প্রতিবেশীর প্রতি সদয় আচরণ, ভালোবাসা এবং পারস্পরিক অধিকারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব সর্বযুগ, সমাজ ও সংস্কৃতিতে বিদ্যমান। প্রতিবেশী বলতে কেবল বাড়ির পাশের বাসিন্দা নয়, ব্যাপক ও ব্যবহারিক অর্থে নিজের পরিবারের সদস্য, কক্ষ সাথী, ব্যাচমেট, সহপাঠী, ছাত্র-শিক্ষক, রোগী-চিকিৎসক, সহকর্মী, সহযাত্রী, সমিতির সদস্য, পার্টি বা দলভাই, এমনকি ভৌগোলিক দূরত্বের ভিত্তিতে একটি বিস্তৃত এলাকাকেও বোঝানো হয়, যেখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অন্তর্ভুক্ত। সবাই সবার সাথে সুষম, সম্মান ও সমীহ সহকারে পারস্পরিক সহযোগিতা সহমর্মিতার বোধ ও বিশ্বাসে স্বপ্রণোদিত হয়ে ‘প্রতিবেশীসুলভ আচরণ’ করলে সাম্প্রতিককালে মহা ধুমধামের মহাযুদ্ধে একটি প্রাচীন সভ্যতাকে গুঁড়িয়ে দেয়ার হুঙ্কার, প্রতিপক্ষ দেশের সর্বোচ্চ নেতা, সমর অধিনায়কদের ঘোষণা দিয়ে হত্যা করার মতো মানবাধিকারের অতি অমানবিক লঙ্ঘন, প্রতিবেশী দেশের প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে নিজ দেশের জেলে ভরার মতো ঘটনা ঘটত না। অত দূরে যাই কেন এই সে দিন বাংলাদেশের বাঞ্ছারামপুর থানায় আপন ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন হতো না, রাজশাহীতে বিদ্যালয়ে ঢুকে মহিলা শিক্ষিকাকে হেনস্তা করার খবর কানে আসত না।
ইসলামে প্রতিবেশীর অধিকারকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং একে ঈমানের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। কুরআন কারিমে আল্লাহর ইবাদতের নির্দেশের পরেই পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, মিসকিন এবং নিকটবর্তী ও দূরবর্তী প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়, সে ঈমানদার হতে পারে না। প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকলে নিজে পেট ভরে খাওয়াকে ইসলামে অনুচিত বলা হয়েছে। অমুসলিম প্রতিবেশী হলেও তাদের সাথে সুসম্পর্ক, ন্যায্যবিচার এবং সদাচরণ করার বিধান রয়েছে। হজরত হাসান রহ:-এর বর্ণনা অনুযায়ী, নিজের ঘর থেকে সামনের, পেছনের, ডান পাশের ও বাঁপাশের ৪০টি ঘর পর্যন্ত প্রতিবেশী হিসেবে গণ্য হয়।
বাইবেলে প্রতিবেশীকে ভালোবাসার বিধানটিকে ঈশ্বরের প্রতি ভালোবাসার সমতুল্য মনে করা হয়। নিজেকে ভালোবাসার মতো প্রতিবেশীকে ভালোবাসা যিশুখ্রিষ্টের শিক্ষার অন্যতম মূল কথা। ‘তোমার প্রতিবেশীকে নিজের মতো ভালোবাসো।’ (মথি ২২ : ৩৯) আপনি নিজে যেমন ব্যবহার অপরের কাছ থেকে প্রত্যাশা করেন, প্রতিবেশীর সাথে তেমন আচরণ করাই হলো সুবর্ণ নিয়ম (Golden Rule)। ‘যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে তুচ্ছ করে, তাকে পাপী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং দরিদ্র প্রতিবেশীর প্রতি উদার হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে দুর্যোগে পাশে থাকার- দূরের আত্মীয়র চেয়ে কাছের প্রতিবেশী বিপদের সময় বেশি কাজে আসে, তাই তাদের সাথে সম্পর্ক অটুট রাখতে ‘হিতোপদেশ’-এ বলা হয়েছে।
হিন্দুধর্মে প্রতিবেশী এবং অতিথিদের প্রতি দায়িত্ব পালনের ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। বৈদিক সংস্কৃতিতে সবাইকে নিজের পরিবারের অংশ মনে করাই সর্বজনীন ভালোবাসা ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’। প্রতিবেশীর প্রতি সংবেদনশীলতা, সহানুভূতি এবং সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া মানবিক দায়িত্ব হিসেবে গণ্য হয়। প্রতিবেশী, তিনি যে বর্ণের বা ধর্মের হোন না কেন, তার সাথে সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং পারস্পরিক আদান-প্রদানের বিধান সনাতন ধর্মে বিদ্যমান।
সব ধর্মেই প্রতিবেশী বলতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভৌগোলিক নৈকট্য বোঝায়। প্রতিবেশীর সুখে সুখী হওয়া, দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, তাদের গোপনীয়তা রক্ষা করা এবং কোনোভাবেই কষ্ট না দেয়ার বিধান সব ধর্মের মূল সুর।
কৌটিল্য (চাণক্য) তার ‘অর্থশাস্ত্রে’ প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা প্রতিবেশী সম্পর্কিত কূটনীতিতে অত্যন্ত বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেছেন। কৌটিল্য বিশ্বাস করতেন, ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রতিবেশী রাষ্ট্র সাধারণত নিজের রাজ্যের স্বাভাবিক শত্রু হয়। কারণ প্রতিবেশী রাষ্ট্রের স্বার্থ এবং নিজের রাজ্যের স্বার্থে প্রায়ই সঙ্ঘাত বাধে। ‘শত্রুর শত্রু বন্ধু’ কৌটিল্যের এই ‘মূলতত্ত্ব’-এর একটি মূলনীতি হলো, ‘শত্রুর প্রতিবেশী তোমার স্বাভাবিক বন্ধু।’ অর্থাৎ, নিজের প্রতিবেশীর যে প্রতিবেশী, সে রাষ্ট্রের মিত্র হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
বাস্তববাদী কূটনীতি প্রসঙ্গে কৌটিল্যর অভিমত, ‘প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক আবেগ বা বন্ধুত্বের ওপর নির্ভর করে না; বরং স্বার্থের ওপর নির্ভর করে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র সবসময় নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হতে পারে, তাই তার ওপর নজর রাখা প্রয়োজন। কৌটিল্যর মতে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে সবসময় সন্দেহের চোখে দেখতে হবে এবং দূরবর্তী রাষ্ট্রগুলোকে বন্ধু হিসেবে গণ্য করতে হবে।
প্লেটোর দর্শনে ‘প্রতিবেশী’ বিষয়টি সরাসরি ব্যক্তি মানুষের চেয়েও ভৌগোলিক, রাজনৈতিক এবং দার্শনিক অর্থে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রিপাবলিক’ এবং অন্যান্য সংলাপে তিনি প্রতিবেশী রাষ্ট্র, প্রতিবেশী নাগরিক এবং মানুষের মধ্যকার সম্পর্কের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। প্রতিবেশী প্রসঙ্গে প্লেটো তার আদর্শ রাষ্ট্রের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান চেয়েছিলেন। তিনি এমন একটি স্থান চেয়েছিলেন যা সহজেই শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যায়। তিনি মনে করতেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো যদি আক্রমণাত্মক হয়, তবে আদর্শ রাষ্ট্রের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী প্রয়োজন।
প্লেটো তার ‘সাম্যবাদ’ (Communism) তত্ত্বে শাসক ও অভিভাবক শ্রেণীর জন্য ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিষিদ্ধ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, শাসকরা যদি নিজেদের ঘর, জমি বা অর্থের মালিক হয়, তবে তারা রাষ্ট্রের রক্ষক না হয়ে সাধারণ নাগরিকদের প্রতিবেশী বা প্রতিপক্ষ (Enemies) হয়ে উঠবে এবং একে অপরের প্রতি ঈর্ষান্বিত হবে। প্লেটো বিশ্বাস করতেন, একটি সুশৃঙ্খল সমাজে প্রতিবেশীদের মধ্যে বিশাল অর্থনৈতিক বৈষম্য থাকা উচিত নয়। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে, সবচেয়ে ধনী নাগরিক দরিদ্রতমের চেয়ে চারগুণ বেশি ধনী হওয়া উচিত নয়, যাতে প্রতিবেশীদের মধ্যে হিংসা ও বিদ্বেষ না থাকে।
প্লেটো প্রতিবেশী বা সমসাময়িকদের সাথে আচরণের ক্ষেত্রে সদয় হওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তার দর্শন অনুযায়ী, ‘যাদের সাথে সাক্ষাৎ হয় তাদের প্রতি দয়ালু হও, কারণ প্রত্যেকেই একটি কঠিন লড়াই লড়ছে।’ প্লেটো মনে করতেন, পাশের রাষ্ট্রগুলোর সাথে সম্পর্ক সবসময় বন্ধুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। যদি প্রতিবেশী রাষ্ট্র লোভী হয়, তবে আদর্শ রাষ্ট্রকে নিজেদের সম্পদ ও স্বাধীনতা রক্ষায় প্রস্তুত থাকতে হবে। বস্তুত প্লেটো প্রতিবেশী বলতে এমন এক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলকে বুঝিয়েছেন, যেখানে ন্যায়বিচার, পারস্পরিক সহানুভূতি এবং সম্পদের সুষম বণ্টন বজায় থাকা অপরিহার্য।
এরিস্টটল প্রতিবেশী বা প্রতিবেশীর সাথে সম্পর্ককে তার নীতিশাস্ত্র (Ethics) এবং রাজনীতি (Politics) দর্শনে সামাজিক বন্ধন ও বন্ধুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখেছেন। তার দর্শন অনুযায়ী, প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক একটি সুখী ও সুশৃঙ্খল সমাজের মূল ভিত্তি। এরিস্টটল বন্ধুত্বকে (Philia) সমাজের আঠা হিসেবে গণ্য করতেন, যা প্রতিবেশীদের মধ্যেও বিদ্যমান থাকে। তার মতে, নিজের পরিবারের বাইরে সবচেয়ে কাছের মানুষ হলো প্রতিবেশী। একজন সৎ নাগরিক হিসেবে প্রতিবেশীর সাথে ভালো ব্যবহার করা, পারস্পরিক সাহায্য করা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। তিনি মনে করতেন, ভালো প্রতিবেশী সমাজে সুখ ও উৎকর্ষ বৃদ্ধিতে সাহায্য করে ‘নিকোমেকিয়ান এথিক্স’-এ এরিস্টটল উল্লেখ করেছেন, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সখ্য অনেক ক্ষেত্রে ভৌগোলিক নৈকট্যের ওপর নির্ভর করে। ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণেই প্রতিবেশীরা একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়। যদিও এরিস্টটল প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক পছন্দ করতেন, তবুও তিনি অতিরিক্ত কথা বলা বা অযথা প্রতিবেশীর বিষয়ে নাক গলানোকে ‘নির্বুদ্ধিতার নিদর্শন’ বলে সতর্ক করেছেন। এরিস্টটলের দর্শনে একজন আদর্শ প্রতিবেশী হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, নৈতিকতা ও সামাজিক সংহতির প্রতীক।
প্রতিবেশীদের সাথে সম্পর্ক, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গান্ধীজির দর্শনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। তার ভাবনা অনুযায়ী, প্রকৃত অহিংসা শুধু শত্রুর বিরুদ্ধে নয়; বরং প্রতিদিনের প্রতিবেশীদের সাথে আচরণেও প্রকাশ পাওয়া উচিত। গান্ধী মানুষে মানুষে গভীর প্রীতি ও মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে তোলার কথা বলতেন। প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন এবং পারস্পরিক ভালোবাসাই ছিল তার আদর্শ।
তিনি হিন্দু-মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্মের প্রতিবেশীর মধ্যে সম্প্রীতির ওপর জোর দিতেন। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি সব ধর্মের মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তার ধারণায়, প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো এবং একসাথে মিলেমিশে থাকার মধ্যেই প্রকৃত মনুষ্যত্ব নিহিত। প্রতিবেশীর সাথে বিরোধ বা মতপার্থক্য হলে তা সহিংসভাবে না মিটিয়ে অহিংসা, আলাপ-আলোচনা এবং ধৈর্যের মাধ্যমে সমাধানের কথা তিনি বলতেন।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র ও পারস্পরিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন সবসময়ই উদারনৈতিক, মানবিক এবং সহযোগিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন। তার চিন্তাধারায় প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক উন্নয়নের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। অমর্ত্য সেন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের মধ্যে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং উন্নয়নমূলক কাজের বিনিময়ে জোর দিয়েছেন। অধ্যাপক সেন বাংলাদেশের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে অগ্রগতির প্রশংসা করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাংলাদেশ এনজিওগুলোর সহায়তায় স্বাস্থ্য ও নারীশিক্ষায় যে উন্নতি করেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর (এমনকি ভারতের কোনো কোনো অঙ্গরাজ্যের চেয়েও) জন্য অনুকরণীয়। প্রতিবেশী দেশগুলোর উন্নয়নের ক্ষেত্রে অমর্ত্য সেন আয়ের চেয়ে মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধিকে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সুযোগ) বেশি গুরুত্ব দেন। তার মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস থাকলে সম্পদ ও সুযোগের বৈষম্য কমানো সম্ভব। তিনি বিশ্বাস করেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বা আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পেলে উন্নয়নের পথ সুগম হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার মতো অঞ্চলে দারিদ্র্যদূরীকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। অমর্ত্য সেন প্রতিবেশীর সাথে কেবল ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়; বরং মানবিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে একটি সুন্দর দক্ষিণ এশিয়া গড়ার স্বপ্ন দেখেন।
লেখক : অনুচিন্তক



