বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা, ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চার জগতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের অবদান নিঃশব্দ অথচ গভীর। তারা প্রচারের আলোয় খুব বেশি আসেন না, কিন্তু তাদের শ্রম, সততা ও মনন একটি প্রজন্মকে নির্মাণ করে। প্রফেসর মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদ, যিনি সবার কাছে এম এইচ রশিদ বা ‘হারুন স্যার’ নামে পরিচিত ছিলেন, ছিলেন তেমনি এক কর্মযোগী মানুষ। শিক্ষক, সংগঠক, ভাষাবিদ ও সংস্কৃতিবান বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।
তার মৃত্যু সংবাদ পত্রিকায় দেখে স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠল বহু পুরনো দিন। আমরা তাকে দেখেছি মাঠে কাজ করতে, ফলের বাগানে পরিচর্যা করতে, আবার একই নিষ্ঠায় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখাতে। তিনি ছিলেন সেই বিরল শিক্ষক, যিনি শুধু শ্রেণীকক্ষে পাঠদানে সীমাবদ্ধ ছিলেন না; বরং জীবনযাপন দিয়েও শিক্ষা দিতেন।
প্রফেসর মোহাম্মদ হারুন-উর-রশিদের জন্ম ১৯৩৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর আসামের তিনসুকিয়া শহরে। তার বাবা রহিম উদ্দিন আহমদ এবং মা সালমা খাতুন। পৈতৃক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে শিক্ষা ও সংস্কৃতিমনস্ক পরিবেশে। তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী অন্নদা মডেল হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে আইএ পরীক্ষায় মেধাতালিকায় পঞ্চম স্থান অধিকার করেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণ অঞ্চল শুধু একটি জনপদ নয়, বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম। এখানে জন্ম নিয়েছিলেন অদ্বৈত মল্লবর্মণ, যিনি কালজয়ী উপন্যাস তিতাস একটি নদীর নাম রচনা করেছিলেন। এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক আবহ, নদীমাতৃক জীবন ও সংগ্রামী বাস্তবতা হারুন স্যারের মনন গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল বলে মনে হয়।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬০ সালে ইংরেজি সাহিত্যে অনার্সসহ বিএ এবং ১৯৬১ সালে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনে তার অসাধারণ মেধা ও ভাষাজ্ঞান শিক্ষক মহলে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৪ সালে তিনি ইংল্যান্ডের প্রখ্যাত ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। ১৯৬৬ সালে ট্রাইপস পরীক্ষায় অনার্সসহ উত্তীর্ণ হন। ১৯৭০ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।
অধ্যাপনা ছিল তার জীবনের প্রধান সাধনা। সরকারি বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করার পাশাপাশি তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন। শিক্ষক হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ, পরিশ্রমী ও উদার মানসিকতার। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ‘হারুন স্যার’ নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। ইংরেজি বিভাগের অন্যতম প্রাণপুরুষে পরিণত হয়েছিলেন।
তার পরিবারও ছিল সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। চলচ্চিত্র সাংবাদিক আজিজ মিসির ছিলেন তার বড় ভাই। আজিজ মিসিরের আসল নাম ছিল সিরাজুল ইসলাম। পঞ্চাশের দশকের রাজনৈতিক অস্থির সময়ে কমিউনিস্ট পার্টির আন্ডারগ্রাউন্ড কর্মী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে নাম পরিবর্তন করেছিলেন। পরে তিনি দীর্ঘদিন দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন এবং সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রণী সংগঠক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। কলিম শরাফী, মাহবুব-উল-আলম চৌধুরী ও গোপাল বিশ্বাসদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
এই পরিবারে যেমন ছিল সংস্কৃতির চর্চা, তেমনি ছিল মূল্যবোধের দ্বন্দ্বও। এক দিকে সুদি ব্যবসার সাথে জড়িত নানা, অন্য দিকে ধর্মভীরু ও নীতিবাদী দাদা– এ দ্বন্দ্ব শুধু পারিবারিক ছিল না; বরং তৎকালীন সমাজবাস্তবতার প্রতিফলনও ছিল।
হারুন স্যারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার শিক্ষাদানের পদ্ধতি। তিনি শুধু লেকচার দিয়ে দায় সারতেন না; বরং প্রতিটি ছাত্রছাত্রীকে আলাদাভাবে বুঝিয়ে দিতেন। যেন একজন স্কুলশিক্ষকের মতো ধৈর্য নিয়ে শেখাচ্ছেন। আজকের দ্রুতগতির শিক্ষাব্যবস্থায় এমন নিষ্ঠাবান শিক্ষক কল্পনা করাও কঠিন।
তার অসাধারণ শ্রম ও দূরদর্শিতার ফলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে প্রথম ভাষাবিজ্ঞান বা লিঙ্গুইস্টিকস প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ছিল বাংলাদেশে এ ধরনের প্রথম উদ্যোগ। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও এ বিষয় চালু হয়। আর্টস ফ্যাকাল্টিতে ভাষাবিজ্ঞানের প্র্যাকটিক্যাল ক্লাস সে সময় বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। ভাষার উচ্চারণ, ধ্বনি ও আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে তার দক্ষতা ছিল অভাবনীয়। একবার তিনি এক ছাত্রীর ইংরেজি উচ্চারণ শুনে বলে দিয়েছিলেন, তার বাড়ি কুমিল্লার দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে। পরে দেখা গেল, তার পর্যবেক্ষণ সম্পূর্ণ সঠিক।
তিনি ছিলেন জ্ঞানচর্চায় উদার ও নিরপেক্ষ। রাজনৈতিক মতভেদ থাকা সত্ত্বেও তিনি কখনো সঙ্কীর্ণতার পরিচয় দেননি। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক থাকাকালে এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের ছেলের ভর্তি প্রসঙ্গে তাকে সুপারিশ করা হয়েছিল। যদিও ওই ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থানের সাথে তার কোনো মিল ছিল না, তবু মানবিকতা ও শিক্ষার স্বার্থে সহযোগিতা করেছিলেন তিনি।
পরবর্তীকালে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে টানা পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে বাংলা ভাষা, অভিধান প্রণয়ন ও গবেষণাধর্মী প্রকাশনায় নতুন গতি সঞ্চারিত হয়। বাংলা-ইংরেজি অভিধানে তিনি কৃতজ্ঞতার সাথে অধ্যাপক মোহাম্মদ আলীর নাম উল্লেখ করেছিলেন, যদিও তিনি ছিলেন তার বিপরীত প্যানেলের শিক্ষক নেতা। এ ঘটনা তার উদারতা ও বস্তুনিষ্ঠতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৭৬ সালে মার্কিন সরকারের বৃত্তি লাভ করে তিনি হাওয়াইয়ের ইস্ট-ওয়েস্ট সেন্টারে ইংরেজি শিক্ষা ও ভাষাবিজ্ঞানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৮৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল ভিজিটর্স প্রোগ্রামের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে শিক্ষা প্রশাসন বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। ১৯৮৪ সালে ফ্রান্সের নান্ত শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি সার্ভিসের সাধারণ সভায় তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন। তার আগে উপমহাদেশের মাত্র দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তি– জাকির হোসেন এবং আইএইচ কোরেশি– এই মর্যাদাপূর্ণ পদ অলঙ্কৃত করেছিলেন।
এম এইচ রশিদ শুধু শিক্ষক বা প্রশাসক ছিলেন না; তিনি অনুবাদক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তার অনূদিত দ্য থ্রি পোয়েটস গ্রন্থে শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী ও রফিক আজাদের কবিতা স্থান পেয়েছিল। ভাষা ও সাহিত্যকে তিনি দেখতেন সংস্কৃতির সেতুবন্ধন হিসেবে।
ব্যক্তি জীবনেও তিনি ছিলেন সংগ্রামী ও সংযমী। প্রথম স্ত্রী ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করার পর দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান গ্রন্থাগারিক মোহাম্মদ সিদ্দিক খানের কন্যা। সিদ্দিক খান নিজেও ছিলেন জ্ঞানচর্চার জগতের একজন বিশিষ্ট মানুষ।
আজ যখন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নানা সঙ্কট, বিভাজন ও পেশাদারিত্বের অভাবে আক্রান্ত, তখন এম এইচ রশিদের মতো শিক্ষকদের স্মরণ করা জরুরি। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, একজন শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না; তিনি একটি প্রজন্মের বোধ, মূল্যবোধ ও মনন নির্মাণ করেন।
প্রফেসর এম এইচ রশিদের জীবন ছিল জ্ঞানচর্চা ও মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তার মতো মানুষদের কারণে বাংলাদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভিত আজো দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক



