মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের পদ, দায়িত্ব ও মেয়াদ

ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট একাডেমি দেশের সর্বোচ্চ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ শাখা। এ একাডেমিটি নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পেশাদারিত্ব বাড়াতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান সরবরাহের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক যেরূপ নির্ধারণ করবেন, সেরূপ আকার ও পদ্ধতিতে প্রজাতন্ত্রের হিসাব রক্ষিত হবে। প্রজাতন্ত্রের হিসাব সম্পর্কিত মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের রিপোর্টগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ-পরবর্তী রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করে থাকেন

মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক একটি সাংবিধানিক পদ। সংবিধানের অষ্টম ভাগের অনুচ্ছেদ নং ১২৭ থেকে ১৩২-এ ছয়টি অনুচ্ছেদ মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকবিষয়ক। মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগ লাভ করেন। তবে এ নিয়োগ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শের আবশ্যকতা আছে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা প্রয়োগ বিষয়ে যে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, তাতে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ ছাড়া অন্য সব দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ করে থাকেন। এ সংবিধান ও সংসদ কর্তৃক প্রণীত যেকোনো আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কর্মের শর্তাবলি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত হয়ে থাকে।

মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাব এবং সব আদালত, সরকারি কর্তৃপক্ষ ও কর্মচারীর সরকারি হিসাব নিরীক্ষা করেন। সেই সাথে অনুরূপ হিসাব সম্পর্কে রিপোর্ট প্রদান করেন। একইসাথে সে উদ্দেশ্যে তিনি কিংবা সে প্রয়োজনে তার দ্বারা ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো ব্যক্তি প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত যেকোনো ব্যক্তির দখলভুক্ত সব নথি, বহি, রসিদ, দলিল, নগদ অর্থ, স্ট্যাম্প, জামিন, ভাণ্ডার বা অন্য প্রকার সরকারি সম্পত্তি পরীক্ষায় অধিকারপ্রাপ্ত।

উপরোল্লিখিত দফায় বর্ণিত বিধানাবলির হানি না ঘটিয়ে আইনের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে প্রতিষ্ঠিত কোনো যৌথ সংস্থার ক্ষেত্রে আইনের দ্বারা যেরূপ ব্যক্তি কর্তৃক ওই সংস্থার হিসাব নিরীক্ষার ও অনুরূপ হিসাব সম্পর্কে রিপোর্ট প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে, সেরূপ ব্যক্তি কর্তৃক অনুরূপ হিসাব নিরীক্ষা ও অনুরূপ হিসাব সম্পর্কে রিপোর্ট প্রদান করা যাবে।

উপরোল্লিখিত দফার নির্ধারিত দায়িত্বগুলো ব্যতীত সংসদ আইনের দ্বারা যেরূপ নির্ধারণ করবেন, মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককে সেরূপ দায়িত্বভার অর্পণ করতে পারবেন। এ দফার অধীন বিধানাবলি প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি আদেশের দ্বারা অনুরূপ বিধানাবলি প্রণয়ন করতে পারবেন। উপরিউক্ত দফার অধীন দায়িত্ব পালনে মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক স্বাধীনভাবে তার কার্য সম্পন্ন করবেন।

নিয়োগ-পরবর্তী শপথ গ্রহণ ব্যতিরেকে মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে আসীন হন না। মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককে প্রধান বিচারপতি কর্তৃক পঠিত শপথবাক্য পাঠপূর্বক স্পষ্টরূপে ব্যক্ত করতে হয় যে, ‘আমি...মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিযুক্ত হয়ে সশ্রদ্ধ চিত্তে শপথ করছি যে, আমি আইন-অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সাথে আমার পদের কর্তব্য পালন করব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করব। আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করব এবং আমার সরকারি কার্য ও সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেবো না।’

বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর কার্যকর হলেও ১৯৭৩ সালের ১১ মে প্রথম মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ দেয়া হয়। বাহাত্তরের সংবিধানের বিধান অনুযায়ী মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক তার বয়স ৬০ বছর পূর্ণ হওয়া অবধি পদে বহাল থাকতে পারতেন। ২০০৪ সালে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে পদের মেয়াদ দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পাঁচ বছর বা তার বয়স ৬৫ বছর পূর্ণ হওয়া, এর মধ্যে যেটি আগে ঘটে সে পর্যন্ত পদে বহাল থাকার বিধান করা হয়; যা এখনো কার্যকর আছে।

মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অপসারণ বিষয়ে বলা আছে— সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক অপসারিত হবেন না। একজন মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ্য করে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে স্বীয় পদত্যাগ করতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত। একজন ব্যক্তি মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে দায়িত্ব পালনের পর তিনি প্রজাতন্ত্রের অন্য কোনো পদে নিয়োগ লাভে যোগ্য নন।

মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের পদ শূন্য হলে অথবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি কার্যভার পালনে অক্ষম মর্মে রাষ্ট্রপতির কাছে সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হলে, নতুন মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক নিয়োগ না দেয়া পর্যন্ত অথবা মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পুনরায় স্বীয় দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তিকে মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্য করার এবং ওই পদের দায়িত্ব পালনে নিয়োগ দানের ক্ষমতাপ্রাপ্ত। এ ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণের আবশ্যকতা রয়েছে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ১৭টি ভিন্ন ভিন্ন অডিট অধিদফতর আছে। সরকারি দফতর এবং সরকারি খাতে ব্যয়ে সংস্থাগুলো মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের পক্ষে অডিট পরিচালনা করে। প্রত্যেকটি অধিদফতর পরিচালনা করেন একজন মহাপরিচালক। অডিট অধিদফতরগুলো হলো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান অডিট অধিদফতর, সামরিক নিরাপত্তা অডিট অধিদফতর, কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদফতর, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন অডিট অধিদফতর, বাণিজ্যিক অডিট অধিদফতর, শিক্ষা অডিট অধিদফতর, স্বাস্থ্য অডিট অধিদফতর, রাজস্ব অডিট অধিদফতর, সিভিল অডিট অধিদফতর, বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদফতর, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অডিট অধিদফতর, প্রতিরক্ষা অডিট অধিদফতর, মিশন অডিট অধিদফতর, ডাক, টেলিযোগাযোগ, বিজ্ঞান, তথ্য এবং প্রযুক্তি অডিট অধিদফতর, পরিবহন অডিট অধিদফতর এবং আইটি ও জনসেবা অডিট অধিদফতর।

মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যক্রম পরিচালনায় যেসব আইন ও বিধি প্রযোজ্য তা হলো— কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (অতিরিক্ত কার্যাবলি) আইন-১৯৭৪। আইনটির মাধ্যমে মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককে সংবিধানে বর্ণিত দায়িত্বের বাইরেও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, সরকারি এন্টারপ্রাইজ এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (পারিশ্রমিক ও বিশেষ অধিকার) আইন-১৯৯৮ অনুযায়ী, মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের বেতন, ভাতা এবং অন্যান্য সুবিধাদি নির্ধারিত হয়। প্রসঙ্গত, মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কর্মের শর্তাবলি অর্থাৎ— বেতন, ভাতা ও সুযোগ-সুবিধাদি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত হয়ে থাকে।

সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯ মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রককে সরকারি তহবিল ব্যবস্থাপনা ও নিরীক্ষায় শক্তিশালী করেছে। সরকারি বিধিমালা ও নির্দেশনাবলি সরকারি আর্থিক কার্যক্রমের নিরীক্ষায় এ নিয়মাবলি ব্যবহৃত হয়। হিসাব নিয়ন্ত্রক (রাজস্ব) (কর্মকর্তা ও কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা-২০০৩ (সংশোধিত) রাজস্ব খাতের কর্মকর্তাদের বেলায় প্রযোজ্য। নন-ক্যাডার কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ বিধিমালা-২০২৩। মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের অধীনস্ত অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসের নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণে বিধিমালাটি প্রযোজ্য। অডিট ম্যানুয়াল ও গাইডলাইন। এ ম্যানুয়াল ও গাইডলাইনের মাধ্যমে মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক অডিটরদের জন্য বাইন্ডিং প্রিন্সিপলস বা বাধ্যতামূলক নীতিগুলো অডিট কোডের মাধ্যমে জারি করেন, যা সরকারের অর্থ ব্যয়ের যথার্থতা নিশ্চিত করে।

বর্তমানে মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় ও এর অধীনস্ত দফতরগুলোতে প্রায় চার হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী কর্মরত। এ ছাড়া মোট জনবলের প্রায় ১৩ শতাংশ নারী।

ফিন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট একাডেমি দেশের সর্বোচ্চ নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের প্রশিক্ষণ শাখা। এ একাডেমিটি নিরীক্ষা ও হিসাব বিভাগের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পেশাদারিত্ব বাড়াতে প্রয়োজনীয় জ্ঞান সরবরাহের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত।

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির অনুমোদনক্রমে মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক যেরূপ নির্ধারণ করবেন, সেরূপ আকার ও পদ্ধতিতে প্রজাতন্ত্রের হিসাব রক্ষিত হবে। প্রজাতন্ত্রের হিসাব সম্পর্কিত মহাহিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের রিপোর্টগুলো রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ-পরবর্তী রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করে থাকেন।

লেখক : সাবেক জজ এবং সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

[email protected]