উম্মাহ কি নীরব দর্শক হয়েই থাকবে!

উম্মাহ কি কেবল দর্শক হয়েই থাকবে? না, সময় এসেছে জেগে ওঠার। আমাদের তেল আছে, টাকা আছেÑ এখন প্রয়োজন শুধু সঠিক জ্ঞানের প্রয়োগ এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা শক্তি। পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় শক্তি হলো ঈমানের ঐক্য। শিয়া-সুন্নি বিভাজন ভুলে আমরা যদি একে অপরের হাত ধরি এবং সূরা মায়িদার বিধান অনুযায়ী শত্রুদের চিহ্নিত করি, তাহলেই আমরা ফিরে পাব হারানো শৌর্য ও গৌরব

বিশ্ব এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। একদিকে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের চরম ঔৎকর্ষ, অন্যদিকে মুসলিম উম্মাহর চরম লাঞ্ছনা ও পরনির্ভরশীলতা। বিশ্বের মানচিত্রে ৫৭টি মুসলিম দেশ, অফুরন্ত খনিজসম্পদ আর ২০০ কোটির এক বিশাল জনসমষ্টি থাকার পরও আমাদের কেন অন্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়? আজ মক্কা-মদিনার খাদেম বা আরবের প্রভাবশালী শেখরা কেন এই পরিস্থিতির সামনে অসহায়? কেন ২০০ কোটি মুসলমান আজ পৃথিবীর সবচাইতে দুর্বল জাতি? কারণ, শেখদের তেল আছে; কিন্তু তেল রক্ষার তলোয়ার নেই। অঢেল টাকা আছে; কিন্তু সেই টাকায় বিশ্ব পরিচালনার মগজ নেই।

আমরা যখন বিলাসিতার ক্রীতদাস
আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে মুসলিম উম্মাহকে শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা দিয়েছেন। এই শ্রেষ্ঠত্বের শর্ত ছিল জ্ঞান, আমল এবং দাওয়াত। আজ ২০০ কোটি মুসলিমের বিপরীতে মাত্র এক কোটি ৭০ লাখ ইহুদি পুরো বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করছে। কারণ তারা জ্ঞানকে অস্ত্র বানিয়েছে।

মুসলিমবিশ্ব যখন তার স্বর্ণযুগের ইতিহাস নিয়ে গর্ব করে, তখন আধুনিক যুগের রূঢ় বাস্তবতা হলো- উম্মাহ আজ বিজ্ঞানচর্চায় যোজন যোজন পিছিয়ে। প্রায় ২০০ কোটির মুসলিম জনসংখ্যার বিপরীতে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সংখ্যা মাত্র তিনটি (পদার্থ, রসায়ন ও চিকিৎসাবিজ্ঞান মিলিয়ে)। অথচ মাত্র এক কোটি ৭০ লাখের ক্ষুদ্র এক জাতি হয়েও ইহুদিরা বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় ১১০টিরও বেশি নোবেল জয় করেছে। এই আকাশ-পাতাল ব্যবধান প্রমাণ করে, জ্ঞানের অন্বেষণ আজ আমাদের বিলাসিতা আর আরাম-আয়েশের নিচে চাপা পড়ে গেছে। সূরা আদ-দুখানের ৪৪ : ৩২ নম্বর আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অতীতে অন্যদের জ্ঞানের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব দেয়া হয়েছিল, তেমনি বর্তমানের এই স্থবিরতা আমাদের কেবল অতীত গৌরব নিয়ে পড়ে না থাকার কঠোর হুঁশিয়ারি দেয়। আবিষ্কারের সামনের সারিতে নিজেদের আসন পুনরায় দখল করতে হলে মুসলিম বিশ্বকে ‘ভোক্তা’ হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় সেই বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধির চর্চায় ফিরতে হবে।

মরুভূমির বুকে আজ বিশাল সব অট্টালিকা। আরবের শেখরা প্রতিযোগিতায় নেমেছে কার টাওয়ার কত উঁচুতে উঠবে। অথচ নিজেদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির জন্য এরা পশ্চিমাদের মুখাপেক্ষী। এই বিলাসিতা তাদের ঈমানি তেজ শুষে নিয়েছে।

আরব রাজতন্ত্রের শৃঙ্খল ও ‘হানি ট্র্যাপ’
ইসলামে রাজতন্ত্রের স্থান নেই; এটি অনৈসলামিক ব্যবস্থা। এই রাজপরিবারগুলো মূলত অতীতের সাধারণ উপজাতীয় সমাজ থেকে আসা, যাদেরকে পশ্চিমা শক্তিগুলো দাবার ঘুঁটি হিসেবে বসিয়েছিল। আজ সেই রাজা ও রাজপুত্ররা ক্ষমতা ছাড়তে চাইছেন না এবং পশ্চিমা প্রভুদের সন্তুষ্টির জন্য কুরআনের বিধান সূরা মায়িদার ৫১ (ইহুদি-খ্রিষ্টানদের বন্ধু হিসেবে গ্রহণ না করা) অমান্য করছেন।

আমি গোয়েন্দা সংস্থায় কিছু সময় দায়িত্ব পালনের সুবাদে দেখেছি, কিভাবে ‘হানি ট্র্যাপ’ বা নারী ও লালসার ফাঁদে ফেলে এই শাসকদের ব্ল্যাকমেইল করা হয়। ইহুদি গোয়েন্দারা মুসলিম শাসকদের ‘বেডরুম’ পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। ফলে অঢেল সম্পদ থাকার পরও উম্মাহর কোনো সামরিক ওজন তৈরি হচ্ছে না। বিশ্বের অনেক মুসলিম ব্যবসায়ী আছেন যারা চাইলে বিল গেটস বা ইলন মাস্কের মতো ধনকুবেরদের অনায়াসেই পকেটে ভরে রাখতে পারেন।

প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্ব ও সম্পদের খতিয়ান

  • প্রিন্স আল-ওয়ালিদ বিন তালাল : সৌদি রাজপুত্র, যার বিনিয়োগ অ্যাপলসহ বড় বড় টেক জায়ান্টে বিস্তৃত।
  • শেখ মনসুর : ম্যানচেস্টার সিটির মালিক, যার প্রভাব ইলন মাস্কের চেয়ে কম নয়।
  • সুলতান হাসানাল বলকিয়াহ : ব্রুনাইয়ের সুলতান, যার ব্যক্তিগত সম্পদ অকল্পনীয়।
  • কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি : লন্ডনের দ্য শার্ডসহ বিশ্বের প্রধান ব্যাংকিং ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণকারী।

কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো- এই বিশাল সম্পদ পশ্চিমা ব্যাংকগুলোতে গচ্ছিত। আমাদের টাকায় কেনা অস্ত্র দিয়েই আমাদের ভাইদের ওপর আক্রমণ করা হয়। ‘পেট্রো-ডলার’ চুক্তির মাধ্যমে আমরা পশ্চিমাদের সেবাদাসে পরিণত হয়েছি। নেতৃত্বের এই চরম অভাব এবং ব্যক্তিগত লোভের কারণে আমরা আজ ঐক্যবদ্ধ হতে পারছি না।

সুদি ব্যাংকিং ও মিডিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খল
ইহুদিরা বিশ্ব শাসন করছে মূলত দু’টি প্রধান স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে- এক হলো ‘সুদ’ আর দুই ‘মিডিয়া’। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে, প্রতিটি রাষ্ট্রকে সুদি ব্যবস্থার জালে বন্দী করা হয়েছে। আইএমএফ (IMF) এবং ওয়ার্ল্ড ব্যাংক মূলত জায়নবাদী নীতিমালার মাধ্যমেই মুসলিম দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে শোষণ করছে। আল্লাহ সুদকে নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধের শামিল বলেছেন। আমরা আল্লাহর সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে কিভাবে বরকত আশা করতে পারি?

এর পাশাপাশি আছে মিডিয়ার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ। তারা সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে পরিবেশন করে। ফিলিস্তিনের ওপর চলা নির্মম গণহত্যাকে তারা ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে প্রচার করে। মুসলিম তরুণদের মনে হীনম্মন্যতা ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। আমরা আজও একটি আন্তর্জাতিক মানের মিডিয়া হাউজ তৈরি করতে পারিনি, যা পশ্চিমাদের এই প্রোপাগান্ডার জবাব দিতে পারে।

মোসাদের ব্লু-প্রিন্ট : আমাদের অনৈক্যই তাদের পরম অস্ত্র
রাসূলুল্লাহ সা:-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বে কে আসবেন- এই প্রশ্নেই প্রথম বিভাজন তৈরি হয়; যেখানে সুন্নিরা হজরত আবু বকর রা:-এর খেলাফতকে সমর্থন করেন এবং শিয়ারা হজরত আলী রা:-কে সরাসরি উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য করেন। আকিদাগতভাবে উভয় পক্ষ মৌলিক বিষয়ে এক থাকলেও শিয়ারা নবী পরিবারের ১২ ইমামের নেতৃত্বে বিশ্বাসী, আর সুন্নিরা সাহাবায়ে কেরাম ও ইজমার (ঐকমত্য) ভিত্তিতে শরিয়তের ব্যাখ্যাকে প্রাধান্য দেন।

মোসাদের ষড়যন্ত্র : জায়নবাদী ও ইহুদি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো মুসলিমদের এই ঐতিহাসিক ও আবেগীয় মতভেদকে সুকৌশলে কাজে লাগিয়ে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ (বিভক্ত করো ও শাসন করো) নীতিতে শিয়া-সুন্নি রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা উসকে দিচ্ছে। তাদের মূল লক্ষ্য হলো মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধে লিপ্ত রেখে ইসরাইলি আধিপত্য সুসংহত করা। যদি শিয়া-সুন্নি বিভাজন ভুলে আরবের তেল ও সম্পদ এবং এই উপমহাদেশের বিশাল জনশক্তি এক হতো, তবে কোনো পরাশক্তি আমাদের দিকে চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেত না। আমাদের এই কৃত্রিম অনৈক্যই আজ শত্রুর সবচাইতে বড় অস্ত্র।

শত পারমাণবিক বোমা বনাম এক ‘ঐক্য’
ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে বাধা দেয়া হচ্ছে। কারণ পরাশক্তিগুলো জানে একটি ঐক্যবদ্ধ মুসলিম রাষ্ট্র তাদের জন্য হুমকি। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো- মুসলিমদের হাতে যদি শত পারমাণবিক অস্ত্রও থাকে, তবে তা কোনো কাজে আসবে না যদি আমাদের মধ্যে ঐক্যের অভাব থাকে। আমেরিকা ও ইসরাইল শত শত বোমা নিয়ে আমাদের হুমকি দিচ্ছে; কিন্তু আমাদের ঈমানি ঐক্য যেকোনো ভৌত পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়ে শতগুণ বেশি শক্তিশালী। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম নৌবাহিনী গঠন করেছিলেন হজরত উসমান রা:, যা ভূমধ্যসাগরে মুসলিম আধিপত্য নিশ্চিত করেছিল। আজ সেই সমরকৌশল ও নৌশক্তির গুরুত্ব অনুধাবনের বদলে আমরা অনৈক্যে নিমজ্জিত।

যদি পশ্চিমাদের ‘ন্যাটো’ (NATO) থাকতে পারে, তবে ৫৭ মুসলিম দেশের কেন একটি সম্মিলিত সামরিক জোট বা ‘মুসলিম ডিফেন্স অ্যাক্ট’ থাকবে না? একটি মুসলিম দেশের ওপর আক্রমণ মানে পুরো উম্মাহর ওপর আক্রমণ- এই নীতিতে অটল থাকলে আজ ফিলিস্তিন বা ইরানের ওপর কেউ চোখ তুলে তাকানোর সাহস পেত না।

বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?
অনেকেই প্রশ্ন করেন- এই অনৈসলামিক রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে প্রকৃত ইসলামী নেতৃত্বের দিকে ফিরে আসা কি আদৌ সম্ভব? ‘Who will bell the cat?’ বা এই কঠিন কাজের সূচনা করবে কে? এক্ষেত্রে ইরান উম্মাহর জন্য একটি বিশাল দৃষ্টান্ত। ইরান আজ যেভাবে ইসরাইল এবং আমেরিকার মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে একা লড়ে যাচ্ছে, তা থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন।

১৯৭৯ সালের আগে ইরানও রাজতন্ত্রের শাসনে ছিল, যারা ছিল আমেরিকার পরম বন্ধু। কিন্তু সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারল, তাদের সম্পদ পশ্চিমাদের স্বার্থে ব্যয় হচ্ছে, তারা রাজপথ দখল করে বিপ্লব ঘটায়। আজ ইরান একা লড়তে পারছে, কারণ তারা পশ্চিমাদের থেকে অস্ত্র কেনে না; নিজেরাই তা তৈরি করে। বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধতে তরুণ প্রজন্মকে রাজতন্ত্রের কুফল সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। ইরান প্রমাণ করেছে পশ্চিমা শৃঙ্খল ছিঁড়ে বের হতে পারলে একা লড়াই করার সাহস পাওয়া যায়। আরব উম্মাহকেও আজ এই সাহসিকতা অর্জন করতে হবে।

উম্মাহর জেগে ওঠার সময় : আমাদের করণীয় কী?
আমরা আজ শুধু মুনাজাত করছি; কিন্তু বাস্তব আমল বা পদক্ষেপ নিচ্ছি না। আল্লাহ কুরআনে আমাদের শ্রেষ্ঠ জাতি বলেছেন; কিন্তু আমরা লাঞ্ছিত। সুতরাং যতই মুনাজাত করি না কেন, মূল নির্দেশনা অনুসরণ না করা হলে আল্লাহ আমাদের দোয়া কবুল করবেন না। আমাদেরকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর হতে হবে। অন্যের অস্ত্রের ওপর নির্ভর করে স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না। জায়নবাদী ব্যাংকিং শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পশ্চিমা স্বার্থে গড়া রাজতন্ত্রের মোহ ত্যাগ করে শূরার ভিত্তিতে প্রকৃত ইসলামী নেতৃত্বের দিকে ফিরে আসতে হবে। নেতাদের ও তরুণ প্রজন্মকে হানি ট্র্যাপের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। সেইসাথে পশ্চিমা সংস্কৃতির মোহ ত্যাগ করতে হবে।

উম্মাহ কি কেবল দর্শক হয়েই থাকবে? না, সময় এসেছে জেগে ওঠার। আমাদের তেল আছে, টাকা আছে- এখন প্রয়োজন শুধু সঠিক জ্ঞানের প্রয়োগ এবং ঐক্যবদ্ধ প্রতিরক্ষা শক্তি। পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও বড় শক্তি হলো ঈমানের ঐক্য। শিয়া-সুন্নি বিভাজন ভুলে আমরা যদি একে অপরের হাত ধরি এবং সূরা মায়িদার বিধান অনুযায়ী শত্রুদের চিহ্নিত করি, তাহলেই আমরা ফিরে পাব হারানো শৌর্য ও গৌরব।

লেখক : সাবেক সহকারী নৌবাহিনী প্রধান ও উপ-উপাচার্য, বিইউপি