সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মালাক্কা প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব এবং চীনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে বেশি মনোযোগী হয়েছেন। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী নিয়ে উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মালাক্কা প্রণালী তার প্রশাসনের কৌশলের কেন্দ্রে চলে আসে। ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্দেশ্য চীনের দুর্বলতায় আঘাত করা। কেননা, মালাক্কা প্রণালী চীনের জ্বালানি আমদানির গুরুত্বপূর্ণ পথ। বিশ্লেষকরা মনে করেন, মালাক্কা প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এবং নজরদারি বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ট্রাম্প প্রশাসন চলতি এপ্রিলে ইন্দোনেশিয়ার সাথে বড় ধরনের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
ট্রাম্প মালাক্কা প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ বা তদারকির মাধ্যমে এশিয়ায় মার্কিন প্রভাব সুসংহত করতে এবং চীনের বিরুদ্ধে একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে বেইজিংকে অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে চাপে রাখতে চান। তিনি মালাক্কা প্রণালীতে মার্কিন নৌবাহিনীর টহল জোরদার এবং প্রয়োজনে নির্দিষ্ট জাহাজ আটক করার পরিকল্পনা করছেন, যা চীনের তথাকথিত ‘মালাক্কা ডিলেমা’ বা মালাক্কা সঙ্কটের ভয় আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
মালাক্কা প্রণালী বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলোর একটি। এটি সুমাত্রা দ্বীপ (ইন্দোনেশিয়া) এবং মালয় উপদ্বীপের মধ্যবর্তী সঙ্কীর্ণ নৌপথ। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ বাণিজ্য এবং ৩০ শতাংশ তেল পরিবাহিত হয়। প্রতি বছর লক্ষাধিক জাহাজ এখান দিয়ে যাতায়াত করে। চীনের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল আমদানি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং ভারতের একটি বড় অংশের জ্বালানি ও বাণিজ্য হয় এই পথে। এর সঙ্কীর্ণতম অংশ মাত্র ২.৮ কিলোমিটার চওড়া, যা এটিকে সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ‘চোকপয়েন্ট’ বা গলার কাঁটায় পরিণত করেছে।
চীনের জন্য এই প্রণালী একটি দীর্ঘ দিনের কৌশলগত দুর্বলতা, যা ‘মালাক্কা ডিলেমা’ নামে কূটনৈতিক মহলে পরিচিত। ২০০৩ সালে তৎকালীন চীনা প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও এই শব্দটি ব্যবহার করেন। চীনের অর্থনীতির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং যুদ্ধ বা সঙ্ঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্ররা এই পথ অবরোধ করে চীনের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। এই ভয় থেকে চীন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-বিআরআইয়ের আওতায় বিকল্প পথ তৈরি করছে। চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর-সিপিইসি এবং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর-সিএমইসির মাধ্যমে গোয়াদর ও কিয়াউকপিউ বন্দর থেকে স্থলপথে তেল-গ্যাস আনার চেষ্টা করে। তবে এসব প্রকল্প নিরাপত্তা সমস্যা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং উচ্চ খরচের কারণে পুরোপুরি সফলতা পায়নি। চীন এখন ভারত মহাসাগরের আশেপাশে সমুদ্র জরিপ করছে এবং নৌবাহিনীকে শক্তিশালী করছে যাতে দূরবর্তী সমুদ্রপথ রক্ষা করা যায়।
ভারতের জন্য মালাক্কা প্রণালী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বাণিজ্যের বড় অংশ এবং জ্বালানি আমদানি এই পথ দিয়ে হয়। ভারতের আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ এই প্রণালীর মুখের কাছে অবস্থিত, যা ভারতকে কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে। ভারত এই অঞ্চলে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বাড়িয়েছে এবং মালাক্কা টহলে যোগ দেয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে। চীনের ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ কৌশলের (পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন বন্দরে প্রভাব বিস্তার) মুখোমুখি হয়ে ভারত কোয়াড (ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া) এবং অন্যান্য আঞ্চলিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে নিজের প্রভাব ধরে রাখতে চায়। ভারতের ভূ-কৌশলগত অবস্থান চীনের অস্বস্তির কারণ।
মালাক্কা প্রণালী যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলের অংশ। যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে নৌবাহিনীর উপস্থিতি বজায় রেখেছে। প্রতিরক্ষাচুক্তির আওতায় ইন্দোনেশিয়া তার আকাশসীমায় মার্কিন সামরিক বিমানের প্রবেশাধিকার দিচ্ছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর এই প্রণালীর তিনটি উপকূলীয় দেশ নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে মালাক্কা প্রণালীর নিরাপত্তা বজায় রাখে। যদি কোনো সঙ্ঘাতে মালাক্কা প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্ব-অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লাগবে। এটি শুধু ভূ-রাজনীতির লড়াই নয়; বরং বিশ্ব বাণিজ্য ও শক্তি নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। আঞ্চলিক দেশগুলো (ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর) নিরপেক্ষতা বজায় রেখে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছে; কিন্তু বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা তাদের ওপরও চাপ তৈরি করছে।
মালাক্কা প্রণালী এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি কেন্দ্রীয় যুদ্ধক্ষেত্র। চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত ভূ-কৌশলগত সুবিধা কাজে লাগিয়ে নিজের অবস্থান মজবুত করছে। এই ত্রিমুখী খেলা ভবিষ্যতে আরো জটিল হতে পারে।

মালাক্কা প্রণালীর দৈর্ঘ্য প্রায় ৮০০ কিলোমিটার এবং সবচেয়ে সঙ্কীর্ণ অংশ মাত্র ২.৮ কিলোমিটার চওড়া। প্রাচীনকাল থেকেই এই প্রণালী বিশ্ববাণিজ্যের প্রধান সেতুবন্ধন এবং এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক নয়; বরং সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও অপরিসীম।
প্রাচীন যুগ থেকে মালাক্কা প্রণালী মেরিটাইম সিল্ক রোডের (সামুদ্রিক সিল্ক রোড) অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি ভারত, চীন, আরব, পারস্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যের প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রোমান, গ্রিক, চীনা, ভারতীয় ও আরব বণিকরা এই পথ দিয়ে মসলা, রেশম, চীনামাটির বাসন, সুগন্ধি দ্রব্য এবং অন্যান্য মূল্যবান পণ্য পরিবহন করতেন। প্রণালীর ভৌগোলিক অবস্থানÑ মৌসুমি বায়ু, সুরক্ষিত জলপথ এবং প্রাকৃতিক বন্দর, এটিকে আদর্শ বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত করেছিল। এর ফলে এশিয়ার বড় অভিবাসন এবং সাংস্কৃতিক বিনিময়ও এই পথ দিয়ে ঘটেছে।
১৫০০ শতাব্দীতে মালাক্কা সালতানাতের উত্থান এই প্রণালীর ইতিহাসে স্বর্ণযুগ নিয়ে আসে। ১৪০০ সালের দিকে পারমেশ্বরা (পরে ইসলাম গ্রহণ করে সুলতান ইস্কান্দর শাহ) একটি ছোট মাছ ধরার গ্রামকে বিশ্বের অন্যতম বড় বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপান্তরিত করেন। মালাক্কা শহর দ্রুত একটি transshipment port হয়ে ওঠে, যেখানে ভারতীয়, আরব, পারস্য, চীনা এবং স্থানীয় বণিকরা মিলিত হতেন। ন্যায্য শুল্ক, নিরাপদ বিচারব্যবস্থা এবং মিং চীনের সাথে সম্পর্কের কারণে এটি দ্রুত সমৃদ্ধ হয়। মালাক্কা সালতানাত ইসলামের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং মালয় ভাষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এই যুগে প্রণালীটি বিশ্ববাণিজ্যের একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু যাকে ভেনিস, কায়রো বা ক্যান্টনের সমকক্ষ বলা হয়।
১৫১১ সালে পর্তুগিজরা মালাক্কা দখল করে, যা ইউরোপীয় উপনিবেশবাদের শুরু। তারা মুসলিম বণিকদের প্রভাব কমাতে চেয়েছিল এবং মসলাবাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ডাচ এবং ব্রিটিশরা এই অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার করে। ব্রিটিশরা সিঙ্গাপুরকে (প্রণালীর দক্ষিণ প্রান্তে) একটি মূল বন্দরে পরিণত করে। স্ট্রেইটস সেটেলমেন্টস (পেনাং, মালাক্কা, সিঙ্গাপুর) ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে এই পথের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ঔপনিবেশিক যুগে প্রণালীটি ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যের মূল শিরা হয়ে ওঠে, বিশেষ করে মসলা, চা, রেশম ও পরবর্তীকালে তেলের পরিবহনে।
আধুনিক যুগেও এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অব্যাহত। এর ইতিহাস আমাদের শেখায়, একটি ছোট জলপথ কিভাবে বিশ্ব-অর্থনীতি ও সভ্যতার গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন আছে যে, ভারত এখানে চীনকে ঠেকাতে পারবে কি না। উত্তরটি জটিল। ভারতের ভৌগোলিক সুবিধা অস্বীকার করা যায় না। গ্রেট নিকোবরের বিমানঘাঁটি ও নৌঘাঁটি থেকে ভারতীয় নৌ ও বিমানবাহিনী মালাক্কা প্রণালীর ওপর দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ভারতের অবস্থান ইরানের হরমুজ নিয়ন্ত্রণের মতোই শক্তিশালী। কিন্তু বাস্তবে পুরোপুরি ‘ঠেকানো’ সহজ নয়। চীনের নৌবাহিনী (পিএলএএন) বিশ্বের সবচেয়ে বড় নৌবাহিনীতে পরিণত হয়েছে, ব্লু-ওয়াটার ক্ষমতা বাড়াচ্ছে এবং বিকল্প পথ তৈরি করছে। ভারতের নিজস্ব বাণিজ্যের একটি বড় অংশও (প্রায় ৫৫ শতাংশ) এই প্রণালী দিয়ে যায়, তাই সম্পূর্ণ অবরোধ ভারতের অর্থনীতিরও ক্ষতি করবে। এ ছাড়া আঞ্চলিক দেশগুলো (ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর) নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চায় এবং বড় শক্তিগুলোর মধ্যে যুদ্ধ চায় না।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব ও গ্রন্থকার



