চাপে রাখতে ইউক্রেনের প্রক্সি যুদ্ধে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় হয়েছে ১২০ থেকে ১৮০ বিলিয়ন ডলারের মতো। আর সাম্প্রতিক ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইতোমধ্যে ব্যয় হয়েছে ২৯ বিলিয়ন ডলারের মতো। এর আগে ইরাক যুদ্ধে খরচ হয়েছিল ২.৯ ট্রিলিয়ন ও আফগান যুদ্ধে ২.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এই অবস্থায় চীনকে চাপে রাখতে গিয়ে কার্যত আমেরিকা নিজেই চাপে পড়ে গেছে।
এরকম প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের চীন সফর তার জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। এই সফরের মাধ্যমে তিনি আমেরিকার জনগণ কিংবা বিশ্ববাসীকে রোমান সম্রাট জুলিয়াস সিজারের সেই উক্তিটির মতো বুঝাতে চেয়েছিলেন ‘আসলাম, দেখলাম, জয় করলাম’। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি বুঝি সেরকম হয়নি; বরং ট্রাম্পের শরীরী ভাষায় হয়তো তার চিরাচরিত ভয় দেখিয়ে বাগে আনার মনোভঙ্গির পরিবর্তে এক ধরনের নমনীয়তা লক্ষ করা গেছে। তার চোখে মুখে ছিল হতাশার ছাপ। নিশ্চয়ই তা আমেরিকার শীর্ষ গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর শীর্ষ মনস্তত্ত্ববিদদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি, যেটি তারা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বিরুদ্ধে পর্যবেক্ষণ করে আসছে বহু বছর ধরে। অতীতে অনেক দেশের রাষ্ট্রনায়কের শরীরী ভাষা বিশ্লেষণ করে আমেরিকা বেশ কিছু সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছিল।
যেমন- ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির সেক্রেটারি ক্রুশ্চেভ এবং প্রধানমন্ত্রী নিকোলাই বুলগানিন যখন ভারত সফরে যান তখন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর মনস্তত্ত্ববিদরা দু’জনকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কারণ স্টালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব প্রবল হয়ে উঠেছিল। এই দ্বন্দ্বের মধ্যে প্রথমে নিকিতা ক্রুশ্চেভ ও বুলগানিন পরস্পর ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও পরবর্তীতে দু’জনের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকা বুঝতে চেষ্টা করছিল, এই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে আগামীতে কে বিজয়ী হবে। মার্কিন মনস্তত্ত্ববিদরা শুধু বক্তৃতা নয়; তারা দু’জনের প্রতিটি পদক্ষেপও বিশ্লেষণ করছিলেন। তারা পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন, প্রথমদিকে বুলগানিনের পা একটু এগিয়ে ছিল। ফেরার সময় ক্রুশ্চেভ বুলগানিনকে পেছনে ফেলে আরো সামনে এগিয়ে গেছেন। এ থেকে সিআইএর বিশ্লেষকরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন, আগামীতে সোভিয়েত মসনদে নিকিতা ক্রুশ্চেভই মূল ক্ষমতাধর। পরবর্তীতে সেটিই হয়েছিল। ক্রুশ্চেভ প্রধানমন্ত্রী বুলগানিনকে বরখাস্ত করেন। এরকম আরো অনেক ঘটনা আছে। কিন্তু এবারের চীন সফরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শরীরী ভাষা বিশ্লেষণ করে সিআইএর মনস্তত্ত্ববিদরা কোন উপসংহারে পৌঁছবেন তা হয়তো আমরা জানতে পারব না। কিংবা এটি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আসে-যায় না। কারণ এটি একটি গণতান্ত্রিক দেশ এবং এটি সিস্টেমের মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। এখানে ক্ষমতার লড়াই নেই। প্রেসিডেন্ট গুরুতর অপরাধ করে থাকলে হয় তিনি ইমপিচমেন্ট হবেন, না হয় সংবিধানের ২৫ ধারা কার্যকর হবে।
মোদ্দা কথা, এবারের চীন সফরে ট্রাম্পের শরীরী ভাষায় ৯ বছর আগের একক পরাশক্তির দাম্ভিকতা ছিল না; বরং ছিল তোয়াজ ও অনুরোধের ভঙ্গি। পক্ষান্তরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শরীরী ভাষায় ছিল আত্মবিশ্বাস ও দৃঢ়তা। এর আগে উল্লেখ করেছি, ট্রাম্পের মধ্যে অতীতের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভঙ্গি থেকে এবার সহযোগিতার প্রবণতা যে বেশি ছিল, তার প্রমাণ পাওয়া যায় তার সফরসঙ্গীদের তালিকা দেখে। সেই তালিকায় ছিল ইলন মাস্কসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ১৭ জন সিইও।
পরিশেষে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার সেই ঐতিহাসিক ঘটনার কথা উল্লেখ করে লেখা শেষ করতে চাই। সেটি ছিল ১৯৭১ সালের ঘটনা, সবে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ তীব্র আকার নিয়েছে, আর ঠিক তখন আটলান্টিকের ওপারে যুক্তরাষ্ট্রে চলছিল গোপন কূটনৈতিক মিশনের প্রস্তুতি। কূটনীতির ইতিহাসে এটি ছিল সবচেয়ে বড় একটি ঘটনা। আর এই গোপন মিশনের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ছিল পাকিস্তান। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বিবেচিত হেনরি কিসিঞ্জার ছিলেন এই মিশনের নায়ক।
দিনটি ছিল ১৯৭১ সালের ১৫ জুলাই। এই দিনে হেনরি কিসিঞ্জার পাকিস্তানের একটি বিমানে খুব গোপনে বেইজিং পৌঁছান। আর এই গোপন সফরের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সম্পর্কের নতুন অধ্যায়। ১৯৪৯ সালে গণচীন স্বাধীন হওয়ার পর যে আমেরিকা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছিল, সেই আমেরিকাই দুই দশক পর আবার নিজেই সম্পর্ক গড়তে উদ্যোগী হয়েছিল।
আর এই পথ ধরেই ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন চীন সফর করেন। এরপর ১৯৭৯ সালে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেই সময় থেকে পরবর্তীতে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর, বাণিজ্যযুদ্ধ ইত্যাদি নানা ইস্যুতে টানাপড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অনেকবার শীর্ষ বৈঠক হয়েছে। অর্থাৎ- সেই ’৭২ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সফরের পর থেকে আটজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন সময়ে চীন সফর করেছেন। সেই আটজন হচ্ছেন- রিচার্ড নিক্সন, জেরালড ফোর্ড, জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ, বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা ও ডোনাল্ড ট্রাম্প।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



