কর্তাসত্তা থেকে তাজকিয়া : মানুষের নৈতিক অভিযাত্রা

কর্তাসত্তার সর্বোচ্চ পরিপক্বতা তখনই অর্জিত হয়, যখন মানুষের ইচ্ছাশক্তি আল্লাহ প্রদত্ত নৈতিক বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে স্বাধীনতা মানে সীমাহীন স্বেচ্ছাচার নয়। স্বাধীনতা হলো সত্যকে চিনে নিয়ে তার অনুসরণ করার সক্ষমতা। যে ব্যক্তি প্রবৃত্তি দিয়ে পরিচালিত, সে জাহেরিভাবে স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে বন্দী। আর যে ব্যক্তি সত্য, ন্যায় ও তাকওয়ার আলোকে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে-ই প্রকৃত স্বাধীন। এ অবস্থাতেই কর্তাসত্তা তার সর্বোচ্চ নৈতিক পরিপক্বতায় উপনীত হয়

মানুষকে যদি নিছক জৈবিক সত্তা হিসেবে দেখা হয়, তবে মানব অস্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি আড়ালে থেকে যায়। কারণ মানুষ এমন এক সত্তা, যে নিজের অস্তিত্ব সচেতনভাবে উপলব্ধি করতে পারে, নিজের অবস্থা বিচার করতে পারে এবং সে অনুযায়ী জীবন ও পরিবেশের রূপ দিতে পারে। এই সৃজনক্ষম, সিদ্ধান্তগ্রাহী ও পরিবর্তন-সৃষ্টিকারী শক্তিকেই আধুনিক দর্শন, সমাজতত্ত্ব ও নৈতিক চিন্তায় বলা হয় ব্যক্তির কর্তাসত্তা বা Human Agency।

পৃথিবীর অন্য কোনো প্রাণী এত গভীরভাবে নিজের পরিবেশ পুনর্গঠন করতে পারেনি। মানুষ শুধু প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ায়নি; সে প্রকৃতির রূপান্তর ঘটিয়েছে, ভাষা সৃষ্টি করেছে, সভ্যতা নির্মাণ করেছে, নৈতিক বিধান প্রতিষ্ঠা করেছে, শিল্প ও দর্শনের জগৎ গড়ে তুলেছে। এসব কিছুর মূলে আছে তার কর্তাসত্তা।

কর্তাসত্তা বলতে মূলত বোঝায় মানুষের সেই সক্ষমতা, যার মাধ্যমে সে নিজের ইচ্ছা, বিবেচনা, সিদ্ধান্ত ও উদ্দেশ্যকে বাস্তব ক্রিয়ায় পরিণত করে। এটি শুধু কিছু করার ক্ষমতা নয়; বরং কেন করছি, কিভাবে করছি এবং পরিণাম কী হবে— এসব প্রশ্ন বিবেচনা করে সচেতনভাবে কাজ করার সামর্থ্য। একটি প্রাণী প্রবৃত্তির বশে কাজ করে। কিন্তু মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়। সে বিকল্প বিচার করে, নিজের অবস্থান নির্ধারণ করে এবং ভবিষ্যতের দিকে লক্ষ রেখে পদক্ষেপ নেয়। মানুষ অন্যান্য সত্তা থেকে মৌলিকভাবে পৃথক।

মানুষের প্রতিটি নির্বাচন তার ভেতরের এক নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের বহিঃপ্রকাশ।

তবে কর্তাসত্তার অর্থ এই নয় যে, মানুষ সীমাহীন স্বাধীন। মানুষের স্বাধীনতা সবসময় একটি নির্দিষ্ট বাস্তবতার মধ্যে কাজ করে। সে জন্ম নেয় একটি নির্দিষ্ট পরিবারে, নির্দিষ্ট ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে, নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে। সমাজ তাকে ভাষা দেয়, যার মাধ্যমে সে চিন্তা করতে শেখে। সংস্কৃতি তাকে মূল্যবোধ দেয়, যার মাধ্যমে সে ভালো-মন্দের ধারণা গড়ে তোলে। রাষ্ট্র তাকে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেয়, যা তার আচরণের পরিসর নির্ধারণ করে। অর্থনীতি তার সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। এমনকি তার শারীরিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্যও তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতায় প্রভাব রাখে।

ফলে মানুষের কর্তাসত্তা সবসময় স্বাধীনতা ও সীমাবদ্ধতার এক দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের মধ্যে কাজ করে। এই দ্বান্দ্বিকতাই মানব কর্তাসত্তার প্রকৃত সৌন্দর্য।

দর্শনের ইতিহাসে কেউ কেউ মনে করেছেন, মানুষ মূলত বাহ্যিক শক্তির দ্বারা নির্ধারিত। অর্থনীতি, সমাজ, জিনগত প্রবণতা বা ইতিহাসের গতি তার সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে। অন্য দিকে অনেক চিন্তাবিদ জোর দিয়েছেন মানুষের স্বাধীন নির্বাচনের ওপর। কিন্তু বাস্তবতা সম্ভবত এ দুয়ের মধ্যবর্তী স্থানে। মানুষ এমন সত্তা, যে প্রদত্ত বাস্তবতার মধ্যে থেকে অর্থ তৈরি করে, অবস্থান নেয় এবং নিজের জীবনকে রূপ দেয়।

এ কারণেই কর্তাসত্তা শুধু একটি দার্শনিক ধারণা নয়; এটি নৈতিকতা, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় ভিত্তি। যদি মানুষকে সম্পূর্ণ নির্ধারিত ধরা হয়, তবে নৈতিক দায়বদ্ধতার ভিত্তি নড়ে যায়। তখন অপরাধ, ন্যায়, দায়িত্ব, প্রতিশ্রুতি প্রভৃতির ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা মানুষকে দায়ী করি, প্রশংসা করি, সমালোচনা করি। কারণ আমরা ধরে নিই যে, সে নির্বাচন করতে সক্ষম। এই সক্ষমতাই তার কর্তাসত্তা।

মানুষকে যদি এমন একটি সত্তা হিসেবে ধরা না হয়, যে স্বাধীনভাবে বিচার করতে পারে, বিকল্পের মধ্যে নির্বাচন করতে পারে এবং সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, তবে নৈতিকতা, দায়িত্ব ও জবাবদিহির পুরো ধারণাটিই অর্থহীন হয়ে পড়ে। আমরা কাউকে তখনই তার কাজের জন্য দায়ী করি, যখন ধরে নিই, সে অন্যভাবে কাজ করারও সক্ষমতা রাখত। যদি মানুষের সমস্ত আচরণ কেবল বাহ্যিক পরিস্থিতি, জৈবিক প্রবৃত্তি বা সামাজিক নির্ধারণের যান্ত্রিক ফল হতো, তবে তার ওপর নৈতিক দায় আরোপ করা যেত না। সে তখন একটি প্রাকৃতিক ঘটনার মতোই হতো। যেমন— ঝড়, বৃষ্টি বা ভূমিকম্প। যাকে ব্যাখ্যা করা যায়; কিন্তু নৈতিক বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায় না।

এর মানে পরিষ্কার। মানুষ কেবল তার চার পাশের পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়াশীল সত্তা নয়। সে সঠিক ও ভুলের মধ্যে পার্থক্য করতে সক্ষম, নিজের কাজের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে ভাবতে সক্ষম এবং সেই বিবেচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম। একজন মানুষ যখন সত্য বলার সিদ্ধান্ত নেয়, অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করে, অথবা নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে বৃহত্তর কল্যাণকে বেছে নেয়, তখন সে কেবল কোনো আচরণ প্রদর্শন করছে না; বরং নিজের ভেতরের নৈতিক সত্তার প্রকাশ ঘটাচ্ছে। আবার যখন সে অন্যায় করে, প্রতারণা করে, বা অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করে, তখনো সেটি নিছক একটি কার্য নয়। সেটি তার নির্বাচিত নৈতিক অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ।

এ কারণেই আইন, বিচারব্যবস্থা, নৈতিক দর্শন, সামাজিক শৃঙ্খলার মতো সভ্যতার প্রতিটি মৌলিক প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির কর্তাসত্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আদালত একজন অভিযুক্তকে শাস্তি দেয় এই অনুমানের ভিত্তিতে যে, সে সচেতনভাবে কাজটি করেছে এবং তার ভিন্নভাবে আচরণ করার সম্ভাবনাও ছিল। নৈতিক দর্শন মানুষের কাছে আদর্শ আচরণের আহ্বান জানায় এই বিশ্বাস থেকে যে, মানুষ নিজের আচরণ সংশোধন ও উন্নত করতে পারে। সমাজ একজন ব্যক্তিকে সম্মান দেয়, প্রশংসা করে অথবা সমালোচনা করে। কারণ সমাজ মনে করে ব্যক্তি তার সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি করতে বাধ্য।

এখানে একটি গভীর দার্শনিক সত্য নিহিত আছে : দায়বদ্ধতা ছাড়া স্বাধীনতার কোনো অর্থ নেই, এবং স্বাধীনতা ছাড়া দায়বদ্ধতারও কোনো ভিত্তি নেই। এই দুইয়ের সংযোগস্থলেই ব্যক্তির কর্তাসত্তা দাঁড়িয়ে। মানুষ স্বাধীন বলেই দায়ী এবং দায়ী বলেই তার স্বাধীনতার নৈতিক মূল্য রয়েছে।

কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সমাজে এসে এই কর্তাসত্তার ধারণা নতুন সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে। আজকের পৃথিবীতে প্রশ্ন উঠছে, মানুষ কি সত্যিই স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, নাকি তার সিদ্ধান্তগুলো অদৃশ্যভাবে নির্মিত ও নিয়ন্ত্রিত? এই প্রশ্নটি শুধু দার্শনিক বিতর্ক নয়; এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতার অংশ।

বর্তমান যুগে মানুষ এমন এক তথ্য-পরিবেশে বাস করছে, যেখানে তার মনোযোগ, পছন্দ, আকাঙ্ক্ষা এবং এমনকি তার বিশ্বাস পর্যন্ত নানা সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ায় প্রভাবিত হচ্ছে। গণমাধ্যম তার চিন্তার কাঠামো তৈরি করছে। অ্যালগরিদম তার সামনে এমন তথ্য হাজির করছে, যা তার পূর্ববর্তী আচরণের ভিত্তিতে তাকে নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করে। ভোক্তাবাদ তার প্রয়োজনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করছে। রাজনৈতিক প্রচারণা তার আবেগকে সংগঠিত করে তাকে একটি বিশেষ প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

সবচেয়ে জটিল বিষয় হলো, এই নিয়ন্ত্রণ অধিকাংশ সময় প্রত্যক্ষযোগ্য নয়। এটি এমন সূক্ষ্মভাবে কাজ করে যে ব্যক্তি নিজেই অনেক সময় বুঝতে পারে না, তার ‘ইচ্ছা’ কতটা তার নিজের এবং কতটা বাইরের শক্তির দ্বারা নির্মিত। যখন একজন মানুষ ভাবে, সে নিজের স্বাধীন সিদ্ধান্তে একটি মত গ্রহণ করছে, একটি পণ্য কিনছে অথবা একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে, তখনো সম্ভব যে তার সিদ্ধান্ত বহু অদৃশ্য প্রভাবের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে।

এখানেই আধুনিক সমাজে কর্তাসত্তার গভীর সঙ্কট দেখা দেয়। ব্যক্তি কি সত্যিই স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তগ্রাহী? নাকি সে বৃহৎ প্রযুক্তিগত, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর একটি প্রতিফলনমাত্র? তার স্বাধীনতা কি বাস্তব, নাকি কেবল স্বাধীনতার অনুভূতি? এসব প্রশ্ন সমকালীন দর্শন, সমাজতত্ত্ব ও রাজনৈতিক তত্ত্বের অন্যতম কেন্দ্রীয় বিতর্ক।

তবে এ সঙ্কটের মধ্যে মানব কর্তাসত্তার গুরুত্ব কমে যায় না; বরং আরো বাড়ে। কারণ এখন মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় নৈতিক কাজ হলো নিজের সিদ্ধান্তের উৎস সম্পর্কে সচেতন হওয়া, নিজের চিন্তার ওপর সমালোচনামূলক দৃষ্টি তৈরি করা এবং বাহ্যিক প্রভাবের মধ্যেও নিজের বিচারক্ষমতাকে জাগ্রত রাখা। আধুনিক যুগে স্বাধীনতা মানে শুধু বাধাহীনতা নয়; বরং নিজের ওপর ক্রিয়াশীল অদৃশ্য শক্তিগুলোকে শনাক্ত করে তাদের থেকে আজাদি হাসিলের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতাও।

কর্তাসত্তার আরেকটি মৌলিক দিক হলো এর সাথে মানুষের অর্থবোধের সম্পর্ক। মানুষের কর্তাসত্তা শুধু কাজ করার ক্ষমতা নয়; এটি অর্থ নির্মাণের ক্ষমতাও। মানুষ তার অভিজ্ঞতাকে কেবল ভোগ করে না, সে সেগুলোকে ব্যাখ্যা করে। ব্যর্থতা, সাফল্য, দুঃখ, আনন্দ প্রভৃতিকে সে অর্থ দেয়, ব্যাখ্যা দেয় এবং এর মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্বের স্বরূপ নির্মাণ করে।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষ কেবল বেঁচে থাকে না। সে প্রশ্ন করে, আমি কেন বেঁচে আছি? আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী? আমি কিসের জন্য কাজ করব? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার মধ্যেই তার মানবিকতা নিহিত। একটি প্রাণী শুধু বেঁচে থাকার তাগিদে কাজ করে; কিন্তু মানুষ অর্থপূর্ণভাবে বাঁচতে চায়। এই অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই সে সিদ্ধান্ত নেয়।

একজন শিক্ষক জ্ঞান বিতরণের মধ্যে অর্থ খুঁজে পান, একজন চিকিৎসক সেবার মধ্যে, একজন শিল্পী সৃষ্টির মধ্যে, একজন সংগ্রামী ন্যায় প্রতিষ্ঠার মধ্যে। প্রত্যেকে নিজের কর্তাসত্তার হাত ধরে জীবনের একটি অর্থ নির্মাণ করে এবং সেই অর্থের আলোকে নিজের কাজ পরিচালিত করে। এই অর্থে কর্তাসত্তা হলো মানুষের অস্তিত্বকে উদ্দেশ্যমূলক করে তোলার কেন্দ্রীয় শক্তি।

ইসলামী চিন্তায় মানুষকে এমন এক সত্তা হিসেবে দেখা হয়, যার মধ্যে সম্ভাবনা ও প্রবণতার দ্বৈততা রয়েছে। তার মধ্যে যেমন নৈতিক উচ্চতায় আরোহণের সামর্থ্য আছে, তেমনি রয়েছে প্রবৃত্তির নিম্নতায় পতিত হওয়ার শঙ্কা। পবিত্র কুরআনে মানুষের নফসের এই দ্বিমুখী প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এক দিকে তার মধ্যে রয়েছে তাকওয়ার বীজ, অন্য দিকে হুজুরের আকর্ষণ। এই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়েই মানুষের কর্তাসত্তা পরীক্ষা ও পরিশীলনের পথে অগ্রসর হয়।

এ কারণে ইসলামে ব্যক্তির নৈতিক পরিপক্বতা কেবল তথ্যগত শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে ঘটে না; বরং তা ঘটে তাজকিয়াতুন নফস বা আত্মার পরিশুদ্ধি ও চরিত্রের পরিমার্জনের মাধ্যমে। মানুষ যখন কেবল বাহ্যিক জ্ঞান সঞ্চয় করে, তখন সে হয়তো দক্ষ হতে পারে; কিন্তু নৈতিকভাবে পরিপক্ব হতে হলে তাকে নিজের অন্তর্জগতকে শুদ্ধ করতে হয়। তার হৃদয়কে অহঙ্কার, লোভ, হিংসা, ক্রোধ ও স্বার্থপরতার প্রভাব থেকে মুক্ত করতে হয়।

এখানে কর্তাসত্তার পরিপক্বতা বলতে বোঝায় মানুষের এমন অবস্থায় পৌঁছানো, যেখানে তার সিদ্ধান্ত আর কেবল তাৎক্ষণিক আবেগ, ক্ষণস্থায়ী আকাঙ্ক্ষা বা প্রবৃত্তির তাড়নায় পরিচালিত হয় না; বরং তা পরিচালিত হয় হিকমাহ, সবর এবং তাকওয়ার আলোকে।

একজন নৈতিকভাবে পরিপক্ব মানুষ কোনো ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় সিদ্ধান্ত নেয় না। সে থামে, চিন্তা করে, বিচার করে এবং তার পর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ইসলামী দর্শনে একে বলা যায় তাদাব্বুর বা গভীর মননশীল বিবেচনা। কারণ একজন মুমিনের সিদ্ধান্ত কেবল আমি কী চাই, এই প্রশ্নের ওপর নির্ভর করে না; বরং আল্লাহ কী চান, ন্যায় কী দাবি করে এবং আমার এ কাজের দুনিয়াবি ও আখিরাতগত পরিণতি কী, এসব সওয়ালও তার চিন্তার অংশ হয়ে ওঠে।

একজন অপরিণত ব্যক্তি ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতি, ক্ষণস্থায়ী আবেগ কিংবা সামাজিক চাপে পরিচালিত হয়। কিন্তু নৈতিকভাবে পরিপক্ব ব্যক্তি নিজের তাৎক্ষণিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে বৃহত্তর কল্যাণ ও ন্যায়কে বিবেচনায় আনে। ইসলামে এ অবস্থাকে হুজুরে দায়িম বলা হয়; অর্থাৎ এমন এক চেতনা, যেখানে ব্যক্তি নিজের কাজকে শুধু বাহ্যিকভাবে সঠিক রাখে না; বরং অন্তরের গভীর সততা ও আল্লাহর উপস্থিতি-সচেতনতার সাথে সম্পাদন করে।

এই পরিপক্বতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো নিজের ভুলকে স্বীকার করার ক্ষমতা। ইসলামী ঐতিহ্যে মানুষকে নিষ্পাপ বলা হয়নি; বরং তাকে ভুলপ্রবণ কিন্তু সংশোধনক্ষম সত্তা হিসেবে দেখা হয়েছে। তাই নৈতিক পরিপক্বতার চিহ্ন হলো ভুল করে ভুল বুঝতে পারা, অনুতপ্ত হওয়া এবং সংশোধনের পথে ফিরে আসা।

এ জায়গায় তওবা হয়ে ওঠে ব্যক্তির কর্তাসত্তার উচ্চতর প্রকাশ। ব্যক্তি যখন ভুলের দায় স্বীকার করে এবং সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখনই তার কর্তাসত্তা প্রকৃত অর্থে নৈতিক পরিণতি লাভ করে।

কর্তাসত্তার সর্বোচ্চ পরিপক্বতা তখনই অর্জিত হয়, যখন মানুষের ইচ্ছাশক্তি আল্লাহ প্রদত্ত নৈতিক বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে স্বাধীনতা মানে সীমাহীন স্বেচ্ছাচার নয়। স্বাধীনতা হলো সত্যকে চিনে নিয়ে তার অনুসরণ করার সক্ষমতা।

যে ব্যক্তি প্রবৃত্তি দিয়ে পরিচালিত, সে জাহেরিভাবে স্বাধীন হলেও প্রকৃতপক্ষে বন্দী। আর যে ব্যক্তি সত্য, ন্যায় ও তাকওয়ার আলোকে নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে-ই প্রকৃত স্বাধীন। এ অবস্থায়ই কর্তাসত্তা তার সর্বোচ্চ নৈতিক পরিপক্বতায় উপনীত হয়।

লেখক : কবি, গবেষক

[email protected]