মো: সহিদুল ইসলাম সুমন
বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি ও অস্থিরতা নতুন নয়; তবে সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় এটি আরো জটিল ও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সঙ্ঘাত, সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত অবস্থানের কারণে বিশ্বের জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ইতোমধ্যে ১১০ ডলার ছাড়িয়েছে এবং পরিস্থিতি আরো খারাপ হলে তা ১৫০ ডলারেও পৌঁছতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য বিষয়টি নিছক বাহ্যিক চাপ নয়; বরং একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সঙ্কটের পূর্বাভাস।
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের কাঠামোগত বাস্তবতা সঙ্কট আরো তীব্র করে তোলে। দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় পুরো অংশই আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ শতাংশই আমদানিনির্ভর। প্রতি বছর প্রায় ছয় থেকে সাত বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয় শুধু জ্বালানি আমদানিতে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম সামান্য বাড়লেই তা সরাসরি আমদানি ব্যয়ে প্রতিফলিত হয়। হিসাব বলছে, বৈশ্বিক বাজারে প্রতি পাঁচ ডলার দাম বাড়লে বাংলাদেশের অতিরিক্ত ব্যয় হয় প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার, আর ২০-৩০ ডলার বাড়লে এই ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে। প্রতি বছর বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে জ্বালানি আমদানি করতে হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। তেলের দাম বাড়লে এই চাপ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, ফলে ডলারের চাহিদা বেড়ে যায় এবং টাকার অবমূল্যায়ন ত্বরান্বিত হয়। এর ফলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়, টাকার মান কমলে আমদানি ব্যয় আরো বেড়ে যায়, আর আমদানি ব্যয় বাড়লে রিজার্ভে চাপ বাড়ে।
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর। বাংলাদেশে ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে, যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। জ্বালানি হচ্ছে উৎপাদন ও পরিবহন খাতের প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পায়, যা পণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। একই সাথে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামে। খাদ্যদ্রব্য, ভোজ্যতেল, চাল, ডালসহ দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে অসহনীয় করে তোলে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণী এই চাপ সবচেয়ে বেশি অনুভব করে, কারণ তাদের আয়ের তুলনায় ব্যয়ের বৃদ্ধি অনেক দ্রুত ঘটে।
জ্বালানি সঙ্কট এখন শুধু তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়, এটি বাস্তবতা। সরকার ইতোমধ্যে জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অফিস সময় কমানো, বাজার বন্ধের সময় নির্ধারণ এবং বিদ্যুতের ব্যবহার সীমিত করার মতো পদক্ষেপ নিয়েছে। এমনকি জ্বালানি রেশনিং পর্যন্ত চালু করতে হয়েছে। যানবাহন ভেদে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, পরিস্থিতি সরাসরি দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।
বিদ্যুৎ খাত এই সঙ্কটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভুক্তভোগী। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। সরকার যদি এই ব্যয় ভর্তুকির মাধ্যমে সামাল দিতে চায়, তাহলে বাজেট ঘাটতি বাড়বে, আর বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলে শিল্প ও ভোক্তা উভয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে। এর ফলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়বে। অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য লোডশেডিং বা সীমিত সরবরাহের মতো পদক্ষেপ নিতে হয়, যা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড মন্থর করে দেয়।
শিল্প খাতের ওপর জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর। বাংলাদেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক শিল্প, যা জ্বালানিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ক্রেতারা তখন কম খরচের বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এর ফলে রফতানি আয় কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প চাপ সহ্য করতে না পেরে উৎপাদন কমিয়ে দিতে বা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, যা কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
কৃষি খাতও জ্বালানি সঙ্কটের বাইরে নয়। সেচ ব্যবস্থা, সার উৎপাদন এবং কৃষিপণ্যের পরিবহন- সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির ব্যবহার অপরিহার্য। তেলের দাম বাড়লে সেচ খরচ বৃদ্ধি পায়, সার উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং কৃষিপণ্যের পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। এর ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্যদ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিতে প্রতিফলিত হয়। এতে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে ওঠে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি বাড়ে। একই সাথে রফতানি খাতে প্রতিযোগিতা কমে গেলে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রবাহও হ্রাস পায়। ফলে ব্যালান্স অব পেমেন্টে চাপ সৃষ্টি হয়, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতিতে সরকারকে জটিল নীতিগত দ্বন্দ্বে পড়তে হয়। একদিকে জনগণের ওপর চাপ কমাতে জ্বালানি ভর্তুকি বাড়ানো দরকার, অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করাও জরুরি। ভর্তুকি বাড়ালে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে; আবার জ্বালানির দাম বাড়ালে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক অসন্তোষ তৈরি হতে পারে। এই দ্বৈত চাপ নীতিনির্ধারণকে কঠিন করে তোলে।
বাস্তবতা হলো- এই সঙ্কট কেবল সাময়িক নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন। দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় জ্বালানি উৎস অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়া হয়নি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার সীমিত রয়েছে এবং জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় সুশাসনের ঘাটতি বিদ্যমান। ফলে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা সরাসরি দেশের অর্থনীতিকে নাড়া দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি- দুই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি ব্যবহারে সাশ্রয় নিশ্চিত করা, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি আমদানির উদ্যোগ নিতে হবে। একই সাথে কৌশলগত জ্বালানি মজুদ গড়ে তোলা জরুরি, যাতে বৈশ্বিক সঙ্কটের সময় তা ব্যবহার করা যায়।
দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষ করে সৌর ও বায়ুশক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে। দেশীয় গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি উৎস অনুসন্ধানে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপচয় ও দুর্নীতি কমানো যায়।
পরিশেষে বলা যায়, বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের অস্থিরতা বাংলাদেশের জন্য একটি কঠিন বাস্তবতা। এ ক্ষেত্রে অবহেলা করার সুযোগ নেই। এটি শুধু একটি অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয়; বরং একটি কৌশলগত ইস্যু, যা দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সময়োপযোগী, বাস্তবমুখী এবং দূরদর্শী নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমেই এই সঙ্কট মোকাবেলা করা সম্ভব। অন্যথায়, এই অস্থিরতা ভবিষ্যতে আরো গভীর অর্থনৈতিক সঙ্কটে রূপ নিতে পারে, যার ভার বহন করতে হবে দেশের সাধারণ জনগণকেই।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম-বিষয়ক গবেষক



