আধুনিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে ওয়াকফ

বর্তমানে বাংলাদেশে হাজার হাজার একর ওয়াকফ সম্পদ অনাবাদি, দখলকৃত বা অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ এই সম্পদ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানো হলে এটি হতে পারে দারিদ্র্যবিমোচনের বিকল্প পথ, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ভার লাঘবের সহায়ক এবং একটি মানবিক উন্নয়নের মডেল। জোরালো রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও শরিয়াহর চেতনা থাকলে, ওয়াকফ হতে পারে বাংলাদেশের জন্য এক ইসলামী, মানবিক ও টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা

ইসলামী অর্থনীতির এক অনন্য ধারা ওয়াকফ, যা এক দিকে সদকায়ে জারিয়া, অন্য দিকে সামাজিক কল্যাণের টেকসই মাধ্যম। ওয়াকফ আরবি শব্দ, যার অর্থ থামিয়ে দেয়া, নির্দিষ্ট করে দেয়া বা স্থায়ী করে রাখা। ইসলামী শরিয়াহর পরিভাষায়, ওয়াকফ বলতে এমন চ্যারিটেবল বা জনকল্যাণমুখী সম্পদ ব্যবস্থাপনা বোঝায়, যেখানে কোনো ব্যক্তি নিজের সম্পদ বা সম্পত্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করে দেন এ শর্তে যে, সম্পদের মূলধন অপরিবর্তিত থাকবে। লাভ-আয় সমাজের কল্যাণে ব্যয় হবে। এটি কেবল একটি দান নয়, বরং একটি ইসলামী পাবলিক ফাইন্যান্সিং মডেল; যা ব্যক্তিগত পুণ্য ও সামাজিক উন্নয়নের মিলিত রূপ। পবিত্র কুরআনে সমাজকল্যাণের কাজে উৎসাহ দেয়া হয়েছে : ‘তোমরা সৎকাজে ও আল্লাহভীতিতে একে অপরকে সাহায্য করো।’ (সূরা মায়িদা : ২)

ইসলামের সূচনালগ্ন থেকে সাহাবায়ে কেরাম, তাবেইনগণ ও পরবর্তী মুসলিম সমাজ ওয়াকফের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবিক সহায়তা এবং কর্মসংস্থানের ভিত্তি গড়ে তুলেছেন। মুসলিম ইতিহাসে ওয়াকফ শুধু একটি ধর্মীয় দান নয়, বরং এটি সমাজ পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হাজারো মাদরাসা, হাসপাতাল, পথচারী বিশ্রামাগার, পানির ফোয়ারা, দরিদ্রের খাদ্যগুদাম ও বেকারদের জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র।

কিন্তু আজকের দিনে বিশেষ করে বাংলাদেশসহ বহু মুসলিম দেশে এ ঐতিহাসিক ওয়াকফ ব্যবস্থা কেবল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ। ফলত দারিদ্র্যবিমোচন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান খাতে এর বিপুল সম্ভাবনা প্রায় অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ মুসলিম বিশ্বের ইতিহাসে ওয়াকফের মাধ্যমে বহু বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, রাস্তাঘাট, খাবার ঘর, আশ্রয়কেন্দ্র ও কর্মসংস্থান প্রকল্প পরিচালিত হয়েছে। সরকার যদি রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় শরিয়াহসম্মতভাবে ওয়াকফ সম্পদের সদ্ব্যবহার করে, তা হলে এটি হতে পারে বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের শক্তিশালী বিকল্প মডেল। তাই ওয়াকফকে পুনর্জাগরিত ও আধুনিকীকৃতরূপে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংযুক্ত করা সময়ের দাবি।

ওয়াকফের মূল উদ্দেশ্যগুলো

১. শরিয়তসম্মত সদকায়ে জারিয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ২. দারিদ্র্যবিমোচন ও সামাজিক বৈষম্য কমানো। ৩. শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও সেবা প্রতিষ্ঠা। ৪. দরিদ্র, এতিম, মিসকিন ও পথহারা মানুষদের কল্যাণ নিশ্চিত করা। ৫. অসমর্থ ব্যক্তিদের জন্য আবাসন, খাদ্য ও চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা। ৬. অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। ৭. সরকারের ব্যয়ভার হ্রাসে সহায়তা করা (যেমনÑ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, হাউজিং খাতে)। ৮. জাতীয় উন্নয়নের একটি শরিয়াহসম্মত, টেকসই ও মানবিক বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলা। ৯. সমাজে ন্যায়, দায়িত্ববোধ ও সম্পদের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন প্রতিষ্ঠা। ১০. আধুনিক করপোরেট ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সাথে সংযুক্ত হয়ে টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখা।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় ওয়াকফের ব্যবহার : বাংলাদেশসহ বর্তমান মুসলিম বিশ্বের একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, রাষ্ট্রের সীমিত বাজেট ও জনগণের সীমাহীন চাহিদা। সরকারের পক্ষে এককভাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও দারিদ্র্যবিমোচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিপুল ব্যয়নির্বাহ করা কঠিন। এ প্রেক্ষাপটে ওয়াকফ ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করা হলে তা হতে পারে একটি ব্যতিক্রমী ও কার্যকর সমাধান। ওয়াকফের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে যেমন সরকারি ব্যয় হ্রাস সম্ভব, তেমনি এটি কর্মসংস্থান ও সামাজিক কল্যাণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

শিক্ষা খাতে অবদান : ওয়াকফ তহবিল ব্যবহার করে স্কুল, কলেজ, মাদরাসা বা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হলে সরকারের নতুন প্রতিষ্ঠান নির্মাণ বা পরিচালন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ ওয়াকফ থেকে দিলে, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির চাপ অনেকটা কমে যাবে।

স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ : ওয়াকফ অর্থায়নে হাসপাতাল, ক্লিনিক, ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা ইউনিট পরিচালনা করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় যেখানে সরকারি সেবার ঘাটতি রয়েছে, সেখানে ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান কার্যকর বিকল্প হতে পারে।

দারিদ্র্যবিমোচন ও সামাজিক সুরক্ষা : এতিম, গৃহহীন, বিধবা, প্রতিবন্ধী ও বয়স্কদের জন্য সরকার যেসব ভাতা ও সহায়তা দেয়, তার একটি বড় অংশ ওয়াকফ প্রতিষ্ঠান থেকে দেয়া যেতে পারে। এ ছাড়া ক্ষুদ্রঋণ ও স্বনির্ভর প্রকল্প চালু করে হতদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে আত্মকর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধ করা যায়। ফলে সরকারের সামাজিক সুরক্ষা ব্যয়ও হ্রাস পাবে।

অর্থনৈতিক বিকাশ ও বিনিয়োগ : ওয়াকফ সম্পদ ব্যবহারে যেমন হালাল ও শরিয়াহসম্মত ব্যবসায়িক উদ্যোগ (যেমনÑ শপিং কমপ্লেক্স, কৃষি প্রকল্প প্রভৃতি) গড়ে তোলা যায়, তেমনি সেখান থেকে প্রাপ্ত আয় আবার সমাজকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করা যায়। এ পদ্ধতি এক দিকে টেকসই বিনিয়োগের মাধ্যমে আয় তৈরি করে, অন্য দিকে জনকল্যাণ নিশ্চিত করে।

বাসস্থান ও নগর উন্নয়ন : ওয়াকফ জমি ব্যবহার করে দরিদ্রদের জন্য আবাসন প্রকল্প, এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম ও মসজিদ নির্মাণ করা সম্ভব। এতে সরকারকে নতুন জমি কিনে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশাল ব্যয় করতে হবে না। শহুরে উন্নয়নে পরিকল্পিতভাবে ওয়াকফ সম্পদ ব্যবহার করলে এটি আধুনিক ও মানবিক নগর গঠনে সহায়ক হবে।

কর্মসংস্থান সৃষ্টি : ওয়াকফ তহবিল দিয়ে হালাল ব্যবসা, কৃষিভিত্তিক প্রকল্প, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রশিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির পথ প্রশস্ত করা যায়। শরিয়াহর দৃষ্টিতে এটি একটি পুণ্যময় এবং উৎসাহিতকরণীয় উদ্যোগ, যা তরুণ সমাজের স্বনির্ভরতা অর্জনে সহায়ক।

টেকসইতা ও স্বনির্ভরতা : ওয়াকফ থেকে প্রাপ্ত আয় বার্ষিক বাজেটের বাইরেও সরকারের জন্য একটি বিকল্প অর্থনৈতিক উৎস হিসেবে কাজ করে, যা উন্নয়নকে আরো টেকসই করে তোলে।

বাংলাদেশে ওয়াকফ-ব্যবস্থা ও আইনগত কাঠামো

ওয়াকফ প্রশাসন অধিদফতরের ২০২৩ সালের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে দুই লাখ সাত হাজারের বেশি ওয়াকফ এস্টেট রয়েছে। এসব সম্পদের মধ্যে রয়েছে মূল্যবান নগরজমি, দোকানপাট, কৃষিজমি, খাসজমি এবং সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহারের উপযোগী স্থাবর সম্পত্তি। তবে এই বিশাল সম্পদের একটি বড় অংশ অব্যবহৃত, বেদখল কিংবা অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনায় অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। অথচ একটি আধুনিক ও শরিয়াহসম্মত ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা গেলে বিপুল এই সম্পদ জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম শক্তিশালী উৎসে পরিণত হতে পারে।

চ্যালেঞ্জগুলো

আমাদের দেশে ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবহার ও পরিচালনায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। যেমন দখল ও অব্যবস্থাপনার শিকার মূল্যবান সম্পদ। ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনা ও দেখাশোনার জন্য সরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়াকফ প্রশাসনের পর্যাপ্ত জনবল ও প্রযুক্তি সুবিধার অভাব যেমন রয়েছে, তেমনি আইনের দুর্বল বাস্তবায়ন লক্ষণীয়ভাবে বিদ্যমান। রয়েছে ডিজিটাল রেকর্ড ও ট্র্যাকিংয়ের অভাব। সেই সাথে শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ মডেল নেই।

সমাধানে প্রস্তাব : আধুনিক ওয়াকফ মডেল

একটি পূর্ণাঙ্গ ওয়াকফ উন্নয়নকাঠামো বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে :

১. ডিজিটাল ওয়াকফ রেজিস্ট্রি ও জিও-ম্যাপিং প্রণয়ন করে প্রতিটি ওয়াকফ জমির খতিয়ান, মানচিত্র, অবস্থান ও মালিকানা ডিজিটাল ডাটাবেজে সংরক্ষণ করা। জিপিএস আই ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার করা।

২. ওয়াকফ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা। যেখানে একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্থা থাকবে, যাতে শরিয়াহ, আইন, অর্থনীতি ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ থাকবেন।

৩. ওয়াকফ ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড করা। হালাল খাতে ওয়াকফ আয় আবার বিনিয়োগ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এখানে সম্ভাব্য খাত হতে পারে আবাসন, কারিগরি শিক্ষা, হস্তশিল্প ও স্বাস্থ্যসেবা।

৪. ওয়াকফভিত্তিক সামাজিক প্রকল্প হাতে নেয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে শহরের বস্তিতে ওয়াকফ জমিতে সাশ্রয়ী আবাসন প্রকল্প নেয়া যায়। পল্লী অঞ্চলে কৃষি সহায়তা, ক্ষুদ্রঋণ ও আত্মকর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। এ ছাড়া বিনামূল্যের চিকিৎসাকেন্দ্র, মা ও শিশু স্বাস্থ্যকেন্দ্র কারিগরি কলেজ, মহিলা হোস্টেল, অনাথ আশ্রম খোলা যেতে পারে।

৫. ওয়াকফ ব্যাংক ও ইসলামিক সুকুক চালু করা। এর আলোকে শরিয়াহসম্মত ওয়াকফ সোশ্যাল ব্যাংক গঠন করার উদ্যোগ নিতে হবে। যার মাধ্যমে ইসলামী বন্ড সুকুক ইস্যু করে হালাল বিনিয়োগে উৎসাহ প্রদান করতে হবে।

৬. পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি), এনজিও ও উদ্যোক্তাদের সমন্বয় করার উদ্যোগ নিতে হবে।

৭. ওয়াকফ আইন সংস্কার করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

মুসলিম বিশ্বে ওয়াকফ-ব্যবস্থার প্রয়োগ

ওয়াকফ-ব্যবস্থাকে আধুনিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করে সফলভাবে পরিচালনার চমৎকার উদাহরণ দেখা যায় অনেক মুসলিম দেশে। এসব দেশে ওয়াকফ কেবল ধর্মীয় দান হিসেবে নয়, বরং একটি সক্রিয় ও টেকসই অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

মালয়েশিয়ায় মালয়েশিয়া ওয়াকফ ফাউন্ডেশন এবং প্রতিটি রাজ্যের ইসলামিক রিলিজিয়াস কাউন্সিলের অধীনে ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। ওয়াকফ আয়ের মাধ্যমে সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতাল, আবাসন প্রকল্প ও বৃত্তি কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। এ ছাড়া ওয়াকফ প্রপার্টিস ট্রাস্ট ও ওয়াকফ সেলাঙ্গর করপোরেশনের মতো প্রতিষ্ঠান সরকারিভাবে ওয়াকফ সম্পদকে বাণিজ্যিক খাতে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে সরকারের পাশাপাশি বেকারত্ব হ্রাস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ওয়াকফ কার্যকর ভূমিকা রাখছে। কুয়েতে দ্য কুয়েত ওয়াকফ পাবলিক ফাউন্ডেশন হচ্ছে একটি স্বশাসিত ওয়াকফ সংস্থা, যা সরকারের অংশীদার হিসেবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও গবেষণা খাতে অর্থায়ন করে। এর আয়ের বড় একটি অংশ ব্যয় হয় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি এবং দরিদ্রদের স্বাস্থ্যসেবায়। তুরস্কে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের যুগ থেকে আজ পর্যন্ত হাজার হাজার স্কুল, হাসপাতাল, সেতু, রাস্তা ও পানির ফোয়ারা ওয়াকফের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে এসব সম্পদ ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফাউন্ডেশনস নামের একটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার অধীনে পরিচালিত হয়। এ ফাউন্ডেশন বিভিন্ন মসজিদ, স্কুল, হাসপাতাল, লাইব্রেরি ও দরিদ্রদের জন্য খাদ্য বিতরণকেন্দ্র পরিচালনা করে। ওয়াকফ সম্পদ থেকে বাণিজ্যিক আয় তুলে তা আবার সমাজকল্যাণে বিনিয়োগ করা হয়। সৌদি আরবে পবিত্র হারামাইন শরিফাইনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং দরিদ্র মুসাফিরদের হজ ও ওমরাহ কার্যক্রম পরিচালনায় ওয়াকফ তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন ইসলামী খাতেও ওয়াকফের অর্থ ব্যবহৃত হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায় বাদন ওয়াকফ ইন্দোনেশিয়া নামে একটি জাতীয় ওয়াকফ সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা ব্যাংক, কৃষি, আবাসন, শিক্ষা ও বাণিজ্য খাতে ওয়াকফ তহবিল পরিচালনা করে। এটি একটি আধুনিক ও কৌশলগত জাতীয় ওয়াকফ মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত।

এসব দেশ ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা আধুনিক করপোরেট মডেলের সাথে যুক্ত করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও স্থায়িত্ব নিশ্চিত করেছে। এসব দেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা শৃঙ্খলিতভাবে কাজে লাগালে রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন, মানবিক সেবা ও দারিদ্র্যবিমোচনে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন সম্ভব।

এসব মডেল বাংলাদেশসহ অন্যান্য মুসলিম দেশের জন্য অনুসরণযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য বলে আমাদের বিশ্বাস।

শরিয়াহর দৃষ্টিতে ওয়াকফের বৈধতা ও সীমারেখা

শরিয়াহর দৃষ্টিতে ওয়াকফ একটি বৈধ, উৎসাহিত ও জনকল্যাণমূলক ব্যবস্থা, তবে এর পরিচালনায় কিছু মৌলিক সীমারেখা ও শর্ত রয়েছে। ওয়াকফের মূল লক্ষ্য মানবকল্যাণ ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। শরিয়াহ সরকারকে ওয়াকফের ‘নাযের’ (পরিচালক) বা তদারককারী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে সরকারের অধীনে ওয়াকফ পরিচালনায় অবশ্যই শরিয়াহর সীমারেখার মধ্যে পরিচালনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে কিছু শর্ত পালন করতে হবে। সেগুলো হলো ওয়াকফদাতার উদ্দেশ্য ও শর্ত পূর্ণভাবে মান্য করা। সম্পদ বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে না। আয়-ব্যয় করতে হবে হালাল ও জনকল্যাণে।

বর্তমানে বাংলাদেশে হাজার হাজার একর ওয়াকফ সম্পদ অনাবাদি, দখলকৃত বা অদক্ষ ব্যবস্থাপনায় অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। অথচ এই সম্পদ আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানো হলে এটি হতে পারে দারিদ্র্যবিমোচনের বিকল্প পথ, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের ভার লাঘবের সহায়ক এবং একটি মানবিক উন্নয়নের মডেল। জোরালো রাজনৈতিক সদিচ্ছা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও শরিয়াহর চেতনা থাকলে, ওয়াকফ হতে পারে বাংলাদেশের জন্য এক ইসলামী, মানবিক ও টেকসই উন্নয়নের রূপরেখা।

লেখক : প্রভাষক, আইন বিভাগ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম