জিয়ার ১৯ দফা, তারেকের ৩১

শহীদ জিয়া যেমন জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি তারেক রহমান ফ্যাসিস্ট সরকার কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা প্রণয়ন করেন, যা সত্যিই প্রশংসনীয় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

ড. এ কে এম মতিনুর রহমান

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জাতির এক সঙ্কটময় মুহূর্তে বাংলাদেশকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন, তেমনি বাংলাদেশে যখন দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট সরকারের দুঃশাসনে রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংসপ্রাপ্ত ঠিক তখনই তারেক রহমান রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা জাতির সামনে উপস্থাপন করেন। এ প্রবন্ধে ১৯ দফা এবং ৩১ দফার প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের প্রয়াস।

স্বাধীনতার ঘোষণা এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে জিয়ার ভূমিকা স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে সর্বময় ক্ষমতা কুক্ষিগতকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। জিয়া হতাশাগ্রস্ত জাতিকে আলোর সন্ধান দেন। বিভক্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশকে অগ্রগতির দিকে এগিয়ে নিতে দৃঢ়পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ‘তলাবিহীন ঝুড়ির’ অপবাদ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাপূর্ণ দেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ১৯৭৭ সালের ৩০ এপ্রিল একটি রাজনৈতিক, আর্থসামাজিক উন্নয়নের ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্তে¡¡ও শাসনতন্ত্রে ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সব নাগরিকের অধিকার পূর্ণ সংরক্ষণে বদ্ধপরিকর ছিলেন। জাতীয় ঐক্য ও সংহতি জোরদার করতে দেশে বসবাসকারী সব জাতিসত্তা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের’ দর্শনে অঙ্গীভূত করেন।

জিয়ার নেতৃত্বে ১৯ দফা কর্মসূচি খুব অল্প সময়ে সরকার ও সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন সৃষ্টি করেছিল, যা তাকে জনপ্রিয়তার শীর্ষে নিয়ে যায়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার দীর্ঘ ৫৪ বছর পরও জিয়ার সে স্বপ্ন পূরণ হয়নি। একটি আত্মনির্ভরশীল ও মর্যাদাবান জাতি হিসেবে বিশ্বে স্থান করে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। তা ছাড়াও সামাজিক বৈষম্য, মানবাধিকার লঙ্ঘন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, সীমান্ত হত্যা, পরনির্ভরশীল পররাষ্ট্রনীতি, ভারতের আধিপত্যবাদের প্রভাবের ফলে স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিশ্রুত আকাঙ্ক্ষাগুলো এখনো সুদূর পরাহত।

১০০ বছর পরে বাংলাদেশ অগ্রগতির কোন স্তরে উপনীত হবে জিয়া সেটি উপলব্ধি করেছিলেন। কিন্তু শুরু থেকে বিদ্যান সমস্যা সঙ্কটের ওপর বাংলাদেশ কতটুকু বিজয় অর্জন করবে, শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রে উন্নতির স্পর্শ কতটুকু লাভ করবে- তা নিয়ে অধিকাংশ রাজনীতিক এতটুকু ভাবেননি। বাংলাদেশের বিপুল জনশক্তিকে দক্ষ শ্রমশক্তিতে রূপান্তরের চিন্তা কেউ করেননি। প্রস্তুতি ছিল না আগামী শতাব্দীতে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তর পরিসরে কিভাবে সংশ্লিষ্ট হবে সে সম্পর্কেও। জিয়াউর রহমানের চিন্তাভাবনা এই পেক্ষাপটে ছিল ঐতিহাসিক ও বাস্তবসম্মত।

অপচয়প্রবণ, দুর্নীতিপরায়ণ, লুটেরা অর্থনীতিতে তাই তিনি বেসরকারি ব্যক্তি উদ্যোগ উৎসাহিত করেন, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে গ্রহণ করেন যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তিনি বিশ^াস করতেন, সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এবং সামগ্রিক দিক থেকে বিধ্বস্ত বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট বলয়ে আবদ্ধ রেখে বৈদেশিক সম্পর্ক স্থাপন করলে উন্নত এবং সমৃদ্ধ দেশ গড়া সম্ভব নয়। তাই তিনি ইন্দো-সোভিয়েত বলয় থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করে বিশ্বের সব দেশের সফলতার সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন।

তিনি চীনের সাথে সখ্যভাব স্থাপন করেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন বন্ধুত্ব সৃষ্টি করে, অর্থনৈতিক পরাশক্তি জাপানের সাথে হৃদ্যতা স্থাপন করে সৃষ্টি করেন নতুন অধ্যায়। ইঙ্গ-মার্কিন অর্থনীতির সাথে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সংশ্লিষ্ট করে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে তৈরী পোশাক শিল্প প্রবেশ করিয়ে এবং রেমিট্যান্স উপার্জনে মধ্যপ্রাচ্যে দক্ষ জনশক্তি রফতানির মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অনুভব করেন, আঞ্চলিক পর্যায়ে সহযোগিতার সূত্র বিস্তৃত না হলে জাতীয় অগ্রগতি প্রতিনিয়ত ব্যাহত হতে থাকবে। তাই ভারত ও পাকিস্তান যে ক্ষেত্রে চুপচাপ থেকেছে সে ক্ষেত্রে জিয়ার নেতৃত্বে সৃজনশীল বাংলাদেশ অগ্রসর হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার দৃঢ় সঙ্কল্প নিয়ে।

বাংলাদেশে যখন দীর্ঘ সময় ফ্যাসিস্ট সরকার অগণতান্ত্রিক ও অবৈধভাবে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে, ঠিক সে সময় তারেক রহমান তার পিতার ধারাবাহিকতায় সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কার, অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে ১৩ জুলাই, ২০২৩ সালে রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ৩১ দফা রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরেন। জনগণের হাতে রাষ্ট্রের অধিকার ফিরিয়ে দিতে প্রয়োজন একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন যা গণতান্ত্রিক শক্তির বিজয় সুনিশ্চিত করবে। ‘জণকল্যাণমূলক জাতীয় ঐকমত্যের সরকার’ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ৩১ দফা কর্মসূচি নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক।

তারেক রহমান ভারসাম্যপূর্ণ বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের রূপরেখা-৩১ দফায় উল্লেখ করেছেন। এতে আছে সংবিধান সংস্কার, সম্প্রীতিমূলক সমন্বিত রাষ্ট্রসত্তা প্রতিষ্ঠা ও জাতীয় সমন্বয় কমিশন গঠন, নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত¡াবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের সময়সীমা নির্ধারণ, আইনসভায় উচ্চকক্ষের প্রবর্তন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন, নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার এবং সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি সংশোধন, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পুনর্গঠন, জুডিশিয়াল কমিশন, প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, মিডিয়া কমিশন, অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন, দুর্নীতি প্রতিরোধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ন্যায়পাল নিয়োগ, সর্বস্তরে আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা, শ্রমের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত, শিল্প, বিদ্যুৎ, খনিজ ও জ্বালানি খাতের আধুনিকায়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, জাতীয় স্বার্থের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করে বৈদেশিক সম্পর্ক উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা বাহিনীকে সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখা, বিকেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতায়ন করা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি প্রদান, আধুনিক ও যুগোপযোগী যুব উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন, নারীর মর্যাদা সুরক্ষা ও ক্ষমতায়নে পদক্ষেপ গ্রহণ, চাহিদা ও জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়ন, সবার জন্য স্বাস্থ্যনীতির বাস্তবায়ন, কৃষকের উৎপাদন ও বিপণন সুরক্ষা নিশ্চিত করা, আধুনিক ও বহুমাত্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সঙ্কট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা এবং আনবিক শক্তির উন্নয়ন ও সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং যুগোপযোগী, পরিকল্পিত পরিবেশবান্ধব আবাসন এবং নগরায়ণ নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন। সুতরাং শহীদ জিয়া যেমন জাতির সঙ্কটময় মুহূর্তে বাংলাদেশকে স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি দিয়েছিলেন, ঠিক তেমনি তারেক রহমান ফ্যাসিস্ট সরকার কর্তৃক ধ্বংসপ্রাপ্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের ৩১ দফা প্রণয়ন করেন, যা সত্যিই প্রশংসনীয় বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।

লেখক: অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া